নিজেরাই গড়ে তুলি হাতিয়ার

বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ

‘একটি সুস্থ জাতি পেতে প্রয়োজন একজন শিক্ষিত মা’— এই উক্তিটি প্রখ্যাত মনীষী ও দার্শনিক নেপোলিয়ন বোনাপার্টের। অথচ আজ এই একুশ শতকে এসেও বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ নারী এখনো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আর এর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। আগামী প্রজন্মের সুস্থভাবে বেড়ে উঠা এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতেও বাল্য বিবাহ একটি বড় বাধা। নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানতম বাধা হিসেবেও বাল্যবিবাহকে চিহ্নিত করা যায়। বাল্য বিবাহের শিকার ছেলে বা মেয়ে সে যাই হোক না কেন; সে তার উচ্চ শিক্ষা এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে শিশু শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হয়। ফলে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শিশু, কিশোরী এবং কোন কোন ক্ষেত্রে কিশোররাও উন্নত জীবন ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তিগত তথ্যপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের ৫ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১০-১৯ বছর বয়সের দুই তৃতীয়াংশ কিশোরী বাল্য বিবাহের শিকার হয়। সেভ দ্যা চিলড্রেন এর ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ৬৯ শতাংশ নারীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বাল্য বিবাহের হার ২০০৯ সালে ছিল ৬৩ শতাংশ, যা ২০১৩ সালে এসে বেড়ে ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ সার্ভে এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে নারীর বিয়ের গড় বয়স ১৫ বছর ৩ মাস । ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সের নারীদের মধ্যে যাদের ১৮ বছরের মধ্যে বিয়ে হয়েছে তাদের শতকরা হার ৬৬ যা ২০০৪ সালে ছিল ৬৮ শতাংশ। এই বাল্য বিবাহ প্রতিরোধের জন্য প্ল্যান বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে নিজ নিজ এলাকায় কাজ করে সুফল পেয়ে জাতিসংঘের নজরে পড়েছে বাংলাদেশের ৫ কিশোর-কিশোরী। দেশের নীলফামারী, ঢাকা আর গাজীপুরের বেশ কিছু জায়গায় তারা সংগঠিত হয়ে কাজ করে। কেশব ও তার দল বেশ কিছু জায়গায় প্রচারণা চালিয়ে ওই নির্দিষ্ট বয়সের ছেলে-মেয়ে ও তাদের অভিভাবকদের বোঝাতে সমর্থ হয়েছে যে মেয়েদের ১৮ বছরের আগে লেখাপড়া বিয়ের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দলের নাম সূর্যমুখী, অন্য সদস্যরা হচ্ছেন নীলফামারীর আরজিনা বেগম, ঢাকার অলি আহম্মেদ ও তামান্না আখতার জিন্নাত এবং গাজীপুরের রুমা বেগম। এদের সবার পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল প্ল্যান বাংলাদেশ। কেশবের সাথে কথা বলে জানা যায়, সে ২০০৮ সাল থেকেই রংধনু শিশু ফোরামের সদস্য। এখন সে এই সংস্থার সভাপতি। প্ল্যান বাংলাদেশের মাধ্যমে শিশু সুরক্ষা আর অধিকারের উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে কেশব আর তার দল, নানা জায়গায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্যাম্পেইন, বাল্য বিবাহ বিরোধী র্যালি, আর সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আর এজন্য কেশব ও তার দল ‘ইউএন ইউথ কারেজ এওয়ার্ড ফর এডুকেশন’ পুরস্কার লাভ করে গত ১২ জুলাই মালালা দিবস উপলক্ষে। গর্ডন ব্রাউন তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি তোমাদের অভিনন্দন জানাই এই পুরস্কারের জন্য। প্রতিটি ছেলে-মেয়ের স্কুলে যাবার অধিকারের জন্য লড়ে যাচ্ছ তোমরা দেখে ভালো লাগছে। আমি তোমাদের যুব সমাজের রোল মডেল ও প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করতে ইচ্ছুক।’ কেশবের কোনোভাবেই জীবন মসৃণ ছিলো না। নীলফামারীর জলঢাকার কেশব রয়কে খুব অল্প বয়সেই দারিদ্র্যের কষাঘাতে পড়ালেখা ছাড়তে হয়। জীবনের তাগিদে কাজে নেমে পড়তে হয়। পরে সে-ই এগিয়ে আসে নিজের অপূর্ণতাকে অন্যভাবে পুষিয়ে নেয়ার তাগিদ থেকে। নিজে যে দুর্ভোগের শিকার হয়েছে তাতে যাতে আর কেউ শিকার না হয় সে জন্য কাজ করা শুরু করে সে। তার বাবা অজিন্দ্রা বর্মণ একজন শ্রমিক। মা রঞ্জিতা রায় গৃহিণী। সূর্যমুখীর প্রেসিডেন্ট কাঞ্চন চন্দ্র রায়ের সাথে দেখা হওয়াটা তার জীবনের এক ইতিবাচক মোড়। ২০০৭ সালের পর তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি, তার বাবা তাকে বাধ্য হয়ে স্কুলে ভর্তি করান। আর কেশব তার দলকে নিয়ে এগিয়ে যায় স্কুল থেকে শিশুদের ঝরে পড়া আর মেয়েদের অকালে বিবাহ বন্ধ করার লক্ষ্যে তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর শ্রম তাকে আজ দিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কেশবদের এই এগিয়ে আসাটাই আমাদের জন্য সুখের খবর। এরাই পারবে বাংলাদেশের অন্য রূপ দেখাতে, বিশ্বের কাছে উজ্জ্বল করতে আমাদের ভাবমূর্তি। বাল্য বিবাহ একদিকে আইন এবং সংবিধানের লংঘন, অন্যদিকে বাল্য বিবাহের বর ও কনেকে তার ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়। যদিও দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ বছর পূর্ণ এবং নারীর জন্য ১৮ বছর পূর্ণ হওয়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় মেনে চললে তা বৈধ বিবাহ বলে গণ্য হয়। বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন, ১৯২৯, অনুযায়ী কোন এক পক্ষ কর্তৃক উল্লেখিত বয়স পূর্ণ না হলে তা বাল্য বিবাহ বলে গণ্য হয় এবং উক্ত বিবাহ ব্যবস্থাপনার দায়ে ব্যবস্থাপকদের ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে। বাল্য বিবাহের উদ্বেগজনক পরিণতি যেহেতু পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর সেহেতু এটি অবশ্যই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করাসহ আপামর জনসাধারণকে এ ব্যাপারে সচেতন পূর্বক সম্পৃক্ত করতে হবে। আর নতুন আইন প্রণয়নের থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের প্রয়োগ। কারণ আমাদের দেশে আইন আছে; কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। তাই বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের উঁচুস্তর থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের; বিশেষ করে আমাদের রাষ্ট্র এবং প্রশাসনকে এ ব্যাপারে সবার আগে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।