দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহারে মানুষের ঢল

কক্সবাজার জেলার রামু ও উখিয়া উপজেলায় দুষ্কৃতকারীরা হামলা চালিয়ে ১৯টি বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। কোন কোন বিহার ভাঙচুর করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলে বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরগুলো। সেই ধ্বংসস্তূপ এলাকায় শিল্পীর নিপূণ হাতের ছোঁয়ায় আবার গড়ে উঠেছে বৌদ্ধ বিহার। এ যেন হূদয় কেড়ে নেয়ার মত সৌন্দর্যের নক্ষত্র। এমন দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির হবে যা স্বয়ং ভিক্ষুরা প্রত্যাশাও করেননি। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতে, বর্তমান সরকার যা করেছে তা ধারণার বাইরে। তারা কল্পনাও করেননি একই স্থানে এমন সৌন্দর্যে ভরপুর বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির দেখতে পারবেন। রামু ও উখিয়ায় পুন:নির্মিত ও সংস্কারকৃত বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে সরেজমিনে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভিক্ষুদের সঙ্গে আলাপকালে ভিক্ষুরা তাদের আবেগময় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ভিক্ষুরা বলেন, তাদের ধর্মের বিখ্যাত স্থপতির নকশা অনুযায়ী ঐ সব বিহার ও মন্দির নির্মিত হয়েছে। এসব বিহার ও মন্দিরে দুষ্কৃতকারীরা যেভাবে ধ্বংস ও তান্ডবলীলা করেছিলেন তা দেখে তখন তারা শুধু অঝোরে চোখের পানি ফেলেছিলেন। এ হামলার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করায় বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের অপূরণীয় ক্ষতি এবং সমপ্রীতির বন্ধন চুরমার হয়ে গিয়েছিল। একই স্থানে সেই সব বিহার ও মন্দির নবরূপে সজ্জিত হয়ে অপার সৌন্দর্য বর্ধন করায় তারা সব কিছু ভুলে গেছেন। গত বুধবার ঢাকা সেনা সদর দফতরের জিএসও-১ লে. কর্নেল কাজী ইফতেখারুল আলমের নেতৃত্বে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ৩০ জন সাংবাদিক ঢাকা থেকে রামু ও উখিয়ার পুন:র্নিমিত বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বরত ভিক্ষু ও অন্যরা সাংবাদিকদের কাছে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামু ও উখিয়া উপজেলার ১৯টি বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে দুষ্কৃতকারীরা হামলা চালায়। সেখানে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চলে রাতভর। রামু উপজেলার ১২টি ও উখিয়া উপজেলার ৭টি বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির হামলা ধ্বংসলীলায় পরিনত হয়। রামু উপজেলার ১২টি বৌদ্ধ বিহার হচ্ছে, মেরুং লোয়া রামুর কেন্দ্রীয় সীমা বিহার, উত্তর মিঠাছড়ি বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা বিহার, শ্রীকুল এলাকার রামু মৈত্রী বিহার, উখিয়ার ঘোনা এলাকার আর্যবংশ বৌদ্ধ বিহার ও জেতবন বৌদ্ধ বিহার, চাকমারকুল এলাকার অজান্তা বৌদ্ধ বিহার, শ্রীকুল এলাকার অপর্ণচরণ বৌদ্ধ বিহার, উত্তর মিঠাছড়ি এলাকার প্রজ্ঞা মিত্র বন বিহার, শ্রীকুল এলাকার সাদা চিং বিহার, উত্তর ফতেখাঁর কুল এলাকার বিবেকারাম বৌদ্ধ বিহার ও শ্রীকুল এলাকার উসাইন সেন রাখাইন বৌদ্ধ বিহার। উখিয়া উপজেলার ৭টি বিহার হচ্ছে, পশ্চিম মরিচ্যা দিপাংকুর বিহার, রাজা পালং জাদি বৌদ্ধ বিহার, খয়রাতি পাড়ার প্রজ্ঞামিত্র মহারত্ন সার্বজনীন বৌদ্ধ বিহার, উত্তর বিল বিহার, রত্না পালংকোর্ট বাজার পশ্চিম রত্নাশাসন তীর্থ সুদর্শন বিহার, পাইন্যাশিয়া বৌদ্ধ যুব কল্যাণ পরিষদ ও রেজারকুল সদ্ধর্ম বিকাশ বিহার। ঘটনার পর গত বছরের ৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামু ও উখিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শন করেন। ঐ সময় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা ও মহাথেরো (ভিক্ষু) সত্যপ্রিয়সহ বেশ কয়েকজন ভিক্ষু প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার পুনঃনির্মাণ করার দাবি জানান। সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহারগুলো পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন, চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধানে ১৭ জন ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (ইসিবি) এসব ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রমের দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করে। এ জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। টাকা পেতে বিলম্ব হওয়ায় সেনাবাহিনীর প্রধান ইকবাল করিম ভুঁইয়া সৈনিকদের কল্যাণ ফান্ড থেকে অগ্রিম ৫ কোটি টাকা প্রদান করেন। এ টাকা পেয়ে ১ নভেম্বর থেকে সেনাবাহিনীর ঐ ইউনিট সর্বশক্তি নিয়োগ করে কার্যক্রম শুরু করে দেয়। ২০ কোটি টাকা পাওয়ার পর ঐ ৫ কোটি টাকা ফেরত দেয়া হয়। স্পেশাল ওয়ার্কার্স অর্গানাইজেশন (চট্টগ্রাম) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সামসুল আলম খানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ১৭ ইসিবির অধিনায়ক ও ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার পুনঃনির্মাণ প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল সিদ্দিক মোহাম্মদ জুলফিকার রহমান এবং উপ অধিনায়ক ও প্রকল্প কর্মকর্তা মেজর এসএম আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে টানা ৮ মাসে ১৯টি ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হয়। এতো অল্প সময়ে দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক শোভা নিশ্চিত করে বিহারগুলো নির্মাণ ও সংস্কার করায় সবাই অভিভূত হয়েছেন। গত ৩০ জুন পুনঃনির্মাণ কাজ শেষ হয়। ৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী পুনঃনির্মিত বৌদ্ধ বিহারগুলো উদ্বোধন করেন। রামু ও উখিয়ায় বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরগুলোর পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার কাজ সরকারের শীর্ষ মহল কিংবা সুশীল সমাজের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। ভিক্ষুরা বলেন, আমরা আশা করিনি এত সুন্দর বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ হবে। বেশিরভাগ বিহার প্রাচীনতম নড়াচড়া টিনসেডে কিংবা আধা পাকা ঘরে ছিল। সেই জায়গা এখন নান্দনিক শোভা সজ্জিত হওয়ায় বৌদ্ধ বিহারগুলোর চারিদিক আলোর ঝলকানি ফুটে উঠেছে। প্রতিদিন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোক ছাড়াও হিন্দু মুসলমানসহ সকল ধর্মবর্ণের লোক দলে দলে দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার দেখতে আসছেন। ভিক্ষুরা জানান, অতীতে এ বিহারে এত লোক কখনও আসেনি। উত্তর মিঠাছড়ির বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা বিহারের মহাথেরো শ্রীমত্ করুনাশ্রী বলেন, ২০০২ সালে তিনি ৭০/৩৫ ফুটের টিনসেডে এই বিহার চালু করেন। এ বিহারের গৌতম বুদ্ধের ১০০ ফুট লম্বা মূর্তিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখানে দোতলা বিশিষ্ট বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করা হয়। সরকারের কাছ থেকে এত পাবো আশা করতে পারিনি। রামু মৈত্রী বিহার, লাল চিং ও সাদা চিং বিহারের ভক্ত অখিল বড়ুয়াও অজিত বড়ুয়া এবং রামু উপজেলা বৌদ্ধ ঐক্য ও কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়ুয়া একই মতামত পোষণ করেন। রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের সত্য প্রিয় মহাথেরো বলেন, এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত বিহারগুলো নির্মাণ করে মনের দুঃখ ও বেদনা দূর করে দিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানান। রাখাইন সম্প্রদায়ের ২শ বছরের উসাইসেন রাখাইন বিহারের ফাইংখাদিবা মহাথেরো বলেন, হামলার সময় বিহারগুলোর অনেক মূর্তি চুরি হয়ে গেছে। এ নিয়ে তাদের মনে ক্ষোভ রয়েছে। তবে সরকার যেভাবে পুনঃনির্মাণ কাজ করে সহযোগিতা করেছেন, তা মনে থাকবে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের।