কিডনীতে পাথর হলে

কিডনী সীমের বিচি আকৃতির দুইটি অঙ্গ যা মানবদেহের পিছনে বক্ষ খাঁচার নীচে অবস্থিত। কিডনীর মূল কাজ হচ্ছে মূত্র তৈরীর মাধ্যমে শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের করে দেয়া। এছাড়াও কিডনী রক্ত তৈরীতে সাহায্য করে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। শরীরে অম্ল, ক্ষার ও লবণের সমতা রক্ষা করে। ক্যালসিয়াম মেটাবলিজমে অংশ গ্রহণ করে। মিশরের আল হামরা সমাধি ক্ষেত্র থেকে উদ্ধারকৃত ৭০০০ বত্সরের পুরাতন মমির মূত্র থলিতে পাথর পাওয়া গেছে। এই মমিটাই এখন পর্যন্ত আবিস্কৃত সবচেয়ে পুরাতন পাথুরে রোগে আক্রান্ত মানুষ। সেই প্রাচীন মিশরে পাথুরে রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির উপর শল্য চিকিত্সা প্রয়োগের কোন পদ্ধতি জানা ছিল না বলে প্রতিয়মাণ হয়। প্রাচীন ভারত বর্ষে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে মূত্র তন্ত্রের পাথুরে রোগ সম্পর্কে জানা যায়। চারাকা ছিলেন রাজা সাথিয়া (Scythia)-র ব্যক্তিগত চিকিত্সক। সাথিয়া সেই সময় মূত্রনালি (Urethra)-র পাথর হুক দিয়ে টেনে বের করার পরামর্শ দিয়ে ছিলেন। প্রাচীন গ্রীসের চিকিত্সা বিজ্ঞান উন্নত ছিল। হিপোক্রেটিসের বর্ণনায় কিডনী ও মূত্রতন্ত্রের পাথর ও তার চিকিত্সা পদ্ধতি পাওয়া যায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে কিডনী ও মূত্রতন্ত্রের পাথর চিকিত্সা বর্তমান আধুনিক অবস্থায় এসেছে। কিডনীতে পাথর তৈরী হওয়ার কারণগুলো জটিল, মালটি ফ্যাকটোরিয়াল এবং এখনও বেশ স্পষ্ট নয়। ইউরিনারি স্টোনের উপাদান হচ্ছে কৃষ্টালয়েড ও অরগাণিক ম্যাট্রিক্স। মূলত ইউরিন সুপার সেজুরেটেট হলে পাথর তৈরী প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এই সুপার সেজুরেসন নির্ভর করে ইউরিনের pH, আয়নিক ষ্ট্রেন্থ এবং সলুউটের ঘনত্বের উপর। ইউরিনে কিছু স্টোন ইনহিবিটর থাকে যাদের উপস্থিতির হেরফেরের কারণে পাথর হতে পারে। সাধারণত কিডনী বা মূত্রতন্ত্রের পাথর হলে ৭৫% রোগীর ক্ষেত্রে ব্যথা নিয়ে আসতে পারে। তীব্র ব্যথা হঠাত্ করে আরম্ভ হয় এবং এই ব্যথা মেরুদন্ডের পাশে বক্ষ খাচার নীচে অনুভূত হয়। এই ব্যথা পেটের সামনের দিকেও অনুভূত হতে পারে। এই ব্যথা পাথরের অবস্থানের তারতম্যের জন্য অনুভবের স্থানেরও তারতম্য হয়। পাথর উপর বা মধ্য ইউরেটারে থাকলে ব্যথা কিডনী বরাবর জায়গা থেকে শুরু হয়ে পেটের নীচের দিকে অনুভূত হতে থাকে। বা বাকা ব্যন্ডের মত বিস্তৃত হতে পারে। পাথর ইউরেটারের নীচের দিকে থাকলে ব্যথা অনুভূত হয় এবং এই ব্যথা পুরুষের ক্ষেত্রে টেস্টিস বা অন্ডোকোষে এবং স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে ল্যাবিয়া মোজোরাতে অনুভূত হয়। পাথর ইউরেটার ও ইউরিনারি ব্লাডারের অন্তবর্তী স্থানে হলে ব্যথা অনেক সময় প্রোস্টাইটিস, সিসটাইটিস বা ইউরেথ্রাইটিস হিসেবে ভুল হতে পারে। কিডনীতে পাথর থাকার অন্য লক্ষণ হল রক্ত বর্ণ প্রস্রাব, প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া কখনও কখনও খালি চোখে দেখা না যেতে পারে। ঘন ঘন প্রস্রাব, জ্বর বা প্রস্রাবের জ্বালা যন্ত্রণা নিয়ে অনেকে আসতে পারেন। প্রস্রাব পরীক্ষা, এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষার সাহায্যে এই রোগ নির্ণয় করা হয়। কিডনীর পাথর চিকিত্সায় পাথরের আকার, আকৃতি ও অবস্থানের উপর নির্ভর করে শরীরের বাইরে থেকে শকওয়েভ (ESWL) দিয়ে ভেঙ্গে বের করে আনা যায় (PCNL) কিংবা অস্ত্রপচার করে পাথর বের করা যায়। মধ্য ও নিম্ন ইউরেটারের পাথর আকার ও আকৃতির উপর নির্ভর করে প্রস্রাবের রাস্তার ভিতর দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে ভেঙ্গে বের করে আনা যায় বা অপারেশন করে বের করে আনা যায়। পাথর মূত্র থলিতে থাকলে আকার অনুযায়ী এটাকে যন্ত্রের সাহায্যে ভেঙ্গে মূত্রনালীর ভিতর দিয়ে বের করে আনা যায় অথবা অপারেশন করা যায়। কিডনীর পাথর চিকিত্সায় ব্যবহূত উন্নতমানের প্রায় সকল চিকিত্সা পদ্ধতি বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে এবং বাংলাদেশের কৃতি ইউরোলজিস্টরা সাফল্যজনকভাবে এই সব চিকিত্সা পদ্ধতির প্রয়োগ করছেন। ESWL বা Extra corporeal shock wave lithotripsy এমন একটা পদ্ধতি যা দ্ব্বারা শরীরের বাহির থেকে যন্ত্রের সাহায্যে শকওয়েভ পাঠিয়ে পাথর ভেঙ্গে ফেলা হয়। ESWL করে পাথর ভাঙ্গার জন্য যে বিষয়গুলো গুরুত্ব দেয়া হয় তা হলো পাথরের উপাদান, আকার, অবস্থান ও ইউরেটারের পেটেন্সি। সাধারণত যে সমস্ত পাথরের আকৃতি ২ সেন্টি মিটারের কম নন ইমপেকটেড আপার ইউরেটারিক স্টোন বা ২ সেন্টি মিটারের কম ইউরিনারি ব্লাডার স্টোন ESWL দ্বারা ভাঙ্গা যায়, যদি অনিয়ন্ত্রিত রক্তপাতজনিত রোগ থাকে বা গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় না, এছাড়াও ইউরিনারি ট্রাক ইনফকেশন, পাথরের নীচের দিকে ইউরেটার বন্ধ, কার্ডিয়াক পেসমেকার, রেনাল ফেইলিউর বা সিসটিন স্টোনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। PCNL বা Percuteneous Nephrolithotomু হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি যার সাহায্যে এন্ডোসকপি যন্ত্রের সাহায্যে ছোট একটি ফুটো করে কিডনীর পাথর ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে বের করে নিয়ে আসা হয়। বড় পাথর, সিসটিন পাথর কিংবা যাদের ESWL করা যাচ্ছে না সেসব ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিতে রোগীর পিছনের দিক দেয় C-arm মেশিনের সাহায্যে কিডনীতে ফুটো করে একটি টিউব বসিয়ে দেয়া হয। এই টিউবের মধ্যে দিয়ে নেফ্রোসকোপ মেশিন ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এরপর মনিটরের পর্দায় পাথরটি দেখে লিথোট্রিপটর নামক অন্য একটি মেশিনের সাহায্যে পাথর ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে যন্ত্রের সাহায্যে বের করে আনা হয়। URS বা Uretero Renoscopy হচ্ছে আরেকটি আধুনিক পদ্ধতি যার সাহয্যে মূত্রনালীর ভিতর দিয়ে ইউরেটার এবং রেনাল পেলভিস সরাসরি দেখা যায়। এ যন্ত্রের বহুবিধ প্রয়োগ রয়েছে। এখানে এ যন্ত্রের সাথে Intricorporeal Pneumatic Lithotripsy মেশিনের সাহায্যে ইউরেটারে পাথরের যে চিকিত্সা করা হয় তাই আলোচনা করব। প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ইউরেটারে পৌছে সরাসরি মনিটরের পর্দায় ইউরেটারে পাথর দেখে তা (আইসিপিএল) যন্ত্রের সাহায্যে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে বের করে নিয়ে আসা হয়। এ পদ্ধতিটি মিড এবং লোয়ার ইউরেটারিক ষ্টোনের ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। আপার ইউরেটারিক স্টোনকে ঠেলে কিডনীতে পাঠিয়ে দিয়ে পরে ESWL করা যায়। অনেক সময় লোয়ার বা মিড ইউরেটারিক স্টোন ভাঙ্গার সময় কিডনীতে চলে যেতে পারে, সেক্ষেত্রে পরে ESWL করে নিতে হয়। কিডনীতে একবার পাথর হলে তা বার বার হতে পারে। তাই কিছু সতর্কতা অবলম্বন করে এর পুনরাবৃত্তির হার কমিয়ে আনা যায়। সাধারণত যে সব এলাকায় গরম বেশি সে সব জায়গার লোকদের মধ্যে কিডনী পাথর বেশি দেখা যায়। এর কারণ হচ্ছে প্রধানত অতিরিক্ত গরমের ফলে শরীর থেকে প্রচুর পানি বের হয়ে যায়, ফলে প্রসাবের পরিমাণ কমে যায়। এর ফলে শরীর বৃত্তির কার্যকারণে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই এসবক্ষেত্রে পানি বেশী খেতে হবে। পানি খাবার পরিমাণ খাদ্য গ্রহণের ৩ ঘন্টার মধ্যে বেশী হতে হবে, যখন প্রচুর পরিশ্রম করা হয় তখনও পানি বেশী খেতে হবে, পানির পরিমাণ এমন হতে হবে যাতে ২৪ ঘন্টার প্রস্রাবের পরিমাণ ৩ লিটার বা তার বেশী হয়। পুনঃ পৌনিকভাবে যাদের কিডনীতে পাথর হয় তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে খাদ্যাভ্যাস একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। প্রোটিন কিডনী দিয়ে ক্যালসিয়াম, অক্সালেট ও ইউরিক এসিডের নিঃসরণ বাড়ায়। এই এসিড কিডনী থেকে ক্যালসিয়াম অ্যাবজরসন কমায়। এসব বিপাক ক্রিয়ার ফলে কিডনীতে পাথরের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। যাদের কিডনীতে বার বার পাথর হয় তাদেরকে দৈনিক প্রোটিন গ্রহণ বেশী না করা শ্রেয়। ডায়েটরি ফাইবারে ফাইটিক এসিড থাকে যা অন্ত্রের ক্যালসিয়ামের সাথে যুক্ত হয়ে ক্যালসিয়ামের অ্যাবজরসন কমিয়ে দেয়। ফাইবার যুক্ত খাদ্য যেমন গম, সয়া, চাউলের ভূসি স্টোন রিকারেন্স কমায়। যেসব খাদ্যে ক্যালসিয়াম ও অক্সালেট বেশী আছে যেমন দুধ, পনির ইত্যাদি রিকারেন্ট স্টোনের রোগীদের কম খাওয়া উচিত্। অধিক লবণযুক্ত খাদ্য কিডনীতে পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় তাই যাদের কিডনীতে বার বার পাথর হয় তাদের অধিক লবণযুক্ত খাদ্য কম খাওয়া ভাল। এছাড়াও যাদের কিডনীতে বার বার পাথর হয় তাদেরকে পাথর এনালাইসিস করে স্পেসিফিক সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।