সুন্দরবনে চোরাশিকারীদের হাতে গণপিটুনিতে মরছে বাঘ
শেখর ভক্ত, চিতলমারী (বাগেরহাট) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:১৬
সুন্দর বনে বাঘের মৃত্যুর ঘটনা আশংকাজনক হারে বেড়ে চলেছে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত গত ৩৩ বছরে সুন্দর বন ও সংলগ্ন এলাকায় চোরা শিকারীদের দ্বারা, গ্রামবাসীর গণপিটুিন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্তত ৬৫টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে বলে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
প্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদরা সুন্দরবনে বাঘের মৃত্যুর বিভিন্ন কারণ চি?হ্নিত করেছেন। তারা বলেছেন, শিকারীদের জালে আটকে ও গুলিতে এবং ঝড়, জলোচ্ছ্বাসে মরছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এছাড়া ঐ এলাকার মানুষের অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে তাদের পিটুনির শিকার হয়েও মরছে অনেক বাঘ। বন বিভাগ প্রয়োজনীয় লোকবল ও উপকরণ সংকটের কারণে বাঘ সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কিংবা বাঘের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে সুন্দরবনে বাঘের বংশ বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে ৬৫টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে ৩৩টি এবং ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সালের জুলাই পর্যন্ত ১১ বছরে ৩২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। ১৯৮২ সালের চাঁদপায় রেঞ্জের গেওয়া অপারেশন এলাকায় ১টি মৃত বাঘ উদ্ধার হয়। এছাড়া ১৯৮৩ সালে ঢাংমারী এলাকা থেকে ১টি, কাশিয়াবাদ এলাকায় ১টি ও গোয়ালিনী এলাকা থেকে ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়। ১৯৮৬ সালে কাশিবাঁধ স্টেশন এলাকা থেকে ১টি ও কদমতলা এলাকা থেকে ১টি মৃত বাঘ উদ্ধার করা হয়। ১৯৮৭ সালে বানিয়াখালী স্টেশন এলাকা থেকে ১টি, ১৯৮৮ সালে ঢাংমারী এলাকা থেকে ১টি, ১৯৮৯ সালে বানিয়াখালী স্টেশন থেকে ১টি মৃত বাঘ উদ্ধার করা হয়। এ বাঘগুলো বিভিন্ন সময়ে শিকারীদের গুলিতে মারা পড়ে।
সূত্র মতে, ১৯৯০ সালে চাঁদপাই এলাকায় ১টি ও কাটাখালী এলাকায় একটি বাঘ গণপিটুনিতে মারা যায়। ১৯৯১ সালে গণপিটুনিতে ১টি ও শিকারীদের গুলিতে প্রাণ হারায় আরও ৩টি বাঘ। ১৯৯২ সালে একটি বাঘের চামড়া উদ্ধার করে বন কর্মীরা। ১৯৯৪ সালে ২টি, ১৯৯৬ সালে ৫টি, ১৯৯৭ সালে ৬টি বাঘ গ্রামবাসীদের গণপিটুনিতে নিহত হয়। ১৯৯৮ সালে বন বিভাগের কর্মীরা ২টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করে। ১৯৯৯ সালে শিকারীদের পাতা ফাঁদে পড়ে ১টি, শিকারীদের গুলিতে ১টি বাঘ মারা যায় ও ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করে বন কর্মীরা। ২০০০ সালে বার্ধক্যজনিত কারণে ১টি বাঘ মারা যায় ও ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার হয়। ২০০১ সাল থেকে গত ১০ বছরে পূর্ব সুন্দর বনে ১৫টি বাঘকে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে গণপিটুনিতেই মারা যায় অধিকাংশ বাঘ। ২০০৪ সালে সুন্দরবনে বিজ্ঞান ভিত্তিক বাঘ শুমারি পরিচালনার অংশ হিসাবে পূর্ব সুন্দরবনে জামতলার রাণী নাম দিয়ে এক বাঘিনীর গলায় রেডিও কলার বেঁধে ছেড়ে দেয়া হয়। পরে ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর বলেশ্বর নদীর পাড়ে জামতলা রাণীর মৃতদেহ পাওয়া যায়।
সূত্র জানায়, ২০০৬ সালের ২ নভেম্বর শরণখোলার উত্তর সোনাতলা গ্রামের শিকারী নুরুজ্জামান শেখের বাড়ি থেকে ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়। ২০০৭ সালের ২ মে হাড়বাড়ীয়া টহল পুলিশ পুকুর পাড়ে ১টি ও একই বছর ১৫ নভেম্বর ঘূণিঝড় সিডরে ২টি বাঘের মৃত্যু হয়। ১০০৯ সালে ২ জুলাই শরণখোলার দাসের ভারানী এলাকায় দক্ষিণ রাজপুর গ্রামে এলাকাবাসী পিটিয়ে ১টি বাঘ হত্যা করে। সর্বশেষ ২০১০ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি শরণখোলা উপজেলার পশ্চিম খাদা গ্রামের ১টি পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে ৩টি বাঘের চামড়া ও হাড়গোড়সহ ৩ পাচারকারীকে আটক করে বন কর্মীরা।
২০০৪ সালে সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে ৪৪০টি বাঘ রয়েছে। এরমধ্যে খুলনা ও সাতক্ষিরা রেঞ্জ এলাকায় ৮৯টি পুরুষ বাঘ ও ১৭০টি স্ত্রী বাঘ এবং ১২টি বাচ্চা বাঘ রয়েছে। এছাড়া বাগেরহাট চাঁদপায়ী ও শরণখোলা রেঞ্জ এলাকায় ৩২টি পুরুষ বাঘ ও ১২৮টি স্ত্রী বাঘ এবং ৯টি বাচ্চার অবস্থান ছিল বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়।
বাগেরহাট শরণখোলা চাঁদপায় রেঞ্জের ডিএফআই আমীর হোসেন চৌধুরী বলেন, বনের ভেতর পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ায় বাঘ খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে গরু-ছাগল আক্রমণ করে। গ্রামবাসী তখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদেরকে পিটিয়ে হত্যা করে থাকে। চোরা-শিকারীদের হাতেও বাঘের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সে বাঘের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। বাঘ নিধন প্রতিরোধে বিভিন্ন এলাকায় টাইগার রেসপন্স টিম গঠন ও চোরা শিকারী প্রতিরোধে আইন শৃঙ্খলার বিভিন্ন টিমের সমন্বয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।