শিশুর যখন জেদ বেশি
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৫৯
সংসার জীবনে অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা আর কষ্টের পর ঘর আলো করে আসে এক নতুন সদস্য। তার আগমন সবার মুখে ফুটিয়ে তোলে হাসি। মা, বাবা আর সন্তান মিলে অন্য এক পৃথিবী, এক অন্য জগত্। সেই জগতের মধ্যমণি থাকে সেই শিশুটি। তার যত্নআত্তি, দেখভাল করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে পরিবারের প্রতিটি ব্যক্তি। আর সেই শিশু ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, চারপাশের জগত্ ও পৃথিবী সম্পর্কে তার নিজস্ব ধ্যান-ধারণা তৈরি হয়। এই ধ্যান-ধারণা ও আচার-আচরণ আর মানসিক বিকাশ নির্ভর করে তার বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার উপর। সেই বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, পরিবার; এক কথায় বলতে গেলে বাবা-মা।
সুজন সবেমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছে। কিছুদিন আগে সে একটি বাইসাইকেল কিনেছে। আসলে কিনেছে বললে ভুল হবে। বাবার কাছে জেদ করে কিনে নিয়েছে। বাবা যতোদিন পর্যন্ত তার এই জেদ পূরণ না করেছে, সে বাড়ির কারো সাথে কথা বলা রীতিমত বন্ধ রেখেছিল। আর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যে, সাইকেল কিনে না দিলে সে কিছু খাবে না। এই পরিস্থিতিতে সুজনের বাবা তার জন্য একটি বাইসাইকেল কিনে দেন। আসলে শহরে শিশুদের সাইকেল চালানোর জায়গা নেই এবং সাইকেল চালাতে গেলে ছোট্ট সুজন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আহত হতে পারে। এই বিবেচনাতেই তার বাবা তাকে বাইসাইকেল কিনে দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। কিন্তু সন্তানের জেদের কাছে হার মানেন তিনি। সুজনের এই জেদ অবশ্য একদিনে শুরু হয়নি। সে কোনো কিছুর বাহানা করলে যদি বাবা কিংবা মা তাকে সেই জিনিসটি না দেন তাহলে সে বাড়ির মানুষের সাথে কথা বলা এমনকী খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। আর এই পরিস্থিতিতে যে তার বাবা-মা তার বাহানার জিনিসটি তার হাতে তুলে দেবেন সেটা সে জেনে গিয়েছে আরো আগেই।
একদম ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মূলত যেসব সমস্যা একটি বাচ্চার মধ্যে দেখা যায়, তার অন্যতম হচ্ছে শিশুর এই ধরনের জেদ বা একগুয়েমি। জেদ একটি মানসিক প্রক্রিয়া যেটা শিশুর মধ্যে এক ধরনের নাছোড়বান্দা মনোভাব যার ফলে সে সব কিছু নিজের মনে করে ও সে সব কিছুর উপর নিজ অধিকার খাটাতে চায়। হরেক রকম আবদার থাকে শিশুদের। সেসব আবদার পূরণ না হলে অনেক সময় তারা জেদ করে। একরোখা হয়ে ওঠে, যা শিশুটির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মা-বাবাও সাময়িক শান্তির জন্য সন্তানের জেদ মেনে নেন। এতে সে প্রশ্রয় পেয়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে মা-বাবাকে ধৈর্য ধরতে হবে। সন্তান যতই জেদ করুক, তাকে সব সময় প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। এ ব্যাপারে ‘সেভ দ্যা চিল্ড্রেন’-এর আবেদা তুল ফাতেমা বলেন, ‘জেদ প্রধানত কিছু নির্দিষ্ট জিনিস নিয়ে হয়ে থাকে। যেমন- কোনো জিনিস চাওয়া, খেতে না চাওয়া, স্কুল নিয়ে নানা ধরনের জেদ, আর আশ-পাশের মানুষের সাথে জেদ।
তিনি বলেন, কারো হাত থেকে কোনো জিনিস এনে শিশুর হাতে দেয়া যাবে না, সে তার বড় ভাই কিংবা বোনই হোক না কেন, পুতুল বা অন্য কোনো খেলনা সেটা যতই মূল্যবান বা মূল্যহীন হোক। তাকে এই মূল্যবোধে দীক্ষিত করতে হবে যে, কারো জিনিসের উপর অনুমতি ছাড়া হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
কান্নাকাটির বিনিময়ে শিশুকে কিছু দেয়া যাবে না, সেটা করা হলে শিশু কান্নাকাটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। মার্কেটে গেলে কান্নাকাটি করলে তাকে সাথে সাথে কোনো জিনিস কিনে দেয়া যাবে না, পরে যখন যেটা দরকার হবে তখন সেটা দেয়া হবে।
ছেলেবেলা থেকেই বাচ্চাদের মধ্যে একটা আমিত্ব জন্মায়, যার ফলে সে নিজেকে কেন্দ্র করে পৃথিবী দেখতে শিখে এই ধারণা থেকে তাকে বের করে আনতে হবে। তাকে বুঝতে হবে, ‘আমি সবার-সবাই আমার’।
স্কুলের ক্ষেত্রে সন্তানকে শুধু পরিপাটি করে স্কুলে পাঠালেই বাবা-মার দায়িত্ব শেষ হয় না। স্কুল এমন একটা ক্ষেত্র যেখানে শিশু সব থেকে বেশি সামাজিক আবেগীয় মূল্যবোধ শিখতে পারে। এখানে বেশ কিছু খেয়াল রাখার বিষয় আছে, শিশু স্কুলের পরিবেশের সঙ্গে কিভাবে মানিয়ে নেয়, শিক্ষকদের সাথে তার আচরণ কেমন, অন্যান্য শিশুদের সাথে তার ব্যবহার কেমন, আর কি কি ব্যাপারে সে সবার সাথে জেদ করছে এগুলো দেখতে হবে।
শিশুর জেদগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে খাবার নিয়ে জেদ। এটা বেশ ক্ষতিকর শিশুর জন্য। না খেলে শিশু অপুষ্টিতে ভোগে। এখানে শিশুর খাদ্যে বৈচিত্র্য আনাটা বেশ জরুরি। কারণ শিশুর খাবার সাধারণত স্বাদহীন হয়, তার জন্য তৈরি খিচুড়িতে মাঝে মাঝে সামান্য মসলা দিতে হয়। শিশুর খাবারের রুচি বুঝে নিয়ে তার টক নাকি মসলাদার নাকি মিষ্টি পছন্দ সেটা দেখতে হবে। রঙ দেখিয়ে বিভিন্ন খাবার বুঝাতে হবে। তাহলে তার জেদটা কমে আসবে।
সন্তান জেদ করলে শুরুতে দেখতে হবে প্রায়ই সে এটি করছে কি-না। এরপর যুক্তি দিয়ে তাকে বোঝাতে হবে। জেদি শিশুকে বোঝানোর কোনো বিকল্প নেই। হয়তো সে বুঝতেও চাইবে না, বাহানা করতেই থাকবে। তবুও ধৈর্য ধরে তাকে বোঝানোর কাজটি করে যেতে হবে। জেদ করে সে যা চাইছে তা পেয়ে গেলে এটি স্বভাবে পরিণত হবে। অনেক সময় অভিভাবকদের সময় থাকে না কিংবা বাড়িতে কোনো অতিথি এসেছে, সে সময় শিশুটি জেদ করে থাকে। পরিস্থিতি সামলাতে তাত্ক্ষণিকভাবে তার জেদ মেনে নেয়া হয়। যা করা উচিত নয়। আবার দেখা যায়, শিশুটি হয়তো জেদের কারণে চিত্কার করে কাঁদছে তখন মা-বাবার মধ্যে কেউ বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য তার আবদার মেনে নেন। এতে করে শিশু আরও প্রশ্রয় পেয়ে গেল। সে ভাববে তার দাবি যিনি পূরণ করছেন না, সে-ই আসলে দোষী। তবে কোনো অবস্থাতেই শিশুর সঙ্গে চিত্কার করে কথা বলবেন না। তাকে কখনোই শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত না করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে। মা-বাবার উচিত সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া। মজা করার সময়, গল্পের ছলে বলতে হবে কেন জেদ করা উচিত নয়, তার সামান্য জেদের কারণে অন্যের উপর কি প্রভাব পড়তে পারে অথবা তার সাথে কেউ এমন আচরণ করলে তার কেমন লাগত। আচরণের ভালো-মন্দ নিয়েও নানা ধরনের গল্প করা যেতে পারে। এতে শিশুটির আত্মোপলব্ধি হবে। নিজেই আচরণ পরিবর্তন করতে চেষ্টা করবে। সঙ্গে মা-বাবা তো আছেনই। মনে রাখতে হবে, মা-বাবা হচ্ছে সেই আয়না যেখানে শিশু নিজেকে দেখতে পায়।