হলমার্কের তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে, অভিযুক্ত ২৫ জন
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:২০
বহুল আলোচিত হলমার্ক গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রতিবেদন নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। দীর্ঘ ১১ মাস তদন্তের পর দুদকের তদন্ত দল প্রতিবেদনটি দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের মহাপরিচালক জিয়াউদ্দিন আহমেদ-এর কাছে জমা দেন।
গতকাল রবিবার দুপুরে মহাপরিচালক জিয়াউদ্দিন আহমেদ তদন্ত প্রতিবেদনটি কমিশনের চেয়ারম্যান মো: বদিউজ্জামানের কাছে দাখিল করেছেন। এ প্রতিবেদনে হলমার্ক গ্রুপ ও সোনালী ব্যাংকের ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে আদালতে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। মামলায় নাম থাকা আট কর্মকর্তাকে বাদ দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। নতুন অভিযুক্ত হয়েছেন ৬ জন। সোনালী ব্যাংকের ১৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রভাব বিস্তারকারী প্রভাবশালীদের কোন নাম নেই এই তদন্ত প্রতিবেদনে। এছাড়া হলমার্ক কেলেঙ্কারি মামলায় সোনালী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে হলমার্ক গ্রুপকে ঋণ দেয়ার বিনিময়ে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ থাকলেও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে পর্ষদের কোন ব্যক্তির ব্যাপারে সে ধরনের কোন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি কারাগারে আটক হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদ ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারো-ক্তিমূলক জবানবন্দিতে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য ঘুষ নিয়েছেন বললেও দুদক তদন্ত টিম সে জবানবন্দি আমলে নেয়নি। অপরদিকে এ প্রতিবেদনে এজাহারভুক্ত আট আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের কাছে জমা দেয়া প্রতিবেদনে যে ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে তারা হলেন হলমার্কের এমডি মো. তানভীর মাহমুদ (কারাগারে আছেন), তার স্ত্রী ও হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম (জামিনে আছেন), তানভীরের ভায়রা ও হলমার্ক গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ, হলমার্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শহিদুল ইসলাম, স্টার স্পিনিং মিলসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তসলিম হাসান, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিয়া, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. জিয়াউর রহমান, আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, প্যারাগন গ্রুপের এমডি সাইফুল ইসলাম রাজা, নকশী নিটের এমডি মো. আবদুল মালেক ও সাভারের হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জামাল উদ্দিন সরকার, সোনালী ব্যাংক হোটেল শেরাটন বা রূপসী বাংলা শাখার সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ব্যবস্থাপক এ কে এম আজিজুর রহমান, সহকারী উপমহাব্যবস্থাপক মো. সাইফুল হাসান, নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মতিন ও সোনালী ব্যাংক ধানমণ্ডি শাখার বর্তমান জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নেসা মেরি, সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জিএম অফিসের দুই জিএম ননী গোপাল নাথ ও মীর মহিদুর রহমান (দুজনই ওএসডি), প্রধান কার্যালয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ূন কবির, ডিএমডি মাইনুল হক ও আতিকুর রহমান (দুজনই ওএসডি), দুই উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শেখ আলতাফ হোসেন (সাময়িক বরখাস্ত) ও মো. সফিজউদ্দিন আহমেদ (সাময়িক বরখাস্ত), দুই এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান (সাময়িক বরখাস্ত) ও এজাজ আহম্মেদকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে হলমার্ক গ্রুপের কর্মকর্তা ও মালিকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, হলমার্ক গ্রুপের ম্যাক্স স্পিনিং মিলস, আনোয়ারা স্পিনিং মিলস, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনাল, অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজ ও স্টার স্পিনিং মিলসের মালিকরা সবাই ভুয়া। এই কথিত মালিকরা সবাই হলমার্কের কর্মচারী। কাগজ-কলমে ছাড়া ম্যাক্স ও আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। এছাড়া তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করেছেন।
মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা আটজন হলেন সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগের সাবেক ডিজিএম ও বর্তমানে সিলেটের জিএম কার্যালয়ে কর্মরত জিএম ভগবতী মজুমদার, একই বিভাগের এজিএম মো. আবুল হাসান এবং রূপসী বাংলা হোটেল শাখার সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা (অব.) মো. ওয়াহিদুজ্জামান, সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জিএম আ ন ম মাসরুরুল হুদা সিরাজী ও সবিতা সিরাজ, ডিজিএম কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এজিএম মো. খুরশিদ আলম ও আশরাফ আলী পাটোয়ারী। তবে এ আটজনের মধ্যে জিএম আ ন ম মাসরুরুল হুদা সিরাজী ও সবিতা সিরাজ, ডিজিএম কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এজিএম মো. খুরশিদ আলম ও আশরাফ আলী পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ করা হলেও তারা কোনো দুর্নীতিতে যুক্ত ছিলেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া এজাহারে নাম নেই এমন আরও ১০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। তারা হলেন সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (অর্থায়ন) বিভাগের এজিএম মো. শওকত আলী, ভিজিল্যান্স অ্যান্ড কন্ট্রোল বিভাগের ডিজিএম এম এইচ এস আবু জাফর, বেসিক ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সোনালী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি কাজী ফখরুল ইসলাম, জিএম মো. মাহবুবুল হক ও নওশের আলী খন্দকার, অডিট অ্যান্ড ইনস্পেকশন ডিভিশন-২-এর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. একরামুল হক মণ্ডল, ইতিমধ্যে অবসরে যাওয়া ইনস্পেকশন অ্যান্ড অডিট ডিভিশন-২-এর এসইও কে ডব্লিউ শাহিদা খানম, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা বিভাগের এজিএম শামিম আখতার এবং রূপসী বাংলা শাখার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম ও কর্মকর্তা উকিল উদ্দিন।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৪ অক্টোবর হলমার্ক গ্রুপের এমডি, চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামসহ মোট ২৭ জনের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা দায়ের করে দুদক। ওই মামলায় সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক মোট ২ হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাত্ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। দুদকের সিনিয়র উপ-পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বিশেষ টিম এ মামলার তদন্ত করেন।