ভাটির পুরুষকথা
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৪
২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। উজ্জ্বল আমাকে নিয়ে আসে সিলেটের শেখঘাটের এক বাড়িতে। দুইটা গলি পার হয়ে একটা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ি। রুহী ঠাকুর কিঞ্চিত অপ্রস্তুত। প্রথমত, তাঁর যে ঘরের মধ্যে আমি বসে আছি, এ ঘরটা নিয়ে তিনি সম্ভবত সংকোচ বোধ করছেন। উজ্জ্বল খুব সহজে ৫-৭ মিনিটের মাথায় একটি নদীর কিনারে নিয়ে এল। আমরা দিন চুক্তিতে একটা হাতে বাওয়া ছোট নৌকা রিজার্ভ করে রুহী ঠাকুরকে নিয়ে নৌকায় চড়ে বসি।
এই নৌকায় আমরা তিন যাত্রী, এক মাঝি। নৌকার পাটাতনে যে খাটিয়া বিছানো আছে, সেখানেই ট্রাইপয়েড বিছানো হলো। গলুইয়ের ওপর দোতরা নিয়ে বসেছেন রুহী ঠাকুর। আস্তে আস্তে আমাদের আলাপচারিতা শুরু হয়।
রুহী ঠাকুরকে প্রথম প্রশ্ন—করিম সাহেবের সাথে আপনার পরিচয় কেমনে?
রুহী ঠাকুর বলেন, ‘তাঁর সাথে পরিচয় একেবারেই বাল্যকাল থেকে। আমাদের দুজনের বাড়িই একই গ্রামে। কাছাকাছি বাড়ি। আমাদের বড় ভাই (রবীন্দ্র ঠাকুর) উনার সমবয়সী ও বন্ধু, সে হিসেবে খুব ছোটবেলা থেকে আমি উনার খুব কাছের মানুষ।
‘আপনি কোন সময় তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন?’
‘আমি আমার পনের-ষোল বছর বয়সে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করি।’
‘আপনি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে মুসলমান বাড়িতে গেলেন, আপনার হিন্দুসমাজ এটাকে কীভাবে নিলেন?’
‘সহজে নেয়নি, একটা বাধা তো থাকেই... তবে কেউ আমার সামনাসামনি কিছু বলেনি।’
‘আপনার ছোট ভাই রনেশ ঠাকুরকে দেখেছি করিম সাহেবের বাড়িতে। শুনেছি, আপনারা দুই ভাই এক সঙ্গে তাঁর শিষ্যত্ব নিয়েছেন। এটা নিয়ে হিন্দু-মুসলমান কোনো সংকট হয়নি?
‘আপনি অনেক সুন্দর একটা প্রশ্ন করেছেন যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি আপনার জবাবে এই কথাটাই বলতে চাই, জাতিভেদ উনার কাছে নাই।’
‘আপনি কেমন করে গানের জগতে এলেন?’
‘গানের প্রতি আমার উত্সাহটা অনেক ছেলেবেলা থেকেই। এবং তিনিও ওই সময়ে গানবাজনা করতেন। জন্মসূত্রে আমার মধ্যে গানবাজনার প্রতি একটা টান ছিল। সেকারণেই হয়তো একসময় আমি যাত্রাদলে গান করেছি। ওই সময়ে আমি তাঁর কাছে যাই। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ওই সময়ে রেডিওর পল্লিগীতি আমি ভালোমতো গাইতে পারতাম। শিষ্যদের দিয়ে আমাকে ডাকিয়ে এনে আমার গান শুনতেন। সেই থেকে তাঁর প্রতি আমার অন্যরকম একটা ভালোবাসা জন্মে গেল।
‘করিম সাহেবের গান গাওয়ার, তালিম দেওয়ার পদ্ধতিটা কী? তিনি আপনাদের কী পদ্ধতিতে গান শিক্ষা দিতেন?’
‘আমরা তাঁর বাড়িতে রাত্রিবেলা, বিশেষ করে সন্ধ্যার পরে আসর নিয়ে বসতাম। উনি একটা গান রচনা করলেন, সুর করলেন, আমারে দিলেন আমি একবার গেয়ে শোনালাম। উনি একটু তাল লয় ঠিক করে দিলেন। এরপর আমাদের কিছু বাদ্যযন্ত্র আছে, সেটা সবাই মিলে মিলিয়ে নিলাম। তারপর কিছুদিন রিহার্সেল করলাম। এটাই আমাদের শিক্ষা। কীভাবে গাইতে হবে না হবে কিছু কথাবার্তা আমাদের বোঝাতেন আর কি। এইভাবেই আমরা চর্চা করছি উনার সংগীত।
‘আচ্ছা, জীবন সম্পর্কে, জগত্ সম্পর্কে কোনো দর্শন কি তিনি দিতেন? তাঁর গানে শুধু গানই বড় জিনিস না গানের কথা এবং ভাবটা বড় জিনিস?’
‘না, গানের কথা এবং ভাবটা বড় জিনিস। অনেক ভাব পাওয়া যায়, অনেক আধ্যাত্মিকতা পাওয়া যায় উনার কাছ থেকে। আজ পর্যন্ত উনার কাছ থেকে কিছু কথাবার্তা নিয়ে আমি চলছি। এইটাই আমার সম্পদ বলে আমি মনে করছি।
‘এই কথাগুলো কী? ’
‘উনি বলতেন, (একজন সত্ মানুষ হওয়া দরকার। সত্ মানুষ হলেই সে শিল্পী হবে, বাউল হবে, নেতা হবে, অমুক তমুক হবে। তুমি নিজেই তোমাকে শুদ্ধ করো। তোমার নিজের ভুল নিজে ধরো। এই কথাগুলোই আমার কাছে খুব ভালো লাগত। গানের মধ্যে কিছু তত্ত্বকথা আছে, যেগুলো আমাদের দেহের ব্যাপারে, সাধন ভজন—এ সমস্ত ব্যাপারেও কিছু কথাবার্তা আছে। সাধ্যমতো সেসব পালন করার চেষ্টা করতেছি, করেছি এবং করবো।
‘করিম সাহেবের কোন গানটা গ্রামগঞ্জের মানুষের কাছে প্রথম হিট হয়?’
‘একটা গান, যেমন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেলে আমরা প্রথমে স্তুতি-স্তবকের মতো গাই।
‘‘রাখো কিবা মারো তুমি দয়া করো, থাকিনা যেনো তোমায় ভুলিয়া,
নিশি দিনে শয়নে স্বপনে পরানে পরান মিশিয়া,...’’
এই গানটা সব আসরেই আমাদের গাইতে হতো। পাবলিক এই গানটা শুনতে চাইত বেশি।’
হঠাত্ করে বৃষ্টি এসে পড়ে। আমাদের নৌকায় কোনো ছই নাই,
আমাদের সঙ্গে ছাতা নাই। রুহী ঠাকুর তাঁর দোতরা আর আমি আমার ক্যামেরা নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাই। উজ্জ্বল চটজলদি নদীর পাড়ে নেমে গিয়ে কোথা থেকে একটা পলিথিন নিয়ে আসে। আমরা খানিকক্ষণ এই পলিথিনের ভেতর আমাদের যন্ত্রগুলো নিয়ে আশ্রয় নিই। কিন্তু খুব বেশিক্ষণ সুবিধা করা যায় না। বৃষ্টির মাতম আরেকটু বেড়ে যায়। আমরা নৌকা থেকে নেমে একটা স্কুলঘরের বারান্দায় গিয়ে আশ্রয় নিই। বৃষ্টির মধ্যে গান শুনতে থাকি রুহী ঠাকুরের।
রুহী ঠাকুরের কাছে জানতে চাই—‘করিম সাহেবের যে শিষ্যের মৃত্যু নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে জানতে চাই?’
রুহী ঠাকুর বলেন, ‘তার নাম ছিল আকবর আলী... এই মানুষটা আবার কিছু সিদ্ধিটিদ্ধি খাইতেন। তিনি মারা গেলে মসজিদের ইমাম বলে—না আমি তার জানাজা পড়তে পারবো না... তখন করিম সাহেব বলেন—আমি জানাজা পড়াব...। কিছু কথা কাটাকাটি হইল... শেষপর্যন্ত গ্রামের আরেকজন মওলানা সাহেব জানাজা পড়ালেন। একপর্যায়ে এই মওলানাকে নিয়ে গ্রামে শালিস বসানো হলো। মসজিদের ইমাম বলল—আপনি মানুষরে শিষ্য বানালেন, তারে গাজা খাওয়া শিখালেন...। আমার ওস্তাদ বললেন—আমি তারে ওই কাজ করতে বলিনি... সে তার ইচ্ছায়ই করেছে। তার পাপ-পূণ্য সে-ই ভালো জানে। একজন মানুষ মারা গেল, তার ওপর তো আর কিছু থাকে না।’
‘তার কবর হয়েছিল কোথায়?’
‘ওস্তাদের বাড়ির পাশেই।’
‘সরলা মরার পরে কিছু হয়েছে কি?’
‘তার তো জানাজা হয়েছে তিন বার। ওস্তাদজি বাড়িতে ছিলেন না, তার ছেলেও বাড়িতে ছিল না, সে ছিল সিলেট, আমি এক কাজে গেছি ঢাকা। ওস্তাদজি ছিলেন দিরাই তাঁর এক শিষ্য তকবুল হোসেনের বাড়িতে। তকবুল হোসেনের বোনও তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করত এবং গুরু মানতো। ওই বাড়িতে থাকার সময়ে খবরাখবর হলো যে তিনি মারা গেছেন। তখন যোগাযোগব্যবস্থা এমন ছিল যে লোক পাঠানো ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তিনি যাওয়ার পর আরও দুইবার জানাজা হয়েছে। দাফন করা হয়েছে। বাড়িতেই সমাধি করা হয়েছে।’
‘সরলা খাতুনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় কত সালে? ’
‘আমার সঠিক মনে নাই। সেই সময় আমরা খুব ছোট। ’
‘তার আগে তো তিনি আরেকটি বিয়ে করেছিলেন?’
‘সেটা করেছিলেন মনে হয়। সেটা আমাদের শোনা কথা। তাঁর মুখে কখনো শুনিনি। যারা ময়মুরুব্বি ছিলেন, তাঁরা আলাপ আলোচনা করতেন। বিয়েটা অল্প দিনের ছিল। কিছুদিনের মধ্যে আবার বিয়েটা ভেঙে যায়।’
‘সেই মহিলার নাম জানা আছে কি? ’
‘সেটা বলতে পারব না।’
‘শোনা যায়, ওই মহিলার নাম ছিল আফতাবুন্নেছা। তাঁর নাম থেকেই উনার প্রথম বইয়ের নাম—‘‘আফতাব সঙ্গীত’’?’
‘তা সঠিক বলতে পারব না। তবে শুনেছি, আফতাবুন্নেছা নামে একজন মহিলা ছিলেন। উনার সাথে তাঁর ভাবের সম্পর্ক ছিল। উনিই সেই মহিলা কি না সেটা বলতে পারব না।
‘তাঁর প্রথম বই ‘‘আফতাব সঙ্গীত’’ কখন বের হয়?’
‘এইটা সঠিক বলতে পারব না। শুধু শুনেছি যে, আফতাব সঙ্গীত নামে একটা বই প্রথম বেরিয়েছিল। কিন্তু আমরাও পাইনি। কাগমারী সম্মেলনের আগে বা পরে তিনি আরেকটি বই রচনা করেন যা ছিল গণসংগীত। ওই বইটাও আমরা পাচ্ছি না।
‘সরলা ছাড়া অন্য কোনো নারী এসেছে তাঁর জীবনে?’
‘আমরা তো জানি ভাবশিষ্য হিসেবে অনেক মহিলা উনার কাছে এসেছে।’
‘তাদের নিয়ে কোনো রোমাঞ্চকর ঘটনা আছে নাকি?’
‘আমার জানা নেই, তবে ওই যে একটা কথা আপনি বলেছেন— আফতাবুন্নেছা।’
‘মানুষের জীবনে তো নানা রকমের প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসার সম্পর্ক হয়, হতে পারে। গান গাইতে গিয়ে এরকম কোনো সম্পর্ক উনার (শাহ আবদুল করিম) সাথে কারও হয়েছিল?’
‘প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা তো... আমি আপনারে একটা কথা বলতে চাই, আমরা তো উনার শিষ্য। আমাদের সমাজে একটা কথা আছে—মানুষের দীক্ষা নিতে হয়, বয়াত হতে হয়। আমার জানামতে পাঁচ-সাত হাজার মানুষ এই মন্ত্রে দীক্ষিত। তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ সবাই আছে।’
‘এই বয়াতটা কী?’
‘এই বয়াতটা হলো স্রষ্টারে পাওয়ার জন্য, ঈশ্বররে পাওয়ার জন্য যে পথ, যে মত দেওয়া হয়, অলি-আল্লারা দিয়া গেছেন, সাধু-সন্নাসীরা দিয়া গেছেন।’
‘এ ধরনের কোনো বাউল-শিষ্য নিয়ে কোনো ঘটনা আছে নাকি আপনার জানামতে?’
‘উনার শিষ্যরা উনার ছেলে-মেয়ের মতো।’
রুহী ঠাকুরের অনেক সুনাম শুনেছি মালজুড়া গানের জন্য। নেত্রকোনার বাইশ ছাপড়ার ওস্তার রশিদ উদ্দিন ছিলেন মালজুড়া গানের মহা ওস্তাদ। তিনি তাঁর সাগরেদদের নিয়ে গানের প্রতিযোগিতায় নামতেন। তাত্ক্ষণিকভাবে যুক্তি দিয়ে কথায়, সুরে, ছন্দে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হতো। এই খেলায় রশিদ উদ্দিনের বিচারে আবদুল করিম ছিলেন সবচেয়ে ভালো বাউল সাধক। রাতের পর রাত দুই বাউলে তর্ক বাঁধতো গানে গানে। আবদুল করিমের প্রতিপক্ষ বেশিরভাগ সময়ই ছিলেন দূরবীন শাহ। দূরবীন শাহের পর আরও অনেকেই এসেছেন। এসব বিষয় নিয়ে আলাপ শুরু করি রুহী ঠাকুরের সঙ্গে।
‘আপনার দৃষ্টিতে সিলেট অঞ্চলে সবচেয়ে বড় বাউল কে?’
‘বাউল বলতে—এই মালজুরা গানে বাউল শাহ আবদুল করিম। কামাল উদ্দিন সাহেব নামে আরেকজন ছিলেন দিরাই থানায়, বাড়ি ছিল ভাটিপাড়া।’
‘মালজুরা গান আপনি কোথায় গেয়েছেন?’
‘অনেক জায়গায় গেয়েছি। বৃহত্তর সিলেটের আনাচে-কানাচে অনেক জায়গায় গেয়েছি।’
‘এখন হয় মালজুরা গান?’
‘এখনো হয় মালজুরা গান। আমি আছি, আব্দুল হামিদ, কারি আমির উদ্দিন, মুজিব সরকার আছে। আমাদের পরেও কিছু বাউল আছে।’
‘বাউল গান মানুষ কেন শোনে বলে আপনি মনে করেন?’
‘মানুষের মনের মধ্যে কিছু চাওয়া পাওয়া আছে। এই বাউলদের মুখ থেকে হয়তো তারা শুনে মিলিয়ে নেয়। বাউল গান সহজ কথাবার্তার গান।’
বৃষ্টি থেমে যায়। বিকেলটাও পড়ে আসে। কিছুক্ষণ পরই সন্ধ্যা নামবে। আমরা ফেরত যাবার জন্য আবার নৌকায় গিয়ে উঠি। অনেক হয়েছে, এবার কথা শুনব রুহী ঠাকুরের। তাঁকে জিজ্ঞেস করি, ‘অনেক ব্যান্ডের শিল্পী ফোক গানকে কিন্তু জনপ্রিয় করছেন, তাদের গান কি আপনি শোনেন?
রুহী বলেন, ‘শুনি, কিছু কিছু ভালো গান আছে... কিছু শিল্পী আছে যাদের গলা বলতে কিছু নাই, যন্ত্রনির্ভর, তাদের গান ভালো লাগে না।’
‘কিন্তু তারা তো খুব পপুলার।’
‘হ্যাঁ তারা পপুলার। যুগের চাহিদা তাদের পপুলার করেছে।’
‘এরকম গান আপনার কেমন লাগে?’
‘(হাসতে হাসতে) দেহের একটা রোগ আছে। এ রোগে শরীর ব্যাঁকা-ত্যাড়া হয়ে যায়। ওইসব কিছু কিছু শিল্পীদের দেখলে এমন মনে হয়, ওদেরও এই রোগ আছে।’
‘করিমের গান দেশে এবং বিদেশে গেয়ে আপনি জনপ্রিয় করেছেন—এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
‘করিম সাহেবের গান যেগুলো গাওয়া হয়েছে, সেগুলো মোটামুটি আমরা প্রথম গেয়েছি, গ্রামেগঞ্জে টেপ রেকর্ড করা হয়েছে, মানুষ শুনেছে। আর এখন এটারে রিমিক্স-টিমিক্স করে যন্ত্রপাতি লাগিয়ে এটাকে ব্যাবসায়িকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে টেলিভিশনে দেখি, ওস্তাদের একটা গান ‘গাড়ি চলে না’ এক লোক গাইতেছে, আর দেখাচ্ছে, কিছু লোক একটা ভাঙা গাড়ি ঠেলতেছে... এটা কিছু হয়েছে কি না, আপনারা সুধীসমাজ আপনারাই বুঝবেন। এগুলো ঠিক না।’
রুহী ঠাকুরের সঙ্গে সেদিনের পরে অনেকবার দেখা হয়েছিল আমার। ২০০৫ সালের অক্টোবর মাসে একবার আমার গ্রামের বাড়িতে একটা ছোট জলসার আয়োজন করা হয়েছিল। আমেরিকা থেকে আসা আমার ছোটবোনের জন্য ছিল সেই আয়োজন। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে শেষ রাত পর্যন্ত রুহী ঠাকুর আমাদের নানা রকম গান গেয়ে শোনান। এর মধ্যে দু-একটি তাঁর নিজের লেখা ছিল, বেশিরভাগই শাহ আবদুল করিমের।
এরপর অনেক দিন আর রুহী ঠাকুরের কোনো খোঁজ পাই না। একসময় কাগজে সংবাদ ছাপা হয়। দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। কোনো একটা টেলিভিশনে তার ক্লিপেং দেখায়। আমি দেখি, একটা কঙ্কাল যেন নড়াচড়া করছে। তাঁর জন্য সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীরা কিছু অর্থসাহায্যও সংগ্রহ করেন।
একদিন খবরের কাগজে তাঁর মৃত্যুসংবাদ দেখি। ২০০৭ সালের ৩০ এপ্রিল মারা যান তিনি। আমি জানি, যে এক-দেড়শ গান তিনি লিখেছিলেন, তা দিয়ে তাঁর একটি বই প্রকাশ করার ইচ্ছা ছিল। সে ইচ্ছাটি তাঁর পূরণ হয়নি। জানি না, তাঁর সন্তানেরা এখন কেমন করে কোথায় কীভাবে জীবন যাপন করছেন। গানপাগলা এইসব মানুষর নিজের সংসারজীবনের বিষয়ে বড় বেশি বেহিসাবী হয়ে থাকেন।