মুসলমানদের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের অপার সুযোগ করে দেয় মাহে রমজান। রোজার মূল মাহাত্ম্য আত্মশুদ্ধি আর সংযমে। আল্লাহর সন্তুষ্টি, পাপাচার হতে বিরত থাকা এবং নিজেদের কামনা-বাসনা আর ভোগ-বিলাস নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরহেজগারি বা তাকওয়া বৃদ্ধি করাই এ মাসের লক্ষ্য। শুধু ভোর থেকে সূর্যাস্ত অবধি পানাহার থেকে বিরত থাকার জন্য রোজা ফরজ হয়নি। এ মাসে সবকিছুতে সংযম অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে কোরআন ও হাদিসে। তবে রোজার এই সময়টাতে এমন কিছু বিষয় লক্ষ্য করা যায়, যা সংযম সাধনার বিপরীত। সংযমের এ মাসে ভোগ-বিলাস বেড়ে যায়। বেড়ে যায় অপচয়। প্রায় প্রতিটি পরিবারে অন্যান্য মাসের চাইতে রমজান মাসে খরচ বেড়ে যায় দ্বিগুণ। সেহরি-ইফতার আয়োজনের দিকে তাকালে মনে হয় যেন খাবারের উত্সব চলছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাবারের আয়োজন করা হয়। এতে বেড়ে যাচ্ছে অপচয় আর অপব্যয়।
ইসলামে অপচয় ও অপব্যয় সম্পূর্ণ হারাম। সূরা বনী ইসরাইলের ২৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা খাও এবং পান করো এবং কোনো অবস্থাতেই অপচয় করো না, আল্লাহতায়ালা কখনোই অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না (সূরা আরাফ, আয়াত ৩১)। আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ) বলেছেন, প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয়ই হলো ইসরাফ বা অপচয়।
রোজায় ইফতার-সেহরির মাধ্যমে মানব জাতিকে পরোপকারে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। উত্সাহিত করা হয়েছে নিঃস্বদের দানে। প্রকৃত রোজাদার নিজে ইফতার করবে, অন্যকেও করাবে। অসহায় দুঃখীদের মুখে হাসি ফোটাবে। রমজানে বেশি খাবার খেলে আল্লাহ কোনো হিসাব নেবেন না, এ ধরনের একটা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলাম অতিভোজ কখনোই সমর্থন করে না। এমনও হয়েছে, ঘরে খাবার নেই, রাসূল (সা) না খেয়ে থেকেছেন। তিনি যখন আহার করতেন, আহার শেষে তিনবার আঙুল চেটে খেতেন এবং বলতেন, তোমাদের খানার বাসন থেকে কিছু পড়ে গেলে উঠিয়ে পরিষ্কার করে খেয়ে নাও, তা শয়তানের জন্য ছেড়ে দিও না। (আবু দাউদ-৩৮৪৫)।
অথচ বর্তমানে খাবারের অপচয় রমজানে রীতিমত যেন ফ্যাশন। রেস্তোরাঁ থেকে বস্তা বস্তা খাবার ফেলে দেওয়া হচ্ছে, এমন ছবিও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। কত মানুষ এই শহরে অভুক্ত থাকে। পেট ভরে খেতে পারে না। শহরবাসীর মধ্যে রোজার দিনে ইফতার আয়োজনে আড়ম্বর করতে দিনভর প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যায়। যদিও এসব আয়োজনে দরিদ্র রোজাদারদের অংশগ্রহণ একেবারেই কম থাকে। দেশের আলেমরা ইফতারকে কেন্দ্র করে এই ধরনের প্রবণতার সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, ইসলামে ইফতারের অনেক মর্যাদা রয়েছে। তাই আয়োজনের চেয়ে তাকওয়া অর্জনের দিকেই রোজাদারকে মনোযোগী হতে হবে। এদিকে রমজান মাসে কেবল খাবার-দাবারেই নয়, অনেক কিছুতেই সংযম থাকে না বহু মানুষের। অসাধু পন্থায় আয়-রোজগার বাড়ান তারা। থাকে না অনেকের রিপুর সংযম। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেন নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের। রোজা রেখে ঘুষ খান, মিথ্যা কথা বলেন, মানুষের ক্ষতি করেন, দুর্নীতি করেন অনেকেই। এছাড়া ইফতার পার্টির নামে মাসজুড়ে চলে রাজনীতি। এসব আয়োজনে রাজনীতিবিদরা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা নানা অভিযোগ তোলেন। খাবার অপচয় করেন। চাঁদা তুলে ইফতার পার্টি করার নামে সাধারণ ব্যবসায়ীরা জুলুমের শিকার হন। গলির বখাটে থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিরাও চাঁদার নামে ‘তোলা’ তোলেন যে যতটা পারেন। রমজান এলে ঘুষের রেটও বেড়ে যায়। এক শ্রেণির আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঈদ বাণিজ্য চলে দেদারসে। ঈদুল ফিতর যত ঘনাতে থাকে, রাজধানীসহ সারা দেশের মার্কেট আর বিপণি বিতানগুলোতে বিক্রেতাদের মুনাফার ক্ষুধা যেন ততই বাড়তে থাকে। কেনা দামের তিন থেকে পাঁচ গুণ দামে বিক্রি করেন ঈদের পোশাক, জুতা, কসমেটিকসসহ নানা পণ্য।
কাওরান বাজার আম্বর শাহ শাহী মসজিদের প্রধান খতিব হাফেজ মাওলানা কারী আতাউল্লাহ হাফেজ্জী এ প্রসঙ্গে বলেন, রমজানের প্রকৃত শিক্ষা আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া। এই মাস হলো মুসলমানদের প্রশিক্ষণের জন্য। সংযমের শিক্ষা অর্জন করা এ মাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি সংযমের বদলে অসংযমী আচরণ বেশি চলছে। এখলাস নেই। কেবল না খেয়ে থাকার নাম রোজা নয়। রমজান এলে যেন মানুষ বেপরোয়া হয়ে যান। ইফতার-সেহেরির নামে ভোজ উত্সব চলছে। যেটুকু খাচ্ছে তার চেয়ে অপচয় করছে বেশি।
চিকিত্সাবিজ্ঞান বলছে, মাঝে মাঝে খাবার থেকে দেহকে অব্যাহতি দেওয়া দরকার। রোজা এ ধরনের অবস্থা থেকে উতরে ওঠার মাধ্যম। রোজা কমিয়ে দেয় ডায়বেটিস ঝুঁকি। সারায় পেপটিক আলসার উপসর্গ। বাঁচাতে পারে অ্যালঝেইমার, ডিমেনশিয়ার মতো বয়সজনিত রোগগুলো থেকে। তবে তার জন্য রোজা রাখতে হবে সঠিক খাদ্যাভ্যাসে। ইসলামের সঠিক নিয়ম মেনে।