রুদ্ররূপী ব্রহ্মপুত্র যমুনা
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫০
উত্তরবঙ্গে রুদ্ররূপ ধারণ করেছে দেশের অন্যতম প্রধান দুই নদ-নদী ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা। উত্তরবঙ্গের বিরাট অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক ভাঙ্গনে মেতে উঠেছে শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাণপ্রবাহিনী দুই নদ-নদী। ফসলি জমি, ঘরবাড়ি আর মূল্যবান রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান হারিয়ে যাচ্ছে উন্মত্ত নদ-নদীর গর্ভে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে পানির উচ্চতা, ক্রমশ স্ফীত হচ্ছে নদী।
ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, ব্রহ্মপুত্রের পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় গাইবান্ধার ফুলছড়িতে বন্যা দেখা দিয়েছে। নবাবগঞ্জ থেকে নীলকুঠির বেড়িবাঁধটির ফুলছড়ির মন্ডলপাড়া ও সাঘাটার ভাঙ্গামোড় নামক দু’টি স্থানে ভাঙ্গন দেখা দিলে গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে বাঁধটি রক্ষার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ব্রহ্মপুত্র ফুঁসে উঠায় গত ২৪ ঘণ্টায় বালাসী এবং তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কাতলামারী, গলনা, জিয়াডাঙ্গা, ভাজনডাঙ্গা, ফুলছড়ি ইউনিয়নের পিপুলিয়া, গাবগাছী, খোলাবাড়ি, উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর, হাজীরহাট, কালাসোনা, ফজলুপুর ইউনিয়নের খাটিয়ামারি, নিশ্চিতপুর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার রোপিত আমন, ভুট্টা, বেগুনসহ ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। নবাবগঞ্জ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হতে নীলকুঠি পর্যন্ত বেড়িবাঁধে ফুলছড়ির মন্ডলপাড়া ও সাঘাটার ভাঙ্গামোড় নামক স্থানে ভাঙ্গন দেখা দিলে স্থানীয় লোকজন বাঁশ ও মাটির বস্তা ব্যবহার করে ভাঙ্গন রোধের চেষ্টা করে। সোমবার ফুলছড়ি-সাঘাটার এমপি ফজলে রাব্বী মিয়া ভাঙ্গনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। মন্ডলপাড়া গ্রামের কৃষক মোস্তফা মিয়া জানান, বাঁধটি ভেঙ্গে গেলে বাঁধের পশ্চিমাংশের এলাকা প্লাবিত হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। প্রায় ২ হাজার একর জমির ফসল বিনষ্ট হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল মোস্তফা আশাফুদ্দৌলা বলেন, বেড়িবাঁধটি ডব্লিউএফপি’র নির্মিত হওয়ার কারণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু করার নেই। তবে কারিগরি সহযোগিতা দেয়া যেতে পারে।
রাজীবপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ব্রহ্মপুত্র নদে হঠাত্ করেই অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে নদের তীরবর্তী ও নিমাঞ্চল ডুবে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী পয়েন্টে ৪০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডসূত্রে জানা গেছে।
অসময়ে ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলা প্রশাসনসূত্রে জানা গেছে, রাজীবপুরে ২০ ও রৌমারীতে ১০টি গ্রাম বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। রৌমারী উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।’ পানি বৃদ্ধির সঙ্গে নদীভাঙ্গনও দেখা দিয়েছে। রাজীবপুরের কোদালকাটি ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম জানান, তার এলাকায় নদী ভাঙ্গন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত ৭ দিনে বল্লভপাড়া, তেররশিপাড়া ও খাড়ুভাঁজ তিনটি গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে। এখন ভাঙ্গছে সাজাই কারিগরপাড়া, শংকর মাদবপুর, উত্তর কোদালকাটি আরো তিনটি গ্রাম। অসময়ে বন্যা দেখা দেয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে সদ্য লাগানো রোপা আমনের। সংশ্লিষ্ট দুই উপজেলায় প্রায় ২ হাজার হেক্টর রোপা আমন ডুবে গেছে বলে কৃষি অফিসসূত্রে জানা গেছে। রাজীবপুর উপজেলার ২৩৫৭ হেক্টর রোপা আমনের মধ্যে ১৫১৫ হেক্টর এখন পানির নিচে। এ তথ্য জানিয়েছেন রাজীবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আখরুজ্জামান। তিনি জানান, পানি দ্রুত না নামলে ওইসব জমির ধান সম্পূর্ণ ক্ষতির আশংকা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পানি বাড়ছে আর একের পর এক রোপা আমন ক্ষেত ডুবছে। রাজীবপুরের করাতি পাড়া গ্রামের কৃষক ছবর আলী বলেনঃ ‘ধারদেনা কইরা দুই বিঘা জমিত আমন গাড়ছিলাম। এমনতি পাট আবাদ কইরা লোকসান খাইছি। এহন পানিতে ধান খাইয়া গেলে মরণ ছাড়া কোন উপায় থাকব না।’ ছবর আলীর মতো ওই এলাকার সব কৃষকের একই পরিণতি দেখা গেছে।’ কেঁচোমারী চরের কৃষক ছলেমান মিয়া বলেনঃ ‘সবেমাত্র ধান গাড়লাম আর বন্যার পানি আইল। এহন কী অবো। আমার তো সব শ্যাষ।’ ওই চরের কৃষক নুরুন্নবী, আলী আকবর, আরফান আলী জানান, এই চরে প্রায় একশ’ একর রোপা আমন ডুবে গেছে। মানুষের বাড়িঘরেও পানি ঢুকছে। কৃষকরা জানান, হঠাত্ এ বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতি হবে রোপা আমনের।
কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কাজীপুরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৩ ফুট পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানকার বিলচতল, ঢেকুরিয়া, সুতানারা, শ্রীপুর, বদুয়ারপাড়া, মল্লিকপাড়া, মেঘাই, আটাপাড়া, খুদবান্দিসহ চরাঞ্চলের ৮/৯টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী ঢেকুরিয়া হাট বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে এখানকার দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ঢেকুরিয়া, জগত্গঞ্জ, বিলচতল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ওঠায় বন্ধ হয়ে গেছে পাঠদান কার্যক্রম। এদিকে বিভিন্ন স্থানে তীব্র ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভেটুয়া গ্রাম তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে। ভেটুয়া থেকে নিশ্চিন্তপুর গ্রাম পর্যন্ত বাঁধের আধা কিলোমিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ওই এলাকার ইউপি সদস্য মিল্টন তালুকদার জানান, গত তিনদিনে ভেটুয়া গ্রামের অর্ধশত ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন আতঙ্কে ভেটুয়া বাঁধ সংলগ্ন বাজারের প্রায় ৩০টি দোকান সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, চৌহালী উপজেলা সরকারি অফিস ও আবাসিক ভবনগুলো একের পর এক বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সোমবার সকালে যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে উপজেলা বিআরডিবি অফিসের দোতলা ভবন। উপজেলা পরিষদের মূল স্থাপনা ভাঙ্গন থেকে মাত্র ১০ গজ দূরে থাকায় যেকোন সময় ভেঙ্গে যেতে পারে।