নির্বাচনী প্রচারণায় বড় দুই দলই

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে নেমেছে। ৯১, ৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি পাঁচটি আসন ও একটি আসন আওয়ামী লীগ পেয়েছে। নোয়াখালী বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২টি আসন ছিনিয়ে নেয়। বিএনপি ৩টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী) একটি আসন পেয়েছেন। গত সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১ আসন চাটখিল-সোনাইমুড়ীর একাংশ থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিষ্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, নোয়াখালী-২ আসন সেনবাগ-সোনাইমুড়ীর একাংশ থেকে বিরোধীদলীয় চীফ হুইপ ও বিএনপির প্রচার সমপাদক জয়নাল আবদীন ফারুক , নোয়াখালী-৩ বেগমগঞ্জ থেকে সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্যা বুলু , নোয়াখালী-৪ সদর-সুবর্ণচর থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সমপাদক একরামুল করিম চৌধুরী, নোয়াখালী-৫ কোম্পানীগঞ্জ কবিরহাট ও সদরের একাংশ থেকে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও নোয়াখালী-৬ আসন হাতিয়া থেকে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রকৌশলী ফজলুল আজিম নির্বাচিত হন। নির্বাচন নিয়ে নানা শংকা থাকলেও বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থীরা হারানো আসনগুলো পুনরুদ্ধারে গত দুই মাস থেকে জোটের নেতাদের নিয়ে ব্যাপক সাংগঠনিক তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। জেলায় বিএনপির শরিক দল জামায়াত ও অন্য কোন দলের প্রার্থী না থাকায় বিএনপি সুবিধাজনক অবসহানে রয়েছে। অন্যদিকে নোয়াখালী সদর ছাড়া অন্য আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ও নির্বাচনী তত্পরতা অনেকটা ঝিমিয়ে আছে। জেলায় আওয়ামী লীগের শরীক দল জাতীয় পার্টি (এ) এর কিছু সমর্থন থাকলেও অন্য কোন শরীক দলের নেতা ছাড়া কোন সমর্থক নেই। পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের পর বিএনপির তত্পরতা আরো চাঙ্গা হয়ে উঠে। জেলা ও উপজেলায় দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে মত বিরোধ রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায় মত বিরোধ বেড়ে যাবার আশংকা রয়েছে। বিএনপির মধ্যে বিরোধ থাকলেও তা এখন অনেকটা কমেছে। তবে নির্বাচনকে ঘিরে দুই একটি আসনে বিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠার আশংকা রয়েছে। নোয়াখালী-১ চাটখিল সোনাইমুড়ী আসন থেকে জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী আওয়ামী লীগের প্রার্থী হবেন বলে এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। তিনি এলাকায় সভা সমাবেশের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করছেন বলে স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন। ড. শিরিন নির্বাচন না করলে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী (পরাজিত) জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এএইচএম ইব্রাহীম দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন কেন্দ্রীয় সম্মিলিত সাংসকৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য খোন্দকার রুহুল আমিন, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সালেহ আহমেদ চৌধুরী ও চাটখিল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির । একই আসনে বিএনপির বর্তমান এমপি ব্যারিষ্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন একক প্রার্থী হিসেবে তার নির্বাচনী প্রচার অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। সাবেক এমপি সালাউদ্দিন কামরান দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। তাকে ৯৬ সালে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং পরে বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। তিনি ৯১ সালে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হন। জাতীয় পার্টি ( এ ) থেকে একক প্রার্থী রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ও এমপি এডভোকেট মাহবুবুর রহমান। তিনি ৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হন। পরে আবার জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। এরআগে তিনি এরশাদের আমলে কয়েক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। নোয়াখালী-২ সেনবাগ সোনাইমুড়ী আসন থেকে বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ ও পর পর ৫ বার নির্বাচিত ও বর্তমান এমপি জয়নাল আবদীন ফারুক বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে প্রচারণার মাঠে রয়েছেন। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী (পরাজিত) জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ডঃ জামাল উদ্দিন ও সেনবাগ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী (পরাজিত) জাফর আহম্মেদ চৌধুরী দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন। অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সমপাদক লায়ন জাহাঙ্গীর আলম মানিক ও তরুণ ব্যারিষ্টার আহসান হাবিব ভুঁইয়া। জাতীয় পার্টি (এ) মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি এসএ টিভি ও এসএ পরিবহন এর এমডি সালাউদ্দিন আহমেদ, হাসান মঞ্জুর, আবদুস সাত্তার ও ক্যাপটেন রেজাউল করিম। নোয়াখালী-৩ বেগমগঞ্জ আসন থেকে বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে বর্তমান এমপি বরকত উল্যা বুলু নির্বাচনী প্রচার অভিযানে এখন মাঠে রয়েছেন। তিনি ৯১, ৯৬ ও ২০০৮ সালে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সাবেক এমপি ও পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাসেম দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সমপাদক ডাঃ মাযহারুল ইসলাম দোলন ও ডাঃ রেজাউল করিম। এই আসনে মনোনয়ন নিয়ে দলীয় বিরোধ মাথাছাড়া দিয়ে উঠার আশঙ্কা রয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডাঃ জাফর উল্যা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সমপাদক ও চৌমুহনী পৌরসভার মেয়র শিল্পপতি মামুনুর রশিদ কিরণ, শিল্পপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এনায়েত উল্যা। এই তিন মনোনয়ন প্রত্যাশী জানিয়েছেন তাদের মধ্যে যাকে দল মনোনয়ন দিবে তা তারা মেনে নিবেন। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী (পরাজিত) লুত্ফুন নাহার মুন্নীও মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান। একই আসনে সাবেক সেনা প্রধান এম উ আহমেদ এর ছোট ভাই মিনহাজ আহমেদ জাবেদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে মাঠে রয়েছেন। তিনি গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। নোয়াখালী-৪ সদর-সুবর্ণচর আসন থেকে আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সমপাদক একরামুল করিম চৌধুরী একক প্রার্থী হিসেবে তার নির্বাচনী প্রচার অভিযান চালাচ্ছেন। নিজকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ব্যাপক সাংগঠনিক তত্পরতা চালিয়েছেন। তবে ৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী (পরাজিত) সাবেক স্পীকার মরহুম আবদুল মালেক উকিল এর জ্যেষ্ঠ পুত্র জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি গোলাম মহিউদ্দিন লাতু দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ রয়েছে। অনেক নেতাকর্মী আপাতত চুপচাপ থাকলেও দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিতে পারে। এই আসনে বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্ররাভিযান চালাচ্ছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি মোঃ শাহজাহান। তিনি পর পর ৪ বার এ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও গত নির্বাচনে পরাজিত হন। বিকল্প ধারার মহাসচিব সাবেক প্রতিমন্ত্রী শিল্পপতি মেজর (অবঃ) আবদুল মান্নান এ আসন থেকে নির্বাচন করবেন বলে শোনা গেলেও এখনও নির্বাচনী মাঠে নামেননি। তিনি গত নির্বাচনে এ আসন থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হন। জাতীয় পার্টি (এ) থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সমপাদক মোবারক হোসেন আজাদ। নোয়াখালী-৫ কোমপানীগঞ্জ আসন থেকে বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমেদ নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে রয়েছেন। গত নির্বাচনে তিনি এ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে পরাজিত হন। এবার নির্বাচনে তিনি তার হারানো আসন ফিরে পাবার জন্য ব্যাপকভাবে সাংগঠনিক তত্পরতা ও প্রচারাভিযানে নেমেছেন। তিনি ৭৯, ৮৬, ৯১ ও ২০০১ সালে এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। অন্যদিকে ওবায়দুল কাদেরও তার আসন ধরে রাখতে তত্পর হয়ে উঠেছেন। তিনি ৯৬ ও ২০০৮ সালে ব্যারিষ্টার মওদুদকে পরাজিত করেন। ওবায়দুল কাদের রাষ্ট্রীয় কাজের ব্যস্ততার মাঝে এলাকায় আসলেও নেতাকর্মীদের তেমন একটা সময় দিতে পারছেন না। তবে দলীয় নেতাকর্মীরা নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন। তিনি সময়মত প্রচারাভিযান চালাবেন বলে জানা যায়। নোয়াখালী-৬ হাতিয়া আসনে স্বতন্ত্র এমপি প্রকৌশলী ফজলুল আজিম তার নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ৯৬ তে বিএনপি থেকে ও ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন। একই আসন থেকে তিনি ৯১ ও ২০০১ সালে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন। ওয়ান এই লেভেনের পর বিএনপির সংস্কারপন্থির অভিযোগে দল তাকে মনোনয়ন.দেয়নি। জেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, ফজলুল আজিমের বিরুদ্ধে দলের বহিষ্কারাদেশ রয়েছে। তা প্রত্যাহার হবার সম্ভাবনা রয়েছে। ফজলুল আজিম এমপি বলেছেন তিনি দল থেকে বহিষ্কারাদেশ পাননি। তিনি জানিয়েছেন, তিনি বিএনপির মনোনয়ন চাইলে দল তাকে মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিএনপির অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলাউদ্দিন, সাধারণ সমপাদক এডভোকেট সাজ্জাত হোসেন, গত নির্বাচনের প্রার্থী সাকায়েত। আওয়ামী লীগ থেকে সাবেক এমপি ও হাতিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়াম্যান অধ্যাপক ওয়ালীউল্যা ও সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন। গত নির্বাচনে মোহাম্মদ আলী আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হবার পর ব্যাংক ঋণ খেলাপীর দায়ে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয় । এর আগে মোহাম্মদ আলী ৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে ও পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। অধ্যাপক ওয়ালী উল্যা ৯১ তে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন।