কোথায় দাঁড়িয়ে সিপিএম
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর পঞ্চায়েতেও বড় পরাজয় হয়েছে সিপিএমের। এ অবস্থায় ঘনিয়ে আসছে লোকসভা নির্বাচন। বিশ্লেষকদের ধারণা এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের সঙ্কটের মুখোমুখি দলটি। তারা বলছেন, মুখে কংগ্রেস ও বিজেপির বিরোধিতার কথা বলা হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সিপিএমকে আবার কংগ্রেসের মুখাপেক্ষী হতে হবে। শুধু সিপিএমই নয়, অন্য বামেরাও নরেন্দ্র মোদি, বিজেপিকে রোখার নামে আবার কংগ্রেসের সহযোগী হবার সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে এগিয়ে যেতে চাইছে।
১৯৬৪ সালে সিপিআই ভাগ হয়ে সিপিআই ও সিপিএমে পরিণত হয়। এরপর ১৯৬৭ সালে প্রয়াত সিপিআই নেতা শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে ঠিক একইভাবে ‘হিন্দু ফ্যাসিবাদী’ জনসংঘকে রুখতে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের সঙ্গে আঁতাতের আহ্বান জানিয়ে সিপিএমের কাছে কংগ্রেসের দালাল বলে চিহ্নিত হয়েছিলেন। আজ বামপন্থি আন্দোলনের বড় পরিহাস সেই সিপিএম নেতাদের সোনিয়া গান্ধীর বন্দনা গাইতে ও কংগ্রেসকে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি হিসেবে সার্টিফিকেট দিতে হচ্ছে নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপিকে রোখার নামে।
১৯৬৪ সালে তেনালি পার্টি কংগ্রেসের পর সিপিএম কংগ্রেস বিরোধিতাকে লক্ষ্য রেখে ভারতীয় রাজনীতিতে যে উগ্র বামপন্থার জন্ম দিয়েছিল তা আজ স্তিমিত। মূলত সিপিএমের দুই কংগ্রেস ঘেঁষা প্রয়াত নেতা জ্যোতি বসু ও হরকিষাণ সিং সুরজিত সিপিএমের সত্ আদর্শবাদের দাবিদার বাম—মার্কসবাদী শক্তিকে কংগ্রেসের সহযোগী শক্তিতে পরিণত করে ফেলেছিলেন। অতীতে প্রথম ইউপিএ সরকার থেকে ভারত- মার্কিন পরমাণু চুক্তির ইস্যুতে সিপিএম ও বামেরা সমর্থন প্রত্যাহার করলেও রাজনৈতিক মহল মনে করছেন, সামনের লোকসভা নির্বাচনের পর সিপিএম আরো বেশি করে কংগ্রেস নির্ভরশীল রাজনীতি করবে। দেশজুড়ে কংগ্রেসের নেতৃত্বে সেকুলার ফ্রন্ট গঠনেও সিপিএমের সমর্থন জুটবে। সিপিএমের রাজনৈতিক লাইন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে, তাদের ৪৯ বছরের সুদীর্ঘ রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে তারা আদর্শগত ও নীতিগত অবস্থান থেকে সরে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক লাইন গ্রহণ করেছে। ১৯৬৪ সালে পার্টি তৈরির পর উগ্র কংগ্রেস— বিরোধিতা ও সিপিআই বিরোধিতার রাজনীতি চালানো হয়। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভেদে রুশ বিরোধী ও চীনপন্থি অবস্থান গ্রহণ করা হয়। ১৯৬৭ তে পশ্চিম বাংলায় কংগ্রেস রাজের অবসানে যুক্তফ্রন্ট রাজনীতির সূচনা হয়। সিপিএম এ সময় অতুল্য ঘোষ, প্রফুল্ল সেন বিরোধী কংগ্রেস নেতা অজয় মুখোপাধ্যায়, সুশীল ধাড়াদের সঙ্গে হাত মেলায় এবং চলতে থাকে তাদেও কংগ্রেস তথা ইন্দিরা গান্ধী বিরোধিতার রাজনীতি।
১৯৬৯ সালে কংগ্রেসের বিভাজন ঘটলে সিপিএম সুর পাল্টিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস গোষ্ঠীকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মদদ জোগাতে শুরু করে। ইন্দিরা গান্ধীর বিভিন্ন কর্মসূচিকে ‘প্রগতিশীল’ বলে গাওনা গাওয়াও শুরু হয়। এর পরিণতিতে সিপিএমের পশ্চিম বাংলা শাখার উগ্রপন্থি গোষ্ঠী মূলতঃ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যক্ষ সমর্থনে সিপিআই (এমএল) তৈরি করে সিপিএমের কংগ্রেস ঘেঁষা রাজনীতিকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানায়।
১৯৭০’র দশকে পশ্চিম বাংলা জুড়ে প্রবল নকশাল আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ১৯৭১’র নির্বাচনে সিপিএম বড় রকমের ধাক্কা খায়। কংগ্রেস সিপিআই ও অজয় মুখার্জির সাহায্যে রাজ্যে ‘গণতান্ত্রিক কোয়ালিশন’ সরকার গঠন করে। রাজ্য জুড়ে নকশালী সন্ত্রাস ও কংগ্রেসের আক্রমণের সামনে সিপিএম বিপদ বুঝে আবার কংগ্রেস বিরোধিতার রাজনীতি শুরু করে দেয়। সোভিয়েত রাশিয়ার মদদে ও জাতীয় পুঁজিপতিদের সাহায্যে ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিম বাংলায় সিপিএম নিধনে ব্রতী হন। তখন তার প্রধান সহযোগী হয়ে ওঠে সিপিআইএম।
সিদ্ধার্থ রায়ের আমলে ধারাবাহিক আক্রমণে সিপিএমের এগারোশ’ নেতা ও কর্মী খুন হয়; এলাকা ছাড়া হয় হাজার হাজার কর্মী ও সমর্থক। এ সময় ইন্দিরা গান্ধীর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে সিপিএম লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণের ছাতার তলায় আশ্রয় নেয়। ১৯৭৪’র এক সকালে কংগ্রেসের ‘আধা-ফ্যাসিবাদে’র বিরুদ্ধে লড়তে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে সিপিএমসহ কংগ্রেস বিরোধী শক্তিগুলো বিশাল গণমিছিল বের করে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন গভীর রাতে ভারতে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয় ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে। এর আগে এলাহাবাদ হাইকোর্ট নির্বাচনে অবৈধ উপায় অবলম্বনের দায়ে ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল করে দেন। এই সময়েই গুজরাটে জনসংঘ, সোশালিস্ট পার্টি, আদি-কংগ্রেসের সমন্বয়ে বিধানসভার নির্বাচনে জনতা ফ্রন্ট বিশাল জয় পায়। সিপিএমসহ অন্যান্য বামপন্থিরাও জনতা ফ্রন্টকে সমর্থন জানায়। জরুরি অবস্থার অবস্থানে ১৯৭৭-এ দেশে ঐতিহাসিক নির্বাচনে দিল্লির মসনদে প্রথম অকংগ্রেসী সরকার গঠন করে জনতা পার্টি। সিপিএম ও অন্যান্য বামপন্থিরা এই সরকারকে সমর্থনে এগিয়ে আসে। পশ্চিম বাংলায় জনতা পার্টি ও সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলোর মধ্যে ‘ফ্যাসিবাদী কংগ্রেস বিরোধী জোট’ গঠিত হয় ও পশ্চিম বাংলার নির্বাচনে কংগ্রেস শোচনীয় ফল করে, জনতা পার্টি- বাম জোট বিশাল সাফল্য পায়। জনতা পার্টিতে জনসংঘ থাকা সত্ত্বেও সিপিএম কোন সময়ই সাম্প্রদায়িকতার কথা তোলেনি। হঠাত্ মস্কোর কমিউনিস্ট নেতাদের নির্দেশে সিপিএম মোরারজি দেশাই’র নেতৃত্বে জনতা পার্টি ও সরকার পতনে কংগ্রেসের সঙ্গে একাত্ম হয়। ১৯৭৯ তে জনতা সরকারের পতন ঘটে এবং ১৯৮০ সালে নির্বাচন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৯৮০’র নির্বাচনে কংগ্রেস ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফেরে। সিপিএম ও অন্য কমিউনিস্টদের তখন নরম সুর দেখা যায়।
