বঙ্গবন্ধু :সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৩১
ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময়ে বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা, জয় বাংলা।
-------------------- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা যে সম্ভব, শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রমাণ সমগ্র পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির বন্ধু ও অধিনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও মহান নেতা। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর উত্সাহ শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি চেয়েছিলেন বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সভ্যতা, সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা, সব মানুষের মানবাধিকারের স্বীকৃতির। তার সাবলীল চিন্তাধারার সঠিক মূল্যায়ন শুধু বাংলাদেশে নয় সমস্ত পৃথিবীও স্বীকার করবে- অমর্ত্য সেন।]
পদ্মার একটি শাখা নