শিক্ষাকে কেমন করে কাজে লাগাতে হবে, তা অনুধাবন জরুরি

জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, স্বাধীনতার ৪২ বছরেও আমরা দেশে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে সক্ষম হইনি। এখনও ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা, দেশ পরিচালনা ও বিচার ব্যবস্থা আমাদের দেশে বিদ্যমান। একই সময় বিদেশি শাসন মুক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা এসব ক্ষেত্রে সংশোধন করতে পারলেও আমরা সংযোজন ধারায় সীমাবদ্ধ রয়েছি। তিনি গতকাল সোমবার পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার সদর ও ধাওয়া ইউনিয়নে শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে স্থানীয় বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সাথে পৃথক দু’টি মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আরও বলেন, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে সিলেবাস ও প্রশ্নপত্রে ধারা পরিবর্তন করা হয়। যারা বাংলায় পড়ে তাদের ইংরেজিতে মাত্র ২০০ মার্ক থাকে। বাংলায় ৪/৫টি রচনা দিয়ে একটি লিখতে বলা হয়। আর ইংরেজিতে মাত্র একটি লেখার সুযোগ থাকে। শিক্ষকদের অভিযোগ, সাধারণ শিক্ষায় ৫ম শ্রেণিতে বৃত্তি থাকলেও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় এ সুযোগ নেই। এ ধরনের বৈষম্য কাম্য নয়। পশ্চিমাদের পরামর্শে বাংলাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার রাষ্ট্রসমূহে শিক্ষা পরিচালিত হয়। আমরা বলি শিক্ষা আমাদের মেরুদণ্ড। অথচ ৪২ বছরের মধ্যে গত ১০/১২ বছরে এ কথাটি উপলব্ধি করে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা হচ্ছে। শুধুই জীবন ধারণের মধ্যে শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন নয়। শিক্ষা অর্জনের অর্থ হচ্ছে এর মাধ্যমে জীবনকে দেশ ও দশের প্রয়োজনে কিভাবে ব্যবহার করা যায়। তাহলেই সেটা হবে সুশিক্ষা। শিক্ষাকে কেমন করে কাজে লাগাতে হবে তা অনুধাবন করা আবশ্যক। যতটুকু শেখা হবে তা কাজে লাগাতে হবে এবং জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করা গেলে উদ্দেশ্য সফল হবে। আনোয়ার হোসেন শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদের দেশে ছাত্রদের শিক্ষকরা এ কথা জিজ্ঞাসা করেন না যে, কেন ছাত্ররা শিখতে আসছে। অথচ বিদেশে এ প্রশ্নটি করা হয়। আবার বিদেশি শিক্ষার মধ্যে বৃটিশ ও আমেরিকার শিক্ষার ধরন ভিন্ন। প্রাথমিক শিক্ষায় বৃটিশ পদ্ধতি ও উচ্চশিক্ষায় আমেরিকার পদ্ধতি শ্রেয়। আমাদের দেশে দুই পদ্ধতিকেই অনুসরণ করা হয়। যার প্রভাব আমাদের সমাজে পড়ে। আবার সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে আমাদের অভিভাবকরা তাদের জন্য বেহেস্তের দ্বার উন্মুক্ত করার প্রয়াসও পান। আনোয়ার হোসেন বলেন, যে অবস্থার মধ্য দিয়ে দেশ চলছে তা কাম্য নয়। যদি কার্যকর প্রশাসন দেশে থাকত সর্বব্যাপী যে সমস্যা তা দূর হতো। উপজেলা-জেলা-বিভাগ এমনকি সংসদ পর্যায়ে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার জন্য সমস্যার সমাধান হয় না। যা স্বাধীন দেশে অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনে স্বাধীন দেশ সৃষ্টির জন্য রাজনীতি করেছি। নির্ভয় জীবন-যাপন করার জন্য যে আশা নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছি সে স্বপ্ন-সাধ পূরণ হয়নি। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হবে এই জন্য রাজনীতি করিনি, স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেইনি। যেমন আমার মত হাজার হাজার তরুণসহ সেদিন লাখ লাখ জনতা একই উদ্দেশ্য নিয়ে স্বাধীনতার জন্য সক্রিয় ছিলেন। ৪২ বছরেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরের অভ্যাস আমাদের রাজনীতিতে গড়ে ওঠেনি। আমরা কেউ হারতে চাই না, জিততে চাই। যেকোন ভাবে ক্ষমতায় আসি এবং বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চাই। এ অভ্যাস থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক সরকারের সময় সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকার প্রদানে তারা সচেতন থাকেন না। আজ কলকারখানা ধ্বংসের সম্মুখীন। এ কারণে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত হচ্ছে। আমরা সুখী-সুন্দর-শান্তিপূর্ণ নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ অর্জনে ক্ষমতা হস্তান্তরের রাজনীতি অব্যাহত রাখতে চাই। গতকাল সোমবার সন্ধ্যার পর ভাণ্ডারিয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে উক্ত ইউনিয়নে শিক্ষার মান উন্নয়ন বিষয়ে স্থানীয় বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ ও ম্যানেজিং কমিটির সাথে এক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন। সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরোয়ারের সভাপতিত্বে এখানে আরও বক্তব্য রাখেন উপাধ্যক্ষ মাওলানা ফারুক হোসাইন, শিক্ষক সৈয়দ হাবিবুর রহমান, কিরণ চন্দ্র বসু, আব্দুর রাজ্জাক, ওমর ফারুক প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রেজাউল আহসান রাজু। এখানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভাণ্ডারিয়ার উপজেলা চেয়ারম্যান মাহিবুল হোসেন মাহিম, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দা জাহানারা বারেক, ভিটাবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপু প্রমুখ। সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন দুপুরে ভান্ডারিয়ার ধাওয়া আয়শা সিদ্দিকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু এর সভাপতিত্বে যে মতবিনিময় সভা করেন সেখানে আরও বক্তব্য রাখেন বিশেষ অতিথি জেপি’র কেন্দ্র প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক ওমর ফারুক, এম এ কাইয়ূম জামান, আবুল আহসান মালকর, মো. তৈয়বুর রহমান, জাকির হোসেন কবির, দেলোয়ার হোসাইন, মো. আলামীন হাওলাদার, আব্দুল হাই, মো. শহীদুল ইসলাম, আব্দুল বারী প্রমুখ শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির কর্মকর্তাবৃন্দ। অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন প্রভাষক মাসুদুজ্জামান। এসময় অন্যান্যের মধ্যে মঞ্চে ছিলেন গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপু, পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির সাবেক সভাপতি ইউসুফ আলী আকন প্রমুখ। বিকালে আনোয়ার হোসেন ভান্ডারিয়ায় দুঃস্থ কল্যাণ সংস্থার কার্যালয়ে সংস্থার নেত্রীদের সাথে এক মতবিনিময় বৈঠক করেন। এখানে তিনি সংস্থার কর্মতত্পরতার বিভিন্ন দিক নিয়ে নির্দেশনা মূলক বক্তব্য রাখেন। এখানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংস্থার মহাসচিব মাহিবুল হোসেন মাহিম, উপদেষ্টা এম এ রব্বানী ফিরোজ, কর্মকর্তা গাজী আতাহার আলী প্রমুখ। এর আগে বিকালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু চরখালীতে রফিকুল ইসলাম কবিরের কবর জেয়ারত, ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করেন। সমপ্রতি কবির ঢাকায় ইন্তেকাল করেছেন। গত রবিবার রাতে ভান্ডারিয়া উপজেলার ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়ন জাতীয় পার্টি (জেপি) কার্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশ, মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন দলের চেয়ারম্যান ও সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। এখানে তিনি বলেন, রাজনীতি করতে হলে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে হবে। ৩০ বছর ধরে এলাকার মানুষের সাথে আমি কথা বলি। এক্ষেত্রে একটি উপলব্ধির বিষয় আছে, সেটি হল রাজনীতিতে ভিন্ন দল থাকবে, মত থাকবে, যার যার রাজনীতি তিনি করবেন, কিন্তু উন্নয়নের স্বার্থে সকলকে এক থাকতে হবে। তা না হলে পরে উন্নয়ন কাজ ব্যাহত হয়। আমি ’৮৪ সালে যখন ভান্ডারিয়ায় আসতাম তখন যে পরিবেশ দেখতাম এখন তা বদলে গেছে। ২০১৩ সালে ভান্ডারিয়ার হাট-বাজার, যোগাযোগ, বিদ্যুত্, শিক্ষা ব্যবস্থাসহ নানা ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে রাজনীতিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তাই নির্বাচন হবে কি হবে না তা নিয়ে আমরা শংকিত। তারপরেও আশা করছি নির্বাচন হবে। তাই দেশের মানুষ যাতে শান্তিতে থাকতে পারে সেজন্য সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। রাজনীতিতে এখন নানা পরিবর্তন এসেছে। একদল বলছে টেনেহিঁচড়ে নামাবো, আরেক দল বলছে নির্বাচন হবেই হবেই হবে। জঙ্গিবাদ নির্মূলের নামে আমাদের মত গরিব দেশে যা হচ্ছে তা নিয়ে নানামুখি দুশ্চিন্তা আছে। আনোয়ার হোসেন আরো বলেন, অতীতে ভান্ডারিয়া একটি দ্বীপের মত ছিল। আজ ভান্ডারিয়ার সাথে রাজাপুর, কাঠালিয়া, বানাই, ঝালকাঠী, বরিশাল, পিরোজপুর, কাউখালীসহ রাজধানী ঢাকার সাথে যোগাযোগ ও বিদ্যুত্ ব্যবস্থায় আমরা অনেক সুফল অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। আজ ভান্ডারিয়ার মানুষ বাংলাদেশের কথা ভাবে এবং বিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রসহ এই যে উন্নয়ন এটা ধরে রাখতে এবং মানুষ যাতে সুখে-শান্তিতে থাকতে পারে সেজন্য আল্লাহর কাছে মোনাজাত করতে হবে। ভিটাবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধার সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জেপি’র কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মাহিবুল হোসেন মাহিম, জেপি’র কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও মীর কাদিমের সাবেক পৌর মেয়র মোহাম্মদ হোসেন রেনু, গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপু, ভান্ডারিয়া সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি কামাল উদ্দিন জোমাদ্দার, উপজেলা ছাত্র সমাজের সভাপতি মো. মোস্তফা সিকদার, জেপি’র ইউনিয়ন সভাপতি মো. আব্দুল হালিম শরীফ, সাধারণ সম্পাদক রেজা আহম্মেদ দুলাল, ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান সাব্বির, সহ-সভাপতি বিধান চক্রবর্তী, যুবসংহতির ইউনিয়ন আহ্বায়ক পরীক্ষিত মিশ্র, ইউনিয়ন ছাত্র সমাজের আহ্বায়ক মতিউর রহমান বুলবুল, হরি নারায়ণ চক্রবর্তী প্রমুখ। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেপি’র কেন্দ্র মুনিরুল আহসান মনির সরদার, শওকত ইকবাল মিটুল মল্লিক, ফোরকান মুন্সী, ছাত্র সমাজের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ, রাহাত জোমাদ্দারসহ জেপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মিগণ। এ অনুষ্ঠানে এলাকার বিভিন্ন স্তরের শত শত নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া মোনাজাত করেন হাফেজ মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান। পরে ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়ন জাতীয় পার্টি (জেপি) কার্যালয় উদ্বোধন করেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।