জার্মপ্লাজম সেন্টার :ফল গবেষণায় অনন্য নাম

দেশের ফল গবেষণায় নীরবে কাজ করে চলেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্মপ্লাজম সেন্টার। দেশের প্রচলিত ও অপ্রচলিত নানা ফলদ বৃক্ষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং বিদেশি ফলের ওপর গবেষণা চালিয়ে এদেশে উত্পাদন উপযোগী জাত উদ্ভাবনের নিরন্তর চেষ্টা করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু তাই নয়, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত লবণাক্ত মাটি, পাহাড়ি এলাকার অম্লীয় মাটি এবং বন্যা প্রবণ এলাকার উর্বর বেলে দোআঁশ মাটিতে বিভিন্ন ফল চাষোপযোগী করে তোলার লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা। আজ থেকে ২২ বছর আগে ১৯৯২ সালে সুইশ এজেন্সি ফর ডেভলপমেন্ট কোয়াপরেশনের আর্থিক সহায়তায় মাত্র এক একর জায়গার ওপর এই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু। এদেশের কৃষকদের সহায়তায় একটি বীজ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাই ছিল প্রাথমিক উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির প্রাণপুরুষ প্রফেসর ড. এম. এ রহিমের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ঐকান্তিক আগ্রহে সেই বীজ ব্যাংকই এখন এশিয়ার সর্ববৃহত্ এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফলদ বৃক্ষ গবেষণা কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে ছাড়া এত বড় জার্মপ্লাজম সেন্টার বিশ্বে আর কোথাও নেই। এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৭ জন পিএইচডি করছেন ও ২৫ জন মাস্টার্স পর্যায়ে অধ্যয়নরত। প্রফেসর ড. এম. এ. রহিমের অধীনে এ পর্যন্ত ১৮ জন পিএইচডি ও ১২২ জন মাস্টার্স করেছেন। প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম দীর্ঘদিনের নিবীড় গবেষণার মাধ্যমে ফলদ বৃক্ষের বিভিন্ন প্রজাতির ৭০টি ফলের জাত আবিষ্কার করে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক নিবন্ধন নিয়েছেন। যা বাউ জাত নামে পরিচিত। আলোড়ন সৃষ্টিকারী বাউ-কুল ও বাউ ড্রাগন ফ্রুট অন্যতম উদ্ভাবন। প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম বর্তমানে বাউ-জার্মপ্ল¬াজম সেন্টারের পরিচালক এবং বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব শাখায় বৃক্ষ গবেষণা, বৃক্ষ সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন বিষয়ে দীর্ঘ ৩২ বত্সর যাবত্ কর্মরত আছেন। ২০০টির বেশি দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে তার গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে। তিনি বিভিন্ন ফলের জাত ছাড়াও রসুনের ৩টি ও গাজরের ২টি এবং মিষ্টি কুমড়ার ১টি জাত উদ্ভাবন করেছেন। গাজরের বীজ উত্পাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। সর্বশেষ ২৮টি রঙিন আলুর জাত সংগ্রহ এবং তা থেকে ৬টি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সম্পন্ন জাত নির্বাচনে সফলতা অর্জন করেছেন। যা মানব শরীরের এ্যাজমা, ক্রনিক পেইন, ডায়াবেটিস, হূদরোগ, লিভার ডিজিজ, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, কিডনি সমস্যা, হাইপারটেনশন রোগের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। এমনকি তা ক্যানসার প্রতিরোধেও সহায়ক। এই আলুতে অন্যান্য উপাদানের পাশাপাশি অতিরিক্ত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উত্পাদনে সক্ষম অ্যান্থোসায়ানিন, ফ্লাভেনায়েডস ও ফেনোলিক পদার্থ লুটিন থাকে। এছাড়া এই আলুতে আয়রন, ভিটামিন সি, ই১, ই২, ই৬, সর্করা, আমিষ এবং পটাশিয়াম লবণ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়োডিন ও ম্যাগনেশিয়াম প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। বর্তমানে ১১টি অর্নামেন্টাল মিষ্টি কুমড়ার জাত নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। বৃক্ষ গবেষণা বিষয়ে অবদান হিসেবে ফলদ বৃক্ষের সংগ্রহশালা—জার্মপ্ল¬াজম সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে তিনি যেমন সুনামের অধিকারী হয়েছেন তেমনি সারাদেশে তার এ কর্মকাণ্ড সমপ্রসারণ করে সবুজ বিল্পব সৃষ্টি করেছেন। তিনি এবং তার নেতৃত্বে প্রবীণ ও তরুণ, মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত গবেষকদের নিরলস গবেষণার ফলে সর্বমোট ৭০টি বিভিন্ন প্রজাতির ফলের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। এ জাতগুলোর মধ্যে আমের ১৭টি, পেয়ারার ১০টি, বাতাবি লেবুর ৫টি, লিচুর ৪টি, কুল, কামরাঙ্গা, জামরুল, ড্রাগন ফল, লেবু ও সফেদার ৩টি করে জাত, লংগান ও তেঁতুলের ২টি করে জাত, জলপাই, আমলকি, লটকন, ডুমুর, মালটা, অরবরই, কদবেল, স্ট্রবেরি, কাজুবাদাম, কাঁঠাল, আমড়া ও রাম্বুটানের ১টি করে জাতসহ সর্বমোট ৭০টি জাতের নিবন্ধন করা হয়েছে। এই ৭০টি নিবন্ধনকৃত জাতের মধ্যে বাউকুল-১ কৃষকের আর্থ- সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনে ও পুষ্টির অভাব দূরকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। বাউকুল -১ এর ১টি ৬ মাস বয়সের গাছ থেকে ১০-৩০ কেজি পর্যন্ত কুল পাওয়া যায়। ৭০টি জাতের মধ্যে বাউকুল উদ্ভাবন এদেশের কৃষি বনায়ন ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। যে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয় মাত্র এক একর জমি নিয়ে, বর্তমানে কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪৮ একরে পৌঁছেছে। প্রকল্পে ১৭৫ প্রজাতির ৬৮৮ জাতের প্রায় ১১২৪৫ টি মাতৃগাছ লাগানো হয়েছে। প্রধানত চার ধরনের ফল নিয়ে প্রকল্প তার মূল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যেমন: দেশি প্রধান ফল, দেশি অপ্রধান ফল (বিলুপ্তপ্রায় ফলসমূহ), বিদেশি ফল এবং ভেষজ ফল গাছ। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ ঘনঘন সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড় এবং জোয়ার ভাটার কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় লবণ পানি অনুপ্রবেশের ফলে দিন দিন মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবাদি জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রজাতি আজ ধ্বংসের মুখে। অধিকাংশ ফল প্রজাতিও ধ্বংস হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় ফলের উত্পাদন কম ও দাম বেশি হওয়ায় মানুষ প্রয়োজনীয় ফল আহরণ করতে পারছে না এবং পুষ্টি হীনতায় ভুগছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশে ফলের উত্পাদন বৃদ্ধিকল্পে বিশেষ করে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় লবণাক্ত মাটিতে চাষাবাদ উপযোগী ফলের জাত নির্বাচনকে অত্যন্ত জরুরি বিষয় হিসাবে গ্রহণ করেছেন ড. রহিম। লবণাক্ত মাটি (আগৈলঝাড়া, মোড়েলগঞ্জ ও মংলা), পাহাড়ি এলাকায় অম্ল¬ীয় মাটি (খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি), মঙ্গা এলাকায় বেলে মাটি (ভুরুঙ্গামারি, নাগেশ্বরী, পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা, আদিতমাড়ি ও পাটগ্রাম) ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় উর্বর বেলে দোআঁশ মাটিতে (উল্ল¬াপাড়া ও তাড়াশ) চাষ উপযোগী ফলের জাত নির্বাচন করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অবমুক্তায়ীত ১৬টি ফলের জাত নিয়ে উক্ত এলাকাসমূহে প্রায়োগিক গবেষণা কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। গবেষণাধীন ১৬টি ফলের জাতের মধ্যে উল্লিখিত এলাকার মাটিতে চাষাবাদ উপযোগী কয়েকটি ফলের জাত নির্বাচন করতে পারলে তা বাংলাদেশে ফল উত্পাদনের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।