কোনাল কাহন
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:০৯
একটা সময় কোনাল তার পরিবারের সবার সাথে কুয়েত থাকতেন, এ কথা সংগীত সংশ্লিষ্ট সবারই কমবেশি জানা। বর্তমানে কোনাল দেশে অবস্থান করলেও মাঝে মাঝে কুয়েত প্রবাসী বাবার সাথে দেখা করতে কিছুদিন বেড়িয়ে আসেন। এবারও সপ্তাহ খানেকের জন্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কাজে কুয়েত অবস্থান করছেন তিনি। ফিরবেন দুয়েকদিনের মধ্যেই। এসেই ব্যস্ত হয়ে পড়বেন দ্বিতীয় একক অ্যালবাম পঞ্চকবির গান নিয়ে। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও রজনীকান্ত সেন—এই পাঁচ কবির গান নিয়ে এবার অ্যালবাম করতে যাচ্ছেন কোনাল। অর্কেস্ট্রা ও পিয়ানোনির্ভর থাকছে গানগুলো। এ ছাড়া শাস্ত্রীয় সংগীতের মুগ্ধতা ও পাশ্চাত্যের সংগীতকে প্রাধান্য দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কিছু গান সব সময়ের হয়ে যায়। কখনও হয় না পুরাতন, যেন নতুন হয়ে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে রাঙিয়ে তুলে। এমনি সমৃদ্ধ সংগীতের ভাণ্ডার রয়েছে আমাদের পঞ্চকবিদের গানে। সেই মহান সুরস্রষ্টাদের বিশাল গানের ভুবন থেকে আমি বেশকিছু গান গাইতে চেষ্টা করেছি। এরইমধ্যে অ্যালবামটির জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও রজনীকান্ত সেনের গান চূড়ান্ত হয়েছে। বাকিগুলো শিগগিরই হয়ে যাবে। আসলে পঞ্চকবির গান নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম প্রকাশের ইচ্ছা ছিল অনেক আগে থেকেই। অ্যালবামে আমার পছন্দের গানগুলোই থাকবে। কারণ আমার ভালোলাগার গানগুলো নিজের কণ্ঠে গাইতে অসম্ভব ইচ্ছে থেকেই অ্যালবামটি করার এই প্রচেষ্টা। গানগুলোর শিরোনাম এখনই বলতে চাচ্ছি না, কিছুটা চমক না হয় জমা থাকুক। আশা করছি এ বছরের শেষ নাগাদ অ্যালবামটির কাজ শেষ করতে পারব। আর আমার এই উদ্যোগকে সাফল্যে দিতে পাশে দাঁড়িয়েছে ইমপ্রেস অডিও ভিশন।’
এবার একটু পেছন ফিরে তাকালে অনায়াসেই স্মৃতির অ্যালবামে ধরা দেয় একজন কোনালের শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পটি। ছোট্টটি থেকেই কোনাল তার মা সায়মা মনির মিনুর কণ্ঠে নজরুল সংগীত ও গণসংগীত শুনে বেড়ে উঠেছিলেন। মায়ের মতো গান গাওয়ার ইচ্ছেটা তখন থেকেই কোনালের মনে বাসা বেঁধেছিল। সময়ের তাগিদে সেই অর্থে একজন কণ্ঠশিল্পী হয়তো সায়মা মনির মিনু হয়ে উঠতে পারেননি। চারদেয়ালের মাঝেই গুনগুনিয়ে থেমে গেছে তার গান। তাই তো নিজের ইচ্ছেটাকে বাস্তবে রূপ দিতে মেয়ে কোনালকে সংগীতের হাতেখড়িটা করেছেন স্বয়ং নিজেই। ছোট্টটি থেকেই বাবার চাকরির সূত্রে কোনালের বেড়ে ওঠা কুয়েতে। ছ’বছর বয়সে কোনাল মায়ের হাত ধরে পা রাখেন কুয়েতে অল ইন্ডিয়া মিউজিক একাডেমিতে। সেখানে কেকা মুখার্জীর কাছে বেশকিছু দিন শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন তিনি। বছর পাঁচেক মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করে নাড়ীর টানে ২০০৮-এ দেশে ফিরে আসেন তিনি। সে সময় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় কোনোকিছু না ভেবেই নাম রেজিস্ট্রেশন করিয়েছিলেন চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠে। তারপর অনেক গল্প, অনেক স্বপ্ন পূরণের কাব্য। প্রায় লক্ষাধিক প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে ২০০৯-এ কোনাল অর্জন করে নিয়েছিলেন সেরাকণ্ঠের তক্মাখানা। সে সময়টায় খুব সামনে থেকে দেখার, জানার ও শেখার সুযোগ মিলেছিল বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা ও সাবিনা ইয়াসমিনকে। পাশাপাশি ছিলেন এদেশের সংগীতের আরেক প্রবাদ পুরুষ সুবীর নন্দী। তাদের অবদানের কথা এখনও সম্মানের সাথে স্মরণ করেন কোনাল। তিনি বলেন, ‘আমি অনেক কিছুই জেনেছি-শিখেছি গুণী ও শ্রদ্ধেয় এই শিল্পীদের কাছ থেকে। শুধু গানই নয়, জীবনবোধের অনেক কিছু অনুভব করেছি তাদের সান্নিধ্যে এসে।’ ওই প্রতিযোগিতা থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ তুলে দিয়েছিলেন মোহাম্মদপুরের একটি এতিমখানাতে। সে কথা মনে করে দিতেই কোনাল বলেন, ‘সাধ তো অনেক কিছু করার। আমার আরও বেশকিছু পরিকল্পনা আছে হতদরিদ্র পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নিয়ে। আশাকরি এ ধরনের কাজে আমি সবার সহযোগিতা পাব।’ অন্য এক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোনাল বলেন, ‘রিয়েলিটি শো থেকে বের হওয়ার পর অনেক শিল্পীই হারিয়ে যায় এটা সত্যি। তাদের সংগীতের প্রতি নিষ্ঠার যেমন অভাব আছে তেমনি যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতারও ঘাটতি রয়েছে। আমি চ্যানেল আইয়ের কাছ থেকে সব সময়ই সহযোগিতা পেয়ে এসেছি এবং এখনও পাচ্ছি।’
গানের পাশাপাশি কোনাল বিভিন্ন সময়ে একাধিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। ‘লালটিপ’ চলচ্চিত্রে রেডিও জকির ভূমিকায় অভিনয় করা বাদেও নৃত্যশিল্পী রূপেও দেখা গেছে কোনালকে। এ প্রসঙ্গে তিনি হেসে বলেন, ‘উপস্থাপনা করার বিষয়টি আমি উপভোগ করি। ‘লালটিপ’-এ অভিনয় করেছিলাম মূলত অনুরোধে। আর নাচ করাটা অনেকটা শখেই বলতে পারেন। ছোটবেলায় আমি গানের ব্যাপারে যতটা না সিরিয়াস ছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিলাম নাচ নিয়ে। আমি তো অনেক বছর কুয়েতে ছিলাম, সে কথা মোটামুটি সবাই জানে। সেখানে গানের পাশাপাশি নাচ শিখেছি। ওই সময় কুয়েতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচ করেছি। পরবর্তীতে কুয়েতে আমার আব্বু-আম্মুর গড়া সংগঠন ‘ঋতুরঙা’ আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় ছোটদের নাচ শেখাতাম। তাই এখনও মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে পায়ে ঘুঙুর বাঁধি, শৈশবে নাচের আনন্দে ফিরে যাই।’ কিছুদিন আগে মালয়েশিয়ায় ১৭টি দেশের শিল্পীদের সাথে গান করার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি খুব আনন্দের ছিল। যেকোনো শিল্পীর জন্যই এটা অত্যন্ত সম্মানের। আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আয়োজকদের কাছে, যারা আমাকে এই সুযোগটি করে দিয়ে ছিলেন।’
মিউজিক দুনিয়ার অভিশপ্ত এক শব্দ পাইরেসি। বর্তমান সময়ে দেশের সংগীতাঙ্গনে পাইরেসি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের ঝড় শুরু হয়েছে। এর সম্পর্কে কোনাল বলেন, ‘বিষয়টি আমিও জেনেছি এবং এতটাই হতভম্ব হয়েছি যে, আমার বলার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। এতে অডিও শিল্প আরও বিপন্ন হবে। এটা এক প্রকার শিল্পীদের খুন করার শামিল। এ ধরনের মানসিকতার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। পুরো ব্যাপারটি সংগীত তথা শুদ্ধ সংস্কৃতি বিকাশের জন্য প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ। এক্ষেত্রে সাধারণ শ্রোতাদের যেমন সচেতন হতে হবে তেমনি সংগীতশিল্পী ও সরকারকে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।’
বর্তমান সময়ের ব্যস্ততা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেশকিছু চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক করলাম, দেশে ফিরে আরও কয়েকটি প্লেব্যাকে অংশ নেব। মূলত অ্যালবাম নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটবে আমার। আর জীবনের সকল পরিকল্পনাই গানকে ঘিরে। আগামী দিনগুলোতে গানের সাথে সব সময়ই জীবনকে জড়িয়ে রাখতে চাই। আমার স্বপ্ন, ইচ্ছে সবকিছুই গানকে কেন্দ্র করে।’