‘মঙ্গার ধান’ কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে গঙ্গাচড়ায়
কমল কান্ত রায়, গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫১
রংপুরের গঙ্গাচড়ায় গ্রামে গ্রামে এখন আমন ধানের গন্ধ। কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক। তবে আরও ২০/২৫ দিন পর ধান কাটা হবে। আশ্বিন মাসের প্রথম দিকে এ ধান উঠবে কৃষকের গোলায়। আমন ধানের স্বল্প মেয়াদী এই জাতগুলোকে অনেকে বলেন ‘মঙ্গার ধান’। মূলত আশ্বিন-কার্তিক মঙ্গার (অভাব) মাসে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই এই জাতগুলো উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট ।
সাধারণত রংপুর অঞ্চলে আশ্বিন-কার্তিক মাস অভাবের মাস হিসাবে পরিচিত। এ সময় কৃষকের ঘরে খাবার থাকে না। থাকে না শ্রমিকের মজুরি। হাজার হাজার শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। তাই এই মাসে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট বিআর-৩৩, ব্রি-ধান ৫৭ নামের স্বল্প মেয়াদী এই জাত আবিষ্কার করে। এর জীবনকাল ১০৫-১১০ দিন। যেখানে অন্যান্য জাতের জীবনকাল ১৪০-১৫০ দিন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা এখন অনেক সচেতন। তারা আমন মৌসুমেও হাইব্রিড ধানের চাষ করছেন। আগাম আমন, আগাম আলু এবং আগাম বোরো কিংবা ভুট্টা, ডাল- এই শস্য বিন্যাসকে কাজে লাগিয়ে তারা এখন অনেক সফল।
কৃষকরা জানান, আগাম ধান ওঠার পর সেখানে আগাম আলু করলে খরচ কম হবে। ৪/৫ বছর আগেও কৃষকরা দীর্ঘ মেয়াদী জাতের উপর নির্ভরশীল থাকতো। আশ্বিন-কার্তিক মাসে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট-এর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় এ ধানের ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। এ কারণেই কৃষকদের মাঝে আগ্রহ বেড়ে গেছে। এর সুফলও পাচ্ছেন কৃষকরা।
উপজেলার হাবু, বালারঘাট, কিসামত হাবু, চেংমারী, মান্দ্রাইন, কুঠিরপাড়, জয়দেব, বেতগাড়ী, খাপড়ীখালসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষেত জুড়ে দোল খাচ্ছে মাথা হেলান আমন ধানের শিষ। কোন কোন ধানে লেগেছে রং। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে কৃষকের বুকে তাই অপার আনন্দ! কেউ বা লাগিয়েছেন বিআর-৩৩, কেউবা বিনা-৭, কেউবা লাগিয়েছেন অন্য হাইব্রিড জাতের ধান। হাবু গ্রামের কৃষক আলা মিয়া ৪০ শতক জমিতে ব্রি-ধান-৪০, মোফাচ্ছের বিআর-৩৩, আব্দুল খালেক ৩৩ শতক জমিতে ব্রি-ধান-৩৩ লাগিয়েছেন। খলেয়া ইউনিয়নের খাপড়ীখাল গ্রামের হামিদুল ইসলাম ২ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের ধান লাগিয়েছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর ১৯ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের ধান লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বিআর-৩৩ লাগানো হয়েছে ৭২৫ হেক্টর জমিতে, ব্রি-ধান-৩৯, ১৫০ হেক্টর, বিনা-৭ ২ হাজার ৪শ’ হেক্টর, বিনা-৪ ৫০ হেক্টর, হাইব্রিড ৩৬০ হেক্টর এবং দেশি ধান লাগানো হয়েছে ৩শ’ হেক্টর জমিতে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, কৃষকদের মাঝে আগাম ফসল উত্পাদনে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষকরা এখন অল্প খরচে বেশি লাভ করতে চায়। তাছাড়া আশ্বিন-কার্তিক মাসে ফসল উঠলে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। কৃষকরাও ফসলের ন্যায্য মূল্য পায়।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট রংপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গৌছ আলী জানান, স্বল্প মেয়াদী ধান শস্য বহুমুখীকরণে সহযোগিতা করে। তাছাড়া রংপুর অঞ্চলে আশ্বিন-কার্তিক মঙ্গার সময় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। আর সর্বোপরি স্বল্প মেয়াদী ধানের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের কোন প্রভাব পড়ে না।