নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে অবাধে আসছে ইয়াবা, হেরোইন
নুরুল আলম সাঈদ, নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:১৩
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড-লাওস ভিত্তিক মাদক ও অস্ত্র পাচারের অন্যতম রুটটি ফের চাঙ্গা হয়ে উঠেছে । মিয়ানমারের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে পার্বত্য বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি ও পর্যটন নগরী কক্সবাজারে প্রায় অবাধে আসছে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র এবং ইয়াবা, হেরোইনসহ হরেক রকম বিদেশি মাদকদ্রব্য।
অস্ত্র ও মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট বলে পরিচিত সীমান্ত সংলগ্ন নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম এলাকার পাহাড়ি দুর্গম অরণ্যের প্রতি সরকারের বিশেষ নজরদারির দাবি অনেকদিন থেকেই করে আসছেন স্থানীয় সচেতন মহল। নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া, টেকনাফের ৫ শতাধিক কিশোর-যুবককে কাঁচা টাকার লোভ দেখিয়ে এসব মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে । সক্রিয় হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক চোরাচালানি মাফিয়া চক্র ।
সম্প্রতি স্নায়ু উত্তেজক ইয়াবা ট্যাবলেট, হেরোইনসহ নানা রকম মাদকদ্রব্য এবং ড্রাইজিন, হুইসকিসহ হরেক রকম মদ পাচারের ব্যস্ত রুটে পরিণত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা। দুইদিক হয়ে এই রুটটি ব্যবহূত হচ্ছে। এর একটি মিয়ানমার-বাংলাদেশের উপকূল সংলগ্ন সমুদ্র এবং অন্যটি হচ্ছে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন টেকনাফ, উখিয়া, পার্বত্য বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলীকদম সংলগ্ন দুর্গম পথ এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও টেকনাফ-আরাকান সড়ক। একাধিক সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্র ও স্থল পথে মাদক পাচারকারীরা মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, সিঙ্গাপুর, চীন, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশের মাধ্যমে ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের সাথে সংযুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। জানা যায়, গত ৪/৫ বছরে এই রুট দিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, বিস্ফোরক ও স্বর্ণ ছাড়াও বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু পাচার হয়েছে ।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার ও বান্দরবানের ৫ শতাধিক কিশোর-যুবা মাদকদ্র্রব্য পাচার কাজে ব্যবহূত হয়ে আসছে। এদের অনেকে বিভিন্ন মামলায় আটক হলেও জামিনে বেরিয়ে এসে ফের মাদক পাচারের কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এদের অনেকে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান। এরা প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, জিপ, মোটরবাইকসহ প্রভৃতি যানবাহন যোগে মাদক পাচার করে থাকে। এদের গডফাদাররা বিভিন্ন কাস্টমস , চেকপোস্টসহ সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে থাকেন বলে জানা গেছে। গত জানুয়ারিতে বিপুল সংখ্যক ইয়াবা ট্যাবলেট পাচারকালে ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা ‘ইয়াবা সুন্দরী’ রিয়া (২২) ও জাহাঙ্গীর (৩৪)কে পাজারো জিপসহ আটক করে টেকনাফের হোয়াইক্যং হাইওয়ে পুলিশ। গত ৬ মাসে বিজিবি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা শহরের লিংক রোড, বালুখালী ও ঘুমধুম চেকপোস্টে প্রায় কোটি টাকার হেরোইন ও ইয়াবা ট্যাবলেটের চালান আটক করেছে। বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি থানা সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ জানুয়ারি গোপনে খবর পেয়ে কক্সবাজার র্যাব ৭ বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৭৮০টি ইয়াবা ট্যাবলেটসহ কক্সবাজারের রামু উপজেলার মন্ডল পাড়ার মোতাহের আহমদের পুত্র জয়নাল আবেদীনকে (৩০) নাইক্ষ্যংছড়ি পুরাতন বাস স্টেশন এলাকা থেকে আটক করে নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় সোর্পদ করে। এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ি বাজারের এক ব্যবসায়ীর ছেলে দেলোয়ার ৪/৫ জন উঠতি বয়সী যুবক নিয়ে মোটরবাইক যোগে সপ্তাহে ২-৩ হাজার পিস ইয়াবার ৩-৪টি চালান পাচার করে আসছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়। ঘুমধুম বিজিবি ক্যাম্পের সুবেদার বলেন, নুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের দায়িত্বের কোন ক্রটি নেই। স্থানীয় চোরাকারবারীরা আমাদেরকে ফাঁকি দিয়ে কৌশলে কিছু কিছু মাদক পাচার করছে। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে এত চেকপোস্ট থাকার পরও কিভাবে মাদক পাচার হয় জানতে চাইলে মরিচ্যা যৌথ চেকপোস্টের সুবেদার বলেন, যে সমস্ত যানবাহন দিয়ে মাদক ও চোরাচালান এবং চোরাইপণ্য পাচার হয়ে থাকে তা আমাদের হাতে ধরা পড়েছে। সড়ক পথের পরিবর্তে অন্যপথে মাদক পাচার হলে সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার থাকে না। নাইক্ষ্যংছড়িস্থ ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী হাসান বলেন, টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় মিয়ানমারের ৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। স্থানীয় রোহিঙ্গাদের সহযোগিতায় মাদক ব্যবসায়ীরা মাদক পাচার করে থাকে। তিনি বলেন, মাদক পাচার বন্ধ করা বিজিবির একার পক্ষে সম্ভব নয়, এজন্য দরকার সমন্বিত উদ্যোগ।