সাম্প্রদায়িকতা ও আরএসএস প্রশ্নে জনতা পার্টি বিভাজিত হয়ে বিজেপির উত্থান ঘটে। এ পরিস্থিতিতে সিপিএম আবার বিজেপি বিরোধিতায় নামে এবং হঠাত্ করে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন তোলা হয়। জ্যোতি বসু ও সুরজিতরা এই সময় থেকে দলকে কংগ্রেসমুখী করতে শুরু করেন। ১৯৮৪ সালে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হলে দেশে অকাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় রাজিব গান্ধী ক্ষমতায় ফিরলে রাজিব শাসনে বোফর্স কেলেঙ্কারি নিয়ে কংগ্রেসী বিক্ষুব্ধ নেতা বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের সঙ্গে রাজিব বিরোধী, কংগ্রেস বিরোধী অবস্থান নেয় সিপিএম। দেশ জুড়ে ওঠে কংগ্রেস বিরোধী হাওয়া। নতুন করে জনতা দল, বামপন্থি শক্তি ও বিজেপির মধ্যে আঁতাত গড়ে ওঠে। ১৯৮৯’র নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং ক্ষমতায় আসলে সিপিএম ও বিজেপি একত্রেই কংগ্রেস বিরোধী অবস্থান নেয়। এ সময় অটল বিহারী বাজপেয়ীর হাত ধরে জ্যোতি বসু কলকাতার ময়দানে সমাবেশ করেছিলেন। ভি পি সিং সরকারকে পরিচালনা করতে সমর্থনকারী সিপিএম, বিজেপি প্রভৃতি দল নিয়ে সমন্বয় কমিটিও গঠিত হয়। এরপর মন্ডল কমিশন ও অযোধ্যা প্রশ্নে সামাজিক ও ধর্মীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। বিজেপি সমর্থন প্রত্যাহার করায় ভি পি সিং সরকারের পতন ঘটলে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৯৯১-এ কংগ্রেসের সংখ্যালঘু সরকার নরসীমা রাওয়ের নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে। তখন বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের শর্ত মেনে উদার অর্থনীতি ও শিল্পনীতি গৃহীত হয়।
১৯৯৬’র নির্বাচনের পর কংগ্রেসের সমর্থনে ও সিপিএমের সক্রিয়তায় প্রথমে দেবগৌড়া ও পরে আই কে গুজরালের যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। দু’বারই সোনিয়া গান্ধী যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতনের কারণ হয়ে ওঠেন। এরপর ১৯৯৮ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপি জোট ক্ষমতায় ফেরে। ১৩ মাসের মাথায় কংগ্রেস ও কমিউনিস্টরা সাম্প্রদায়িকতা ও ‘হিন্দু ফ্যাসিবাদে’র বিরুদ্ধে বিপদের কথা বলে নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনিবার্য করে তুলেছিলো।
১৯৬৪ সালে উগ্র বামপন্থা থেকে সিপিএমের উত্থান। সেই সিপিএমই এখন সুর নরম করে কংগ্রেসের নেতৃত্বে কেন্দ্রে ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রন্ট সরকার গঠনের আওয়াজ তুলছে। সমালোচকরা বলছেন মার্কসবাদ নয়, সংসদীয় ক্ষমতা দখলই এখন তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য। বিভিন্ন সময়ে এজন্য সুবিধাবাদী রাজনীতির পথ গ্রহণ করা হয়েছে। সিপিএম আজ এক গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে। দলীয় আদর্শ ও নীতি থেকে সরে আগামী লোকসভা নির্বাচনে যে সিপিএম ও অন্য বামেরা বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদি বিরোধিতায় কংগ্রেসমুখী হবে তা বলাই বাহুল্য।