ঘর আলো করে বেড়ে উঠছে অনাকাঙ্ক্ষিত শিশুরা
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫৮
পৃথিবীতে যাদের আগমন ঘটেছিল অনাকাঙ্ক্ষিত হিসাবে; তারাই এখন বেড়ে উঠছে ঘর আলোকিত করে! রবীন, নবীন, আকাশ, অপি ওদের নাম। কারো বয়স একমাস, কারো বা ছয়মাস, আবার কারো বয়স এক থেকে দুইবছর। কারো জন্ম হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্রে, কারো বা জন্মের পরই জায়গা হয়েছে ডাস্টবিনে। তবে ওদের পরিচয় একটাই- ‘ওরা অনাকাঙ্ক্ষিত ও পরিত্যক্ত শিশু’। ওদের ঠিকানা এখন বেসরকারি সংস্থা ‘হীড বাংলাদেশ’র মিরপুরের আশ্রয় কেন্দ্র। তবে নিষ্পাপ এই শিশুরা জানে না, কোন অপরাধে বাবা-মায়ের স্নেহ-আদর ছাড়াই ওদের বড় হতে হচ্ছে এই আশ্রয় কেন্দ্রে।
অনাকাঙ্ক্ষিত ও পরিত্যক্ত এই অসহায় শিশুদের সমাজে পুনর্বাসনের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮১ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে ‘হীড বাংলাদেশ’। তাদের এই প্রকল্পের নাম ‘সেন্টার ফর ট্রেনিং এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন অব ডেস্টিটিউট উইম্যান’ (সিটিআরডিডব্লিউ)। এসব শিশুদের সমাজের স্বচ্ছল-শিক্ষিত পরিবারে সন্তান হিসেবে ‘দত্তক’ দিয়ে থাকে সংস্থাটি। ২০০৩ সাল থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত মোট ৭৩৩ জন শিশুকে বিভিন্ন পরিবারে ‘দত্তক’ হিসেবে হস্তান্তর করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের অনেকেই এখন দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন পরিবারে বড় হচ্ছে।
মিরপুরের আরিফাবাদ হাউজিং এর ৪নং সড়কে অবস্থিত সংস্থার আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে এখানে বিভিন্ন বয়সী ছয় জন পরিত্যক্ত শিশু রয়েছে। সামাজিকতা কিংবা অন্য কোন অজানা কারণে গর্ভধারিনীরা ওদের পরিত্যাগ করে চলে গেছে। অনেকের মায়ের বুকের দুধটুকু পান করার সৌভাগ্য হয়নি। কৌটার দুধই ওদের বেঁচে থাকার একমাত্র পথ্য।
আশ্রয় কেন্দ্রের কক্ষ ঘুরে দেখা গেল, ওদের জন্য বাবা-মায়ের আদর নেই, নেই মিষ্টি কোন ডাক। নেই ঝুনঝুনি কিংবা লাল-নীল ফুলের ‘ঘুরনি খেলনা’। ‘সোনামণি মা’ কিংবা বুকের ধন ‘আব্বু সোনা’ বলে কোন আপনজনের বুলিও শোনে না ওরা। শেখে না ‘মা’ কিংবা ‘বাবা’ ডাকা। ওদের নিষ্পাপ নীল চোখজুড়ে শুধুই একটু আদরের ব্যাকুল প্রত্যাশা।
ওদের মধ্যে রয়েছে মাস খানেক বয়সের ছোট্ট ফুটফুটে একটি শিশুও। তবে ওর এখনো ‘নাম’ দেয়া হয়নি। শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম থেকে জেগে আবারও হাত-পা ছুঁড়ে কাঁদছে। সংস্থার আয়া, খালা কেউ শিশুটির কান্না থামাতে পারছেন না। ‘বাচ্চাটির হয়তো ক্ষিদে পেয়েছে’- প্রশ্ন করলে সংস্থার কর্মী ডালিয়া ঘরামি বললেন, ‘না, ক্ষিদে পায়নি, কাল ওর মা চলে গেছে, মায়ের ওমটুকু কারো কোলে পাচ্ছে না বলেই কাঁদছে। দুদিন পরেই ঠিক হয়ে যাবে।’
সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানে ভূমিষ্ঠ হওয়া ও আশ্রয় পাওয়া অনেক শিশু নিঃসন্তান দম্পতিদের ঘরে কাঙ্ক্ষিতজন হয়ে বেড়ে উঠছে। এদের কেউ আছে আমেরিকায়, কেউ বা কানাডা-লন্ডন কিংবা ইতালি-অস্ট্রেলিয়াতে। আবার কেউ বেড়ে উঠছে দেশের মাটিতেই বিলাশবহুল পরিবেশে। তবে এই শিশুদের মধ্যে যাদের অন্য কোন পরিবারে জায়গা মেলে না, তাদের পাঁচ বছর বয়স হলেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় কোন এতিমখানায়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটু বড় শিশুদের কোন পরিবার বা দম্পত্তি ‘দত্তক’ নিতে চান না। তখন এসব শিশুরা চলে যায়— এসওএস, শিশুপল্লী প্লাস, আশার আলো সোসাইটি, আহছানিয়া মিশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে।
‘হীড বাংলাদেশ’র নির্বাহী পরিচালক আনোয়ার হোসাইন বললেন, এখানে মূলত সেই গর্ভবতী মায়েরাই সেবা নিতে আসেন, যারা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভবতী হয়ে পড়েন। যেমন ধর্ষণের শিকার হওয়া নারী, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে গর্ভধারণ করা কুমারীমাতা। এসব মায়েরাই এখানে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন। এছাড়া বিভিন্ন থানা, হাসপাতাল, ক্লিনিক থেকে পরিত্যক্ত সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া নবজাতকদের এখানে পাঠানো হয়। তবে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা কম বলে প্রতিমাসে গড়ে ৪ জনের বেশি তারা রাখতে পারেন না। যদিও আমাদের ধারণক্ষমতা মাসে ১০ জনেরও অধিক। কিন্তু ফান্ড সংকটের কারণে বাকিদের ব্যয় বহন করা সম্ভব হয় না।
দত্তক নেয়ার নিয়মাবলী
নিঃসন্তান দম্পতিরা ইচ্ছে করলে আশ্রয় কেন্দ্রের এসব শিশুদের দত্তক নিতে পারেন। এ জন্য স্বামী অথবা স্ত্রী যে কোন একজনকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হতে হবে এবং দম্পতির বয়স ৩৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে হতে হবে।
বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকরাও পালক সন্তান গ্রহণ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তাদের সংশ্লিষ্ট দেশের সমাজ কল্যাণ বিভাগে আবেদন করতে হবে। ওই বিভাগের ছাড়পত্র নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে আবেদন পাঠাতে হবে।
কোন দম্পতির নিজের সন্তান বড় হয়ে গেলে অথবা তাদের সঙ্গে না থাকলে তারাও পালক সন্তান গ্রহণ করতে পারবেন। এছাড়া অবিবাহিতা নারী- যিনি নিশ্চিত যে বিয়ে করবেন না বা বিয়ের বয়স নেই এবং আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল, তিনিও দত্তক নিতে পারবেন।
তবে যেহেতু পালক সন্তান আইনত কোন পালক পিতা-মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে না, তাই নিরাপত্তার জন্য পালক সন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে এবং যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।