পরোয়া করছেন না আসাদ

দামেস্কে উত্তেজনা বিরাজ করছে, রাস্তায় কোথাও পিনপতন নীরবতা, আবার কোথাও বিদ্রোহীদের হামলায় খতম হওয়ার ভয়। অনেক নাগরিক খাবার মজুদ করতে ব্যস্ত। ধনিক শ্রেণি তাদের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ শিগগিরই বিশ্বের পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে হামলা চালাবে। কিন্তু যার জন্য এই হামলা সেই প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ কিন্তু স্বাভাবিকই আছেন। এমনটিই জানিয়েছেন আসাদের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠজনরা। রাসায়নিক অস্ত্র হামলার অভিযোগে সিরিয়ায় হামলা করতে যুক্তরাষ্ট্র সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও হামলার ব্যাপারে অটল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে। সেখানে স্নায়ুদৌর্বল্যের কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। আসাদ এবং তার স্ত্রী অনেকটাই স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন। অতিথিদের সঙ্গে সানন্দে আলাপ-আলোচনা করছেন। নানা পরামর্শ শুনছেন। তবে নিজের সিদ্ধান্তে অটল এই লন্ডনী জামাই। একই অবস্থা সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরেও। তারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এটাই তাদের প্রতিজ্ঞা। আসাদ প্রতিদিনই তার প্রয়োজনীয় কাজগুলো করছেন এবং পরামর্শ দিচ্ছেন ও নিচ্ছেন। তিনি মনে করছেন, সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে আছে। অথচ কেবল তার নয়, তার বাবার শাসনামল থেকে এই পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ধরনের হুমকির সম্মুখীন তার শাসনামল। এমনভাব দেখাচ্ছেন যে, তিনি স্বাভাবিক আছেন। যেকোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে তিনি সক্ষম। বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকেই আসাদ বলছেন, ২০১৪ সালে মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াবেন না। আসাদ মনে করছেন, রাসায়নিক হামলার ঘটনাটি একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং এতে ইসরাইলের ইন্ধন আছে। আসাদ তার দেশের নাগরিকদের এই ধারণা দিচ্ছেন যে, পশ্চিমা শক্তি কেবল সিরিয়ার বিরুদ্ধে নয়, পুরো আরব বিশ্বের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানোর ষড়যন্ত্র করছে। তিনি এক্ষেত্রে নিজেকে একজন ভিকটিম বলে মনে করছেন। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশ্লেষক জানান, প্রেসিডেন্ট আসাদ এখন আগের চেয়ে নিজের প্রতি অনেক বেশি আস্থাশীল। এমনকি কোনো বিষয়ে সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সমর্থন না থাকলেও তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। নেদারল্যান্ডের কূটনীতিক ও লেখক নিকোলাস ভ্যান ড্যাম বলেন, তিনি কিছু উপদেষ্টার কথা শোনেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেন নিজের মতো করে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিরিয়া বিশেষজ্ঞ জানান, আসাদ তার বাবার মতোই হয়েছেন। তিনি বাবার ঠাণ্ডা রক্তের উত্তরাধিকারী। সিরিয়ায় জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক দল থাকা অবস্থায় কখনোই আসাদ রাসায়নিক হামলার নির্দেশ দিবেন না। তবে ভিন্নমত পোষণ করেন জার্মানির আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ভলকার পারথেস। তিনি বলেন, আসাদ তার বাবার কৌশল অবলম্বন করেন না। বাশার খুবই সংকীর্ণ মানসিকতার। আসাদের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একজনের উদ্ধৃতি দিয়ে পারথেস জানান, সুন্নি গোত্রের বিত্তশালী পরিবার থেকে আসা লন্ডনের কন্যা আসমা আল-আসাদ এবং তার পারিবারিক জীবন মোটামুটি স্বাভাবিক। আসমা বর্তমানে ব্যস্ত দামেস্কে একটি শিশু জাদুঘর নির্মাণে। তারা তাদের দুই সন্তান এবং মেয়ের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। তবে বোমা হামলার ভয়ে বর্তমানে এক জায়গায় ঘুমাচ্ছেন না তারা। তার এগার বছরের ছেলে হাফিজ আল-আসাদ সমপ্রতি ফেসবুকে যুক্তরাষ্ট্রকে সিরিয়ায় হামলা করার আমন্ত্রণ জানায়। যাতে যুক্তরাষ্ট্র একটি ভুল করে এবং মস্ত বড় শিক্ষা নেয়। গত সপ্তাহেও এক অনুষ্ঠানে আসাদকে আমুদে ভাবে দেখা গেছে। ইয়েমেনের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে হাসি তামাসা করছেন। ২০১১ সালের মার্চে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর তার সৌন্দর্যপ্রিয় সহধর্মিণীকে নিয়ে জনসম্মুখে মাঝে মাঝে হাজিরও হচ্ছেন। যদিও আগে হঠাত্ করে যেভাবে তিনি হাজির হতেন সেইভাবে তিনি হয়তো সবার মাঝে আসেন না। তারা দেখাচ্ছেন, সিরিয়ায় যেন কিছুই ঘটেনি বা ঘটছে না। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ যেন সিরিয়ায় নয়, ভিন্ন কোনো অঞ্চলে ঘটছে। ফ্যাশনপ্রিয় আসাদের স্ত্রীকে হালফ্যাশনেই দেখা গেছে। আসাদের এক সময় ঘনিষ্ঠ ছিলেন লেবাননের বৈরুতের আল সাফির পত্রিকার সম্পাদক তালাল সালমান। তার মতে, আসাদ এমনভাব দেখাচ্ছেন যে, এই রক্তপাত তার জন্য নয়, কিংবা তিনি যুদ্ধ করার কোনো মানুষই নন। আসাদের মনে হয় না যে, তিনি যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে আসাদ ক্রমেই বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হচ্ছেন। আসাদের মতো, তিনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। তিনি প্রতিনিয়ত সামরিক শক্তি বৃদ্ধিরও চেষ্টা করছেন তার হারানো অঞ্চল ফিরে পেতে। ফ্রান্সের সংবাদপত্র ‘লে ফিগারোতে’ এক সাক্ষাত্কারে বাশার বলেছেন, শুরুতে বিরোধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার একটা সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এখন সেটা নেই। কারণ তাদের ৯০শতাংশই আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত। তাদের সমঝোতার একমাত্র উপায় তাদের শক্তিকে শেষ করে দেয়া। গত এক বছরে আসাদ একবারের জন্যও বলেননি যে, সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বিদেশি কোনো শক্তি জড়িত বা তাদের ইন্ধন রয়েছে। আর দেশে গৃহযুদ্ধ হচ্ছে সেটাও তিনি স্বীকার করতে রাজি নন। আসাদ তার বাবার দ্বিতীয় পুত্র। তার বড় ভাই বাসেল ১৯৯৪ সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। ২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতা গ্রহণ করেন তিনি। তখন সিরিয়াবাসীর মনে অনেক আশা জেগেছিল। সবাই তাকে ‘আশার প্রতীক’ মনে করতো। আসাদ যখন কম্পিউটারে দক্ষতা অর্জন করেন তখন সিরিয়ায় কেবল ফ্যাক্স মেশিনের নিবন্ধন চলছিল। তিনি ইংরেজিতে কথা বলেন বেশিরভাগ সময়। সালমান বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের পর বাথ পার্টি প্রসঙ্গে আসাদ একবার বলেছিলেন, তার বাবা তার কাঁধে একটি মৃতদেহ ঝুলিয়ে দিয়েছেন। তার বাবা ১৯৭০ সালে পুলিশি রাষ্ট্র থেকে সিরিয়াকে সংস্কার করতে চেয়েছিলেন এবং চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু তিনি সেই সংস্কারে হাতই দেননি। বরং এখন পর্যন্ত বিশ্বাস করেন, সেই পুরানো প্রথা আবার শুরু করা যেতে পারে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশ্লেষক বলেন, তিনি সমঝোতা করেন না। আর তার হারানোর কিছু নেই। তিনি মনে করেন, তিনি যা করেন সেটিই শ্রেষ্ঠ। আসাদের কলেজ জীবনের বন্ধু আইমান আবদেল আল নূর বলেন, আসাদ মনে করেন পশ্চিমারা ধোঁকাবাজি করছে। তারা বড় ধরনের কোনো হামলা করবে না। কারণ বিরোধীদের বেশিরভাগই কট্টর ইসলামপন্থী। পশ্চিমারা তাদের মেনে নিবে না। তিনি মনে করেন, এই হামলা হবে সৌন্দর্যবর্ধক হামলা। আর বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই হামলা সাময়িকভাবে হলেও আসাদকে নবযৌবন দিতে সাহায্য করবে। নূর বলেন, অনেক সময় অনেকে জিততে পারে। কিন্তু এক মিনিটের জন্য হয়তো কেউ হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে পারে। ইয়েমেনে পার্লামেন্টের এক সংসদ সদস্য যিনি আসাদকে সমর্থন করেন। তিনি বলেন, গত ২৯ আগস্ট আসাদের সঙ্গে আলোচনা করার সময় তার মনোবল খুবই শক্তিশালী মনে হয়েছে। গত রমজানের শেষ দিকে আসাদের স্ত্রী আসমা আল-আসাদকে খাবার বিতরণ করতে দেখা গেছে। নিহত এবং আহত সৈন্যদের পরিবারের সদস্যদের এই খাবার দেয়া হয়েছিল। আসমা আসাদ এখনো নিয়মিত ব্যায়াম করেন এবং তার শারীরিক গঠনও অত্যন্ত সুন্দর।