হারিয়ে যাচ্ছে কড মাছ
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:৫১
কড নর্থ সির প্রধান মাছ। এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে, বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। কয়েক দশক ধরেই এই কড মাছ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। কমে যাচ্ছে এর উত্পাদন, বিপণন তথা ভোগ। নর্থ সির জেলেদের জন্য এখন সবচেয়ে দুরূহ কাজ হচ্ছে তাদের জালে এই কডকে আবদ্ধ করা। গত কয়েক বছর ধরে তারা এমনকি ব্যর্থ হচ্ছে সরকার, নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী কড ধরতে। বিজ্ঞানীরাও অনেক দিন যাবত্ সতর্কবাণী উচ্চারণ করে আসছেন কডসংখ্যা উত্তরোত্তর হ্রাস পাচ্ছে। কারণ, এদের অধিকাংশই ধৃত হয় প্রজনন সময়ের পূর্বে। সমুদ্রের হ্যামবার্গার খ্যাত এই কড এখন কডপ্রিয় নৃগোষ্ঠীর কাছে নিছক বিলাসিতা। ব্রিটেনে কোনো রেস্তোরাঁয় এক টুকরো কডের অর্ডার দেয়া মানেই চার পাউন্ডের কঠিন দন্ত। অর্থাত্ সংশ্লিষ্ট সকলেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন কডের দুষ্প্রাপ্যতা ও সম্ভাব্য বিপর্যয় সম্পর্কে। এখন অনেকেই এই কড প্রজাতি রক্ষায় গ্রহণ করতে শুরু করেছেন কার্যকর পদক্ষেপ। যেমন, গত ২০০০ সালের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং নরওয়ে যারা যৌথভাবে নর্থ সির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছিলেন যাতে কড ধরার কোটা শতকরা ৩০ ভাগ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নর্থ সির এক পঞ্চমাংশ এলাকায় যা স্কটল্যান্ড থেকে নেদারল্যান্ডস পর্যন্ত বিস্তৃত ঐসব এলাকায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে কড মাছ ধরা, যাতে সঠিক সময়ে কডরা প্রজনন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে। তবে এই ঘোষণায় ব্রিটেনের ফিশিং ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই কড ধরার কোটা হ্রাস করায় জেলেরা আর্থিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এই কড প্রজাতির অস্তিত্ব সত্যিকার অর্থেই টিকিয়ে রাখতে হলে এই কোটা আরো অনেক কমিয়ে আনতে হবে।
শুধু নর্থ সিই এই সংকটের মধ্যে আছে তা নয়, জাতিসংঘের ফুড এ্যান্ড এ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী পৃথিবীর শতকরা ২৮ ভাগ মাছের মজুদই ইতোমধ্যে নিঃশেষিত হয়ে গেছে। ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে নিউফাউন্ডর্যান্ড এ্যান্ড ব্যাংকে কড মাছের বিপুল মজুদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়; যা কানাডিয়ান সরকারকে বাধ্য করে এই ফিশারি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে। তবে আরো দুঃখের বিষয় যে, এই ঘটনা থেকে এতদিন পর্যন্ত ইউরোপীয়রা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। নোবাস্কটিয়ার ডালহৌসি ইউনিভার্সিটির এক ফিশারিজ বায়োলজিস্ট আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই নর্থ সিতে রয়েছে কতিপয় স্বনামধন্য বিজ্ঞানী, সমৃদ্ধ মেরিন ল্যাব, তা সত্ত্বেও এখানে ফিশিং নিয়ন্ত্রণ না করতে পারাটা সত্যিই চরম ব্যর্থতা’।
সবচেয়ে আরো পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এই ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়াটি শুরু হয় বিজ্ঞানের মাধ্যমে। কিন্তু শেষ হয় রাজনৈতিক দ্বারা, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের প্রতিনিধি সারাহ জোনস দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘মাছের মজুদ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয় রাজনৈতিকভাবে, আর যা মূলত রাজনীতিবিদগণের ইন্ডাস্ট্রিকে আরো সতেজ করে তোলে’।
নর্থ সির কড মাছ সাধারণত চার বছর বয়সে তাদের ডিম ছেড়ে থাকে। সম্প্রতি নর্থ সিতে বিরাজমান উষ্ণ তাপমাত্রা এই কডদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির হার মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে। কারণ এই কড প্রজাতি চারিত্রিকভাবে খুবই শীতপ্রিয় একটি মাছ। তবে কড প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা এখনো লোপ পায়নি। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিজ্ঞানীদের এবং সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের কাউন্সিল অব ফিশারিজের মন্ত্রিগণের দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমেই একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণেই সম্ভব হবে অজস্র কডের অস্তিত্ব।