রাজশাহীতে ছাত্রাবাসে অপরাধ প্রবণতা চাঁদাবাজি থেকে খুন খারাবি
আনিসুজ্জামান, রাজশাহী অফিস
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:০৭
রাজশাহী মহানগরীতে ব্যাঙের ছাতারমত গজিয়ে ওঠা ছাত্রাবাসে অপরাধ বাড়ছে। চাঁদাবাজি ও অসামাজিক কার্যকলাপের পর হত্যারমত গুরুতর অপরাধের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে ছাত্রাবাস। এনিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু ছাত্রাবাস কেন্দ্রিক অপরাধীদের চিহ্নিত করতে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) জোরালো তত্পরতা নেই।
রাজশাহী মহানগরীতে ছাত্রাবাসের সংখ্যা কত? তারও কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ এমনকি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের কাছেও। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত এই মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে ১০ হাজারের মত ছাত্রাবাস রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বাসা-বাড়িকেও ছাত্রাবাস বানিয়ে ভাড়া দেয়া হচ্ছে। ওইসব ছাত্রাবাসে প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবী বসবাস করছেন। ছাত্রাবাসে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসীদের অবস্থান, অসামাজিক কার্যকলাপ এমনকি সমপ্রতি হত্যার মত গুরুতর অপরাধ বেড়েছে।
গত ৫ দিনে মহানগরীর দুইটি ছাত্রাবাসে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নগরীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত শুক্রবার মহানগরীর তেরখাদিয়া ডাবতলার একটি নির্মাণাধীন ছাত্রাবাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাহাদত হোসেন লিটনকে মুক্তিপণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে জবাই করে হত্যা করেছে অপরাধীরা। কয়েকদিন আগে স্থানীয় আখতার হোসেনের বাড়িতে চালু করা ওই ছাত্র মেসের একটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছিল রাজশাহী হেলথ টেকনোলজির ছাত্র পরিচয়ের ২ যুবক। তারা সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লিটনকে ডেকে নিয়ে মুক্তিপণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তার মোবাইল ও নগদ টাকা কেড়ে নিয়ে জবাই করে হত্যা করে। ঘটনার পর পালিয়ে যাবার সময় স্থানীয়রা চার যুবককে আটক করে পুলিশে দিয়েছে। আটকদের দু’জন পুলিশের কাছে নেশার টাকা যোগাতে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা এবং ব্যর্থ হয়ে গলাকেটে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর রাত ১১টায় মহানগরীর মতিহার থানার মির্জাপুর এলাকার একটি ছাত্রাবাসে এক নারীর গলাকাটা বিবস্ত্র লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, ওই নারীকে ধর্ষণের পর জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। নিহত ফজিলা খাতুন (৩৫) রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মী ও মির্জাপুরের আসাদুজ্জামানের মেয়ে। ঘটনার দিন সন্ধ্যা থেকে ফজিলা খাতুন নিখোঁজ ছিলেন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে স্থানীয়রা পিতার বাড়ির পাশের ‘ওমর ফারুক ছাত্রবাসের’ একটি কক্ষে তার গলাকাটা লাশ দেখতে পায়। নিহতের বোন তার সাবেক স্বামীকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ অদ্যাবধি আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এর আগে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মহানগরীর শিরোইলের ‘মাহমুদ রফা’ ছাত্রাবাসের ম্যানহোল থেকে রাজশাহী মডেল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী নাদিমুজ্জামান সাদের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে র্যাব। কলেজ ছাত্র সাদকে ওই ছাত্রাবাসের নিচতলার একটি কক্ষে গলাকেটে হত্যা করা হয়।
রাজশাহীর বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও বাসা-বাড়িতে গড়ে ওঠা ছাত্রাবাসে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মাঝে-মধ্যে পুলিশ ও র্যাব ছাত্রাবাসে অভিযান চালায়। কিন্তু ছাত্রাবাস মালিকদের অসহযোগিতায় মূল অপরাধীরা গ্রেফতার হয় না। সমপ্রতি সোনাদীঘী মোড়ের একটি ছাত্রাবাসে চাঁদাবাজি করার সময় এক যুবককে পুলিশে দেয়া হয়।
নগরীর বিভিন্ন ছাত্রাবাসে অপরাধ সংগঠিত হলেও পুলিশ এবং রাসিক অধিকাংশ ছাত্রাবাস সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছে। নগরীর ছাত্রাবাসের নির্ভরযোগ্য কোন তালিকা পুলিশের কাছে নেই। সঙ্গত কারণে পুলিশের কাছে ছাত্রাবাসের বাসিন্দাদের (বোর্ডার) সুনির্দিষ্ট তালিকাও নেই। এছাড়া ছাত্রাবাসগুলোতে কে কখন উঠছে বা কারো সিটে বন্ধু-বান্ধব পরিচয়ে অপরাধীরা কেউ অবস্থান করছে কি না তা ছাত্রাবাস মালিকরাও জানতে পারছেন না। এ কারণে অপরাধীরা ছাত্রাবাসকেই নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
বর্তমান মহাজোট সরকার আমলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেন শিবিরের হাতে নৃশংসভাবে খুন হওয়ার পর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন রাজস্ব বিভাগের মাধ্যমে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রাবাস এবং বাসিন্দা শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু রাসিকের ওই উদ্যোগ যথাযথ তদারকির অভাবে কার্যকর হয়নি। এ প্রসঙ্গে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আজাহার আলী সাংবাদিকদের বলেন, ২০১০-২০১১ অর্থবছরে অপরাধ প্রবণতা কমানো এবং ছাত্রাবাস মালিকদের করের আওতায় আনতে মহানগরীর ছাত্রাবাসসমূহের নিবন্ধনের কাজ শুরু করা হয়েছিল। রাসিকের রাজস্ব বিভাগ ওই নিবন্ধন কাজ এখনো শেষ করতে পারেনি। আরএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার সরদার তমিজউদ্দিন বলেন, সামপ্রতিক সময়ে দুইটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্রাবাসে পুলিশের তদারকি বাড়ানো হয়েছে। চিহ্নিত বিশেষ কিছু ছাত্রাবাস ও বাসিন্দারা পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে।