আমীরুলের আকাশকুসুম

পঞ্চাশের দশকেই জাঁ পল সার্ত্রের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে পড়তে শুরু করে। একজন সাহিত্যকর্মীর সময় এবং সমাজের প্রতি দায়বোধ থাকতে হবে। মার্কসীয় সাহিত্য ধারণা বার বার আমাদের একথা স্মরণ করিয়ে দেয়, বিশেষ করে তৃতীয় দুনিয়ার একজন লেখকের এরকম আদর্শ থাকবে—এটাই যেন স্বাভাবিক। আমাদের আলোচক ও ভাবিয়েদের ধারণা তা-ই ছিল। এমনকি শিশুদের জন্যে লেখাগুলোর মধ্যেও এরকম দায়বোধ থাকবে—আমাদের বাম ঘারানার লেখক-শিল্পীরা জোর গলায় তা-ই বলতেন। কিন্তু আশির দশক থেকে এই বিশ্বাস ভেঙে যেতে থকে। এমন এক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে আমরা প্রবেশ করেছি যখন সাহিত্য ও ইতিহাসের ক্ষমতা অত্যন্ত সংশয়-সংকুল। বরং সাহিত্য আত্ম-আবিষ্কার ও অনুসন্ধানের একটা উপায় আর একটা দ্ব্যর্থকতার মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহায্য করে, যেমন মিথ্যাকে পরিয়ে দেওয়া হয় সত্যের মুখোশ এবং সত্যকে মিথ্যার। কোনটি সত্য তা খুঁজে বের করবে পাঠক। এই গোলক ধাঁধায় প্রবেশ করানোর ক্ষমতাকে কেউ কেউ বলছেন লেখকের দায়িত্ব। কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে, পাঠককে মোহিত করার ক্ষমতা, স্টিভেনশন যেমন বলেন, মোহিত করার ক্ষমতা ছাড়া বাকি সব নিরর্থক। হয়তো বা তাই কিংবা তা না-ও হতে পারে। এসব কথা মনে হচ্ছিল আমীরুলের ‘আকাশকুসুম রূপকথা’ পড়তে গিয়ে। আমীরুল ইসলামের আকাশকুসুমের রূপকথাগুলো যেন কবিতা বলে। মুক্তছন্দের গদ্য কবিতা। আঙ্গিক ভেঙে এক নতুন আঙ্গিকের দিকে যাওয়া। লেখকের একটা বড় দায়িত্ব বোধকরি নতুন আঙ্গিক তৈরি করা। এই ‘আকাশকুসুম রূপকথা’ গল্পগ্রন্থের গল্প ‘তিনটি বৃষ্টিফোঁটা’, তারা নামতে থাকে মেঘের রাজ্য থেকে। তিনটি বৃষ্টির ফোঁটা তিনটি পৃথক সত্তা। তারা ধারণা করে একে অন্যের চেয়ে বড় সুন্দর এবং নিখুঁত। দ্রুতবেগে তারা পড়তে থাকে। যখন নামে মাটিতে আর পানির সঙ্গে মিশে যায়, বিলীন হয়ে যায়। তাদের গড় আকার কিংবা ওজন—সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কিংবা কেউ নিখুঁত ছিল কি না? এই অনন্তর প্রশ্নের মুখোমুখি আমীরুল আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন, তৈরি করেন এক বৌদ্ধিক বিমূর্ততা। যেখানে আবেগ ও বাস্তবতার গুরুত্ব নিঃসন্দেহে কম। বৃষ্টির ফোঁটা তিনটি দ্রবীভূত হওয়ার পর পরস্পরের ব্যবধানরেখা মুছে যায় এবং তারা একক সত্তায় পরিণত হয়। নবোকভের ‘পেল ফায়ার’ উপন্যাস যাকে বাংলা করা যায়, ‘বিমর্ষ আগুন’—এরকম একটি বই। যেখানে গল্পকে আপাতদৃষ্টিতে কবিতার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সংস্করণ বলে ভাবতে শেখায়। আমীরুলের ‘আকাশকুসুম রূপকথা’ গ্রন্থের গল্পগুলোর কোনো অংশ কাল্পনিক, হয়তো যে বিষয়টি দ্ব্যর্থক সেটিই। আমাদের জানা এবং দেখা প্রাণীগুলোর কর্মতত্পরতা এবং কথনভঙ্গি যে কাল্পনিক জগতের জন্ম দেয়, সেই ভুবনে এই দ্ব্যর্থকতাই স্বাভাবিক। আমীরুলের মৌল কিছু জ্ঞানের ওপর কল্পনা ও অপ্রকৃতের ছাঁকনি জ্ঞানকে জাদুপদার্থের পাতন করে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত তা গল্প এবং কবিতার মাঝখানে এক নতুন জগত্ তৈরি করে। যদি আমরা জিজ্ঞেস করি পৃথিবীর কোন সাহিত্য ত্রুটিমুক্ত? যত ঐশ্বর্য কিংবা সংহত রচনা হোক না কেন কোথাও না কোথাও বিচ্যুতি ঘটে—একে বিশ্লেষকরা নৃকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধতা বলেন—আমীরুলের এই নৃকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধতা তার মানবীয় গুণাবলীরই সাক্ষ্য দেয়। একশ ভাগ নিখুঁত বলে কিছু নেই, এমনকি রবীন্দ্রনাথের মতো শ্রেষ্ঠ শিল্পী, সৃজনশীল মানুষ প্রায় নিখুঁত হবার কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, তিনিও না। এই চিরন্তন সত্যটির জ্বলন্ত উদারহণ ‘তিনটি বৃষ্টির ফোঁটা’ গল্পটি। এই বইতে ‘গায়ক প্রজাপতি’ আরেক দুর্দান্ত লেখা। প্রজাপতি গান গাইতে চায় কিন্তু কদর নেই তার। শুঁয়োপোকা বলে তার কারণ—তোমার গানের সৌন্দর্য আমরা হারিয়ে ফেলি তোমার ডানার সৌন্দর্যের মধ্যে। ধূসর পালক নাইটিঙ্গেলের মিষ্টি স্বর কিংবা কালো কোকিলের মিষ্টি গলা এই সত্য মনে করিয়ে দেয়। প্রজাপতি ডানা ঘষেমেজে ধূসর করে তোলে, কিন্তু তাতেও তার গানের কদর মেলে না—ব্যাঙ তার গান শোনে না। বরং অনাদরেই প্রজাপতির গান স্তব্ধ হয়ে গেল। যার যা কাজ নয় তাকে দিয়ে তা হয় না—প্রকৃতির এই অমোঘ সত্য ছেঁকে তুলেছেন আমীরুল তার গল্পে। বাংলা রূপকথার যে গীতিময় লাবণ্যের দিক ও গঠনরীতি, তাকে তিনি ভোলেননি বরং যোগ করেছেন নতুন মনস্তত্ত্ব, দ্ব্যর্থক চিন্তার উপাদান। প্রাণীসকল কথা বলে, তারা সততার মূল্য দেয় এবং মানুষের সাথে সহাবস্থান করে। দুর্যোগে ও বিপদে মানুষকে সহায়তা দেয়। আমরা এর এক ধারাবাহিক উন্নয়ন পাই আমীরুলে। ঈশপ থেকে শুরু করে আজ অব্দি প্রাণীকে প্রাপণীয় হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্য। সমপ্রতি ‘বরফযুগ’ নামে একটি কার্টুনধর্মী ছবি আমাকে মুগ্ধ করেছে। কল্পনার ঐশ্বর্য আর আদিযুগের অকল্পনীয়তা আমাকে দিয়েছে যারপরনাই কৌতূহল ও ভাবনার জগত্। পৌরাণিক কাহিনিতে পাই এক পয়গম্বর সোলেমানের কথা। তিনি বুঝতেন পশুপাখি জীবজন্তুর ভাষা। তত্ক্ষণাত্ আমরা ওই পয়গম্বরকে কল্পনার মধ্যে খুঁজতে থাকি। ঠাকুরমার ঝুলিতে যেসব অধিবিদ্যিক গল্প সঞ্চিত আছে, তার কিছু চরিত্র আমীরুলের কাছে আধুনিক জগত্ দেখতে চেয়েছে। আর যায় কোথায়, আমীরুল মহানন্দে ওদের স্থান করে দিয়েছেন তার রচিত জগত্সংসারে। ‘রাজকন্যার ঘুম’ গল্পে যখন রাজকন্যার ঘুম ভাঙাতে কবি এসে রাজাকে উপদেশ দেয়—‘হীরক রাজার মতো না হয়ে, মানুষকে কর্মভারমুক্ত আনন্দিত জীবন দিন, আপনার কন্যাও জেগে উঠবে।’ রাজা তা-ই করে, আর রাজ্যে জীবন ও প্রকৃতি চঞ্চল হয় সজীব হয়। এখানে কবি এক মানবিক সত্যের প্রতিনিধি। ঘুম ভাঙানোর এত সহজ নিরাময় আমীরুল তৈরি করে দিলেন যাতে গল্পটি দ্যুতি ছড়ালো—সেরকমভাবে তারই বর্ণনায়, ‘মোতিদানার মতো চোখ তুলে রাজকন্যা তাকায়’! ‘রাজপুত্র ও বটগাছ’ গল্পে ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচতে রাজপুত্র বটগাছের কাছে সাহায্য চাইলে গাছ তার বুক চিরে জায়গা দেয়’। আমরা জানি আমাদের ঠাকুমার ঝুলিতে এরকম গাছের মাহাত্ম্যের কথা। একবার আমি আমার এক কবিতায় ব্যবহার করেছিলাম—‘বুক চিরে গাছ জায়গা দিলে মুখ লুকাবো’। কবি নির্মলেন্দু গুণ লাইনটি পছন্দ করেছিলেন। গাছ বুক চিরে জায়গা করে দিচ্ছে সেই আদিকাল থেকে—কিন্তু আমরা কি তা জানি? আমরা ভুলে যাই। বিস্মৃতিপ্রবণ এক জাতিগোষ্ঠী আমরা। গাছেদের আত্মত্যাগের কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে আমীরুলের এই গল্পটি থাকে বিবেকের ভূমিকায়। এ প্রসঙ্গে ব্রাডলির কথা মনে আসে—কবিতাবলির প্রতিক্রিয়ার একটি হলো এ কেবল কোনো কিছু অর্থাত্ নতুন কিছু আবিষ্কারের ধারণাই দেয় না, দেয় আমরা যা ভুলে গিয়েছি তার কিছু স্মরণীয়তা। প্লেটোনিক সংজ্ঞায় যাকে বলে—অভীপ্সাপূর্ণ, পরিবর্তনশীল, পবিত্র জিনিস। যখন আমরা এইসব গল্পের সত্যতা খুঁজতে যাব তা আমাদের খুঁজতে হবে—সাহিত্যের ঐতিহাসিক অনুভবে। কোনো নির্দিষ্ট সূচিতে কেউ লেখক হয় না। কেউ আটটা থেকে বারোটা কিংবা বারোটা থেকে দুটো—এই সময়ঘণ্টার মধ্যে লেখক কিংবা কবি হয় না। ‘লেখকের ছবি’ গল্পটাতো এই কথাগুলোই বলতে চেয়েছে। ফড়িং লেখককে সহজ হতে বলেছে—সে লিখবে মনের আনন্দে কিংবা বিষাদে। সারাদিন আকাশ-পাতালে ঘুরলেই উপজীব্য উদ্ধার হবে না বরং ‘আমাদের ভাবনাগুলোই’ লেখালেখি। হয়তো ভাবনাগুলোই লেখালেখি কিন্তু কোন ভাবনা, সব ভাবনাই কি? হুট করে মাথায় এলেই কি তা লিখে ফেলবেন? তা নিশ্চয়ই নয়। অসংখ্য ভাবনার মধ্য থেকে সকলে পছন্দ করবে কিংবা সকলের কাছে গ্রহণীয় হবে এরকম সম্ভাব্য ভাবনা তার সামাজিক দায় থাক বা না থাক। যদি কেউ আমীরুলের গল্প পড়ে তাকে জিজ্ঞেস করে, গল্পের বিশেষ করে ছোটোগল্পের সংজ্ঞা কী? আমীরুল রবীন্দ্রনাথের সেই সংজ্ঞা, ‘ছোটো প্রাণ ছোটো কথা, ছোটো ছোটো দুঃখ ব্যথা নিতান্তই সহজ সরল’—এই সংজ্ঞা দেবেন না, দেওয়ার দরকারও নেই, বরং তিনি হয়তো বলবেন—‘গল্পটির কোনো কোনো নেই, এ লেখা হয় তাই লেখা হয়েছে।’ সপ্তদশ শতকের জার্মান কবি অ্যাঞ্জেলুস সেলেসিয়াস যেমন বলেন—গোলাপটির কোনো কোনো নেই—এ ফোটে কারণ এ ফোটে।’