দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়

সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার আহবান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে না। ৪২ বছরেও আমাদের নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে জটিলতা কাটেনি। তাই নির্বাচন পদ্ধতির একটি স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজন। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক( সুজন) আয়োজিত ‘রাজনৈতিক সংকট নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তারা এ আহবান জানান । সুজনের সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। বক্তব্য রাখেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, সুজন নির্বাহী সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, সুজন নির্বাহী সদস্য ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। নির্দলীয় সরকারের লক্ষ্যে সরকারকে বাধ্য করতে জেলায় জেলায় আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে অতীতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় ১৯৮৬, ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালের নির্বাচন জনগণ গ্রহণ করেনি। সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর আমাদের নির্বাচন নিয়ে বিদেশিরা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেন, আজকে হলমার্ক ইস্যুতে চার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি হলেও সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন যে, এ কিছুই না। তাই এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। গত তিন বছরে সুপ্রিম কোর্টে ৬১ জন বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যা নজিরবিহীন। কোন যোগ্যতায় তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে জাতি তা জানতে চায়। আদালত তথা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই। এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, বর্তমান সংকট নিরসনে কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অথচ সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে আমাদের অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাসহ অন্যান্য সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, আমাদের বড় দুই দলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। উভয় দলই দলীয়করণ ও দুর্নীতি করে এবং তারা আইনের শাসন মানতে আগ্রহী নয়। সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় নাগরিক সমাজের একটা নজরদারি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত আমাদের এখানে সেরকম কোন নাগরিক সমাজ গড়ে ওঠেনি। আমাদের রাজনীতিবিদরা তাদের স্বাধীন সত্ত্বা হারিয়ে ফেলেছেন। এখন দলের প্রধান প্রতিদিন যা বলেন তাই যেন অলিখিত সংবিধান। তাই আমরা দলের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট বার্তা শুনতে চাই। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমাদের দেশে যারাই ক্ষমতায় থাকে তারা বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন চালায়। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে আমাদের ভোটারদের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে। যেমন- না ভোটের বিধান পুনরায় প্রবর্তন, রি-কল সিস্টেম চালু, স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে গঠিত প্যানেলের মাধ্যমে মনোনয়ন। সর্বোপরি যে সরকারই থাকুক না কেন, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিতে হবে। সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচন নিয়ে জটিলতা রাজনৈতিক সংকট হলেও এটি আবার সাংবিধানিক সংকটও বটে। তড়িঘড়ি করে সংবিধান সংশোধন করে এই সংকটের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বদিউল আলম মজুমদার বর্তমান সংবিধানের সমালোচনা করে বলেন, এটি বাস্তবসম্মত নয়। আমাদের একদিকে রয়েছে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সবার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ। অন্যদিকে রয়েছে একদলীয় নির্বাচন করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আবারও খাদে ফেলা। তাই আজ অনেকের আশঙ্কা যে, বিরোধী দলের বর্জনের মুখে একতরফা নির্বাচনের ফলে সারাদেশে সহিংসতা ছড়াবে এবং জাতি হিসাবে আমরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হব। এর পরিণতি হবে একটি অকার্যকর, এমনকি উগ্রবাদী রাষ্ট্র। ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী ভারত হাইকমিশনের সামনের রাস্তা ফেলানীর নামে নামকরণের প্রস্তাব রেখে বলেন, আমাদের আইনের অভাব নেই,তবে আইনের শাসনের অভাব আছে। মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন ও অধ্যাপক শওকত আরা বেগম , রুহিন হোসেন প্রিন্স, সাংবাদিক মুনির হায়দার ও গোলাম মুর্তজা প্রমুখ।