স্বামী নাকি তালেবান
সুস্মিতার খুনি কে
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:৫৯
মৌলবাদী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অকুতোভয় হয়ে কলম ধরেছিলেন তিনি। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছিলো দৃঢ় বু্দ্ধিবৃত্তিক অবস্থান। ১৯৮৮ সালে ২৭ বছর বয়সে স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী জানবাজ খান নামের এক কাবুলিওয়ালাকে বিয়ে করেন তিনি। পরে পাড়ি জমান অচেনা আফগানিস্তানে। পেশায় নার্স হওয়ায় তালেবানদের চোখের আড়ালে একটি ক্লিনিকও খোলেন। ১৯৯৫ সালে তালেবানরা জানতে পারে তা। এরপর তার উপর নির্যাতন শুরু হয়। তার নামে নানা ফতোয়া জারি হয়। এরপরই কোনক্রমে একটি জিপে চড়ে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে পালিয়ে আসেন। যোগাযোগ করেন ভারতীয় দূতাবাসে। কিন্তু সেখান থেকে উল্টো তাকে তালেবানদের হাতেই তুলে দেয়া হয়। এরপর আবার তিনি পালানোর চেষ্টা করেন এবং ধরা পড়েন। কিন্তু তৃতীয়বার শ্বশুরবাড়ি থেকে সুড়ঙ্গ কেটে পালিয়ে আসার চেষ্টা করেন।
১৯৯৭ সালে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি আত্মজীবনীমূলক বই লেখেন। ‘কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ’। বইটি শুধু কলকাতায় নয়, সাড়া ফেলেছিল ভারতসহ গোটা বিশ্বে। তখনকার সময় বেস্টসেলার বইটি অবলম্বলে ‘এস্কেপ ফর্ম তালেবান’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়।
সেই গুণী লেখিকা ‘কাবুলি ওয়ালার বাঙালী বউ’ সুস্মিতা ব্যানার্জি আফগানিস্তানের পাকতিকা প্রদেশের নিজ বাড়িতে গত ৫ সেপ্টেম্বর নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। খুন হওয়ার পর প্রথমে বলা হয়, তাকে হত্যা করেছে তালেবান জঙ্গিরা। ৫ সেপ্টেম্বর রাতে লেখিকার বাড়িতে হামলা চালায় তালেবান। স্বামীসহ আত্মীয়দের বেঁধে সুস্মিতাকে বাড়ির বাইরে এনে খুন করে তারা। খুনের পর স্থানীয় একটি মাদ্রাসার সামনেই লেখিকার দেহ ফেলে রাখে। এটাই সবার জানা ছিলো। কিন্তু এই হত্যাকান্ড আচমকা নতুন মোড় নিয়েছে। সুস্মিতার খুন হওয়া নিয়ে দিন দিন রহস্যের জাল বিস্তৃত হচ্ছে।
প্রথমদিকে তালেবান জঙ্গিদের এই খুনের জন্য দায়ী করা হলেও সুস্মিতার স্বামী জানবাজ খান কাবুলে ভারতীয় দূতাবাসকে জানিয়েছেন, তালেবান জঙ্গিরা তাকে খুন করেছে কিনা, এ কথা বলতে পারবেন না। অথচ সুস্মিতার ভ্রাতৃবধূ বলেছেন, লেখিকার মৃত্যুর পর তার স্বামী জানবাজ তাদের ফোনে জানান, সুস্মিতাকে তালেবানরাই খুন করেছে। জানবাজের নতুন এই বক্তব্যে শুরু হয়েছে নতুন করে সন্দেহ। রহস্য দিনে দিনে ঘনীভূত হচ্ছে।
সুস্মিতার খুনের পেছনে যে ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছিল তাকে আরও উস্কে দিয়েছেন তার এক বান্ধবী। দাম্পত্য বিবাদে সুস্মিতা খুন হতে পারেন এমন প্রশ্ন তুলেছেন সুস্মিতার ঘনিষ্ট বান্ধবী শালিনী নস্কর। তিনি জানিয়েছেন, স্বামী জানবাজের সঙ্গে তার ভাইয়ের স্ত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। পরিবারের মতও ছিল এ ব্যাপারে। কিন্তু সুস্মিতার মত মেয়ে তা মেনে নিতে পারেননি। প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু কোনও ফল হয়নি। বরং স্বামী জানবাজের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল। শালিনী মনে করেন, আফগানিস্তানে সুস্মিতার হত্যার পেছনে বড় রহস্য রয়েছে।
তিনি বলেন, সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে সুস্মিতার সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। সেই সময় সুস্মিতা স্বামীর আচরণ সম্পর্কে প্রবল হতাশা ব্যক্ত করেছেন। খুন হবার আগের দিনই সুস্মিতার দিল্লি আসার কথা ছিল। সেই আসার পেছনে ছিল নতুন জীবন শুরু করার ইচ্ছা। দিল্লির দীপক কুমার নামে এক স্থপতির সঙ্গে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটেই সুস্মিতার আলাপ হয়েছিল। তার বাড়িতে এসেই ওঠার কথা ছিল। আগামী ২২ সেপ্টেম্বরই তারা বিয়ে করতে চেয়েছিলো। ধারণা করা হচ্ছে, ফেসবুকে সুস্মিতার নতুন প্রেমের যে খবর প্রচার হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে তার স্বামীই লোক ভাড়া করে খুন করিয়ে প্রথমে তালেবানের ওপর দোষ চাপিয়েছিলেন। তবে সুস্মিতার ভাই গোপাল ব্যানার্জির দাবি, মানুষের নজরে আসার জন্য শালিনী এসব কথা বলছেন। বোনের দাম্পত্য জীবনে কোনো সমস্যা হচ্ছিলো এমন বিষয়ে আমাদের জানা নেই।
সুস্মিতার ভাই গোপাল এই খুনের বিষয়ে কিছু তথ্য জানতে চেয়ে একটি ই-মেইল পাঠিয়েছেন আফগানিস্তানে ভারতীয় দূতাবাসে। রাষ্ট্রদূত অমর সিন্হাও এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। দূতাবাসের ওই ই-মেইলে জানানো হয়েছে, জানবাজ দূতাবাসের কর্মীদের জানিয়েছেন, সুস্মিতাকে সেই রাতে কারা খুন করেছে, সে ব্যাপারে তাঁদের কোনও ধারণা নেই। জানবাজ আরও জানান, গোপালের মোবাইল নম্বর কাছে না থাকায় তিনি সুস্মিতার মৃত্যুর খবর তাঁদের দিতে পারেননি। তবে এ দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন সুস্মিতার ভ্রাতৃবধূ দেবলীনা। তিনি বলেন, জুলাই মাসে সুস্মিতা যখন কলকাতায় এসোছিলেন তখন ওর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য গোপালের নম্বরেই ফোন করেন জানবাজ । তা হলে এখন কেন জানবাজ বলছেন ফোন নম্বর জানা নেই? দেবলীনা বলেন, এই দু’টি অসঙ্গতি ও কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে আমরা কাবুল দূতাবাসে আবারো একটি ইমেইল পাঠিয়েছি। সুস্মিতার মৃত্যু সম্পর্কে সেখানকার পুলিশ প্রশাসন কী বলছে, তা-ও জানতে চেয়েছি। সুস্মিতার দেহের ময়না তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তার পরিবারের লোকেরা।
সুস্মিতার ভাই ভারত সরকারকে লেখা এক চিঠিতে তার বোনের স্বামী জানবাজ খানকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করার আহবান জানিয়েছে। চিঠিতে সুস্মিতার ভাই গোপাল বলেন, আমরা জানবাজ ও তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি। কিন্তু তা সম্ভব হয়ে উঠছে না। তাদের ফোনও কয়েকদিন ধরে বন্ধ।
এ ব্যাপারে রাষ্ট্রদূত অমর সিনহার জবাব হলো , আফগানিস্তানে ময়নাতদন্ত তখনই হয়, যখন কোনও অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ জানা যায় না। এখানে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে, আততায়ীর গুলিতেই মৃত্যু হয়েছে সুস্মিতার। তাই ময়নাতদন্তের প্রয়োজন পড়েনি। এছাড়ো স্ত্রীর মৃত্যুর পর অন্তোষ্টিক্রিয়ার আইনগত অধিকার তার স্বামীর রয়েছে। এখন এ বিষয়ে কিছু করার নেই। তবে সুস্মিতার কোনো জিনিস ভারতে ফিরিয়ে আনা যায় কিনা আমরা সেটি দেখছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবারউদ্দিন বলেন, আমাদের প্রথমিক ধারণা হয়তো এ খুনের ঘটনায় পারিবারিক বিষয় থাকতে পারে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যের জন্য আমরা অপেক্ষা করবো। আফগানিস্তানের দূতাবাসকে এ বিষয়ে জানার জন্য জানবাজ খান ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে।