আড়াই বছরেও চালু হয়নি খুলনা-ঢাকা স্টিমার সার্ভিস

খুলনা-ঢাকা রুটের ঐতিহ্যবাহী স্টিমার সার্ভিস পুনরায় চালু করার ব্যাপারে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী, এমপি ও বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) শীর্ষ কর্মকর্তাগণ একাধিকবার আশ্বস্ত করলেও দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছরেও চালু করা হয়নি নদীপথের জনপ্রিয় এই সার্ভিসটি। শুধু এ অঞ্চলের জনসাধারণ ও ব্যবসায়ীদের অব্যাহত দাবিকেই উপেক্ষা করা হচ্ছে না, বিআইডব্লিউটিসি’র আইন অমান্য করে স্টিমার সার্ভিসটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে অব্যাহত ষড়যন্ত্র চলছে। খুলনা-ঢাকা রুটে স্টিমার সার্ভিস পুনরায় চালুসহ বিআইডব্লিউটিসিকে রক্ষা করতে উচ্চ আদালতে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির খুলনা অঞ্চলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাগেরহাটের রামপাল-ঘষিয়াখালি চ্যানেলে নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে দীর্ঘ আড়াই বছর আগে বন্ধ করে দেয়া হয় খুলনা-মংলা-ঢাকা রুটের সরকারি স্টিমার সার্ভিস। কিন্তু অজানা কারণে সে সময় নদীর পলি অপসারণ বা নদী পুনঃখননের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি বিকল্প রুট হিসাবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে স্টিমার সার্ভিস চালুর ব্যাপারে অভ্যন্তরীণ নৌ- পরিবহন কর্তৃপক্ষ গঠিত উচ্চপদস্থ সমীক্ষা দলের ইতিবাচক মতামত থাকলেও চালু করা হচ্ছে না পরিবহন সার্ভিসটি। নৌপথে আরামদায়ক, নিরাপদ ও কম খরচে মালামাল পরিবহনসহ যাত্রীদের চলাচলের জন্য ১৮৮৪ সালে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার খুলনা-মংলা-ঢাকা স্টিমার সার্ভিস চালু করে। সে সময় সুন্দরবনের ভেতর দিয়েই চলাচল করতো এই স্টিমার। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর মংলা হয়ে রামপাল-ঘষিয়াখালি চ্যানেল চালু হলে এ পথেই চলাচল করতে শুরু করে স্টিমার। এতে প্রায় ৪ ঘন্টা সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় হয়। কিন্তু নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে বিগত ২০১১ সালের ১৮ এপ্রিল খুলনা-মংলা-ঢাকা রুটে স্টিমার সার্ভিস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। বর্তমানে এই স্টিমার সার্ভিসটি ঢাকা থেকে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত চালু রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খুলনা-মংলা-ঢাকা রুটে স্টিমার সার্ভিস বন্ধ করার নীল নকশা শুরু হয় ২০০২ সালে। আর এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে পরিকল্পিতভাবে লোকসানের বোঝা তুলে দেয়া হয় খুলনা বিভাগীয় বিআইডব্লিউটিসি’র ঘাড়ে। প্রথমে নামমাত্র মূল্যে মংলা বন্দরের সরকারি বার্জ, ফ্ল্যাট ও কার্গো ব্যক্তি মালিকানায় ভাড়ায় দিয়ে তার আয় যুক্ত করা হয় কেন্দ্রীয় অফিসে। দ্বিতীয়বার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে কেটে নেয়া হয় খুলনা বিভাগের বড় মাছুয়া, চরখালী ও হুলারহাট স্টেশন। উক্ত তিনটি স্টেশনের আয় দেখানো হয় বরিশাল বিভাগে। এছাড়া বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ সরকারের জারিকৃত বিধি লঙ্ঘন এবং নিরীক্ষা আপত্তি সত্ত্বেও প্রায় ১০০ বছরের পুরাতন খুলনার আঞ্চলিক অফিস ও ঘাটকারখানা ষড়যন্ত্রমূলক বরিশালে স্থানান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে খুলনায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী সেট-আপ বহির্ভূতভাবে বরিশালে পদস্থ করে খুলনার অফিস জনশূন্য করা হচ্ছে। সূত্রমতে, বিআইডব্লিউটিসির অসাধু চক্রটি প্রতিষ্ঠানটির রকেট, বার্জ, ফ্ল্যাট, কার্গো খুলনায় চলাচল বন্ধ করে দিয়ে খুলনার প্রায় ৩শ’ কোটি টাকার সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য নৌ, বাণিজ্য ও শিল্প নগরী খুলনার আঞ্চলিক অফিস বরিশালে স্থানান্তর করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সূত্র জানায়, মংলা-রামপাল-ঘষিয়াখালি চ্যানেলে পলিমাটি জমে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ ২০১০ সালের ৫ আগস্ট সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে খুলনা-মংলা-ঢাকা স্টিমার সার্ভিস বন্ধ করার ইঙ্গিত দেয়। এরপর অনিয়মিতভাবে খুলনায় চলাচল করতে থাকে স্টিমার। অনিয়মিত হয়ে পড়া এ অঞ্চলের স্টিমার যাত্রীরা বিকল্প মাধ্যমে চলাচল করতে শুরু করেন। ফলে অনেকটা লোকসানের কবলে পড়ে খুলনা-ঢাকা স্টিমার সার্ভিস। এদিকে, খুলনাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ৭ নভেম্বর পূর্বের রুট (বড় মাছুয়া-বগি ও জয়মনির গোল) দিয়ে চলাচলের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বিআইডব্লিউটিসির মেরিন শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক খন্দকার মহিউদ্দিন আহম্মদকে আহবায়ক করে তিন সদস্যের উচ্চ পদস্থ একটি সমীক্ষা টিম গঠন করা হয়। সমীক্ষা টিম সরেজমিনে তদন্ত করে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে (বড় মাছুয়া-বগি ও জয়মনির গোল) নৌপথে খুলনা-ঢাকা রুটে স্টিমার সার্ভিস চালু করার পক্ষে মতামত পেশ করে বলা হয়, এই রুট যথেষ্ট প্রশস্ত, গভীর ও নৌ চলাচলের সহায়ক। এছাড়া সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে স্টিমার সার্ভিস চালু হলে এই রুটে পর্যটকসহ যাত্রীর সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাবে। মালামাল পরিবহনও বেড়ে যাবে আগের তুলনায় কয়েকগুণ। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বাণিজ্য নগরী খুলনা ও মংলা বন্দরে। তবে উক্ত রুটে ২৮ কিলোমিটার পথ বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত ৪১০ লিটার জ্বালানি তেলের প্রয়োজন পড়বে। এ ব্যাপারে খুলনা উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন বলেন, বিআইডব্লিউটিসি’র কতিপয় শীর্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটির খুলনা অঞ্চলের বিশাল অঙ্কের সম্পদ লুটেপুটে খাওয়ার জন্যই খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে স্টিমার সার্ভিস বন্ধসহ খুলনা থেকে অফিস স্থানান্তরের ষড়যন্ত্র করছে। এই অপতত্পরতা এখনই বন্ধ করা না হলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তিনি এই অপতত্রতা বন্ধ করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো দাবি জানান।