ফেলানী হত্যা মামলায় খালাস পেলেন বিএসএফ সদস্য

কুড়িগ্রাম সীমান্তে গুলিতে নিহত বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যার মামলায় অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে খালাস দিয়েছে বাহিনীর নিজস্ব একটি আদালত। গত বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার পর রাতেই বিএসএফের ১৮১ নম্বর ব্যাটালিয়নের কনস্টেবল অমিয় ঘোষকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। বিএসএফ সূত্রের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। তবে বিএসএফের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানানো হয়নি। এদিকে একমাত্র আসামিকে মুক্তি দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরু। আর ফেলানীর পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী কুড়িগ্রাম জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, আত্মস্বীকৃত খুনি আইনি প্রক্রিয়ায় হত্যার বৈধতা পেল। এতে সীমান্তে বিএসএফের হাতে হত্যাকাণ্ড আরো বেড়ে যেতে পারে। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার অন্তর্গত চৌধুরীহাট সীমান্ত চৌকির কাছে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময়ে ফেলানী খাতুন কনস্টেবল অমিয় ঘোষের গুলিতে মারা যান। গত ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহার জেলায় সোনারি বিএসএফ ছাউনিতে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। মোট পাঁচজন বিচারক গোটা বিচার প্রক্রিয়া চালান আর কোর্ট পরিচালনা করেন বিএসএফের গুয়াহাটি ফ্রন্টিয়ারের ডিআইজি কমিউনিকেশনস সিপি ত্রিবেদী। অমিয় ঘোষের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় অনিচ্ছাকৃত খুন এবং বিএসএফ আইনের ১৪৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছিল। ফেলানী হত্যার মামলায় সাক্ষ্য দেন তার বাবা ও মামা। মেয়ের হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন ফেলানীর বাবা। এডভোকেট আব্রাহাম লিংকন এই মামলায় ফেলানীর পরিবারকে আইনি সহায়তা দেন। তাদের সঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৪৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে.কর্নেল জিয়াউল হক খালেদও ভারতে যান মামলার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে। বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীর কোর্ট মার্শালের অনুরূপ বিএসএফের নিজস্ব আদালত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্ট তাদের বিচার শেষ করে। রায়ে বলা হয়, অমিয় ঘোষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পায়নি আদালত। মামলার রায়টি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বাহিনীর মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হবে। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমের কাছ থেকেই এই রায়ের কথা আমরা শুনেছি। বিএসএফ বা ভারত সরকার এই ব্যাপারে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই বলেনি। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। ফেলানীর বাবা বলেন, এই রায়ে আমি ক্ষুব্ধ, হতাশ। আমার মেয়েকে হত্যা করা হল আর আসামি খালাস পেয়ে গেলেন। আদালত এই রায় দিয়ে থাকলে আমাদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, আমরা ন্যায় বিচার পাইনি। তিনি পুনর্বিচার দাবি করেন। ইত্তেফাকের নাগেশ্বরী সংবাদদাতা জানান, রায়ের খবর শুনে ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম ও মামা আবু হানিফ হতবাক হয়েছেন। নুরুল ইসলাম এ রায়কে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, অমিয় ঘোষ আমার মেয়েকে পাখির মত গুলি করে হত্যা করেছে। এতে তার ফাঁসি হওয়া উচিত। সেখানে তাদের কোর্ট তাকে বেকসুর খালাস দিল। এ রায় আমি মানি না। আবু হানিফ বলেন, বিচারটি তাদের দেশে হওয়ায় ওই খুনি বিএসএফকে বাঁচাতে এক তরফা রায় দিয়েছে বিশেষ আদালত। এডভোকেট আব্রাহাম লিংকন বলেন, এই রায় আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা পাইনি। তবে একমাত্র আসামি অমিয় ঘোষ যদি নির্দোষ প্রমাণিত হন তাহলে তা হবে দুঃখজনক। কারণ অমিয় নিজেই স্বীকার করেছেন, তার অস্ত্র দিয়েই গুলি করা হয়েছে। তার মানে তিনি আত্মস্বীকৃত হত্যাকারী। এরপরও যদি তিনি খালাস পেয়ে যান, তাহলে সীমান্তে বিএসএফের আচরণ এখন কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়। এই আইনজীবী বলেন, ফেলানীর পরিবার ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হল। রাষ্ট্রের উচিত এ ব্যাপারে যথাযথ খোঁজখবর নিয়ে আইনগত লড়াই চালিয়ে যাওয়া। ফেলানীর বাবার বাড়ি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা ইউনিয়নের বানার ভিটা গ্রামে। তিনি ১০ বছর ধরে দিল্লিতে কাজ করতেন। তার সঙ্গে সেখানেই থাকতো ফেলানী। দেশে বিয়ে ঠিক হওয়ায় বাবার সঙ্গে ফেরার পথে সীমান্ত পার হওয়ার সময় কাঁটাতারের বেড়ায় কাপড় আটকে যায় ফেলানীর। এতে ভয়ে সে চিত্কার দিলে বিএসএফ তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং পরে লাশ নিয়ে যায়। কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ সরকার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও এর কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিলের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম কবির এই রায়ের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ভারত ফেলানী হত্যার বিচারের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত আসামি অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দিয়ে প্রমাণ করেছে রাষ্ট্রের নির্দেশেই অমিয় ঘোষসহ বিএসএফ সদস্যরা নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা ও নির্যাতন করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। এ কারণেই ভারত অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করে বাংলাদেশের জনগণ, বিশ্ববিবেক, মানবাধিকার সংগঠন এবং গণমাধ্যমের সাথে প্রতারণা করছে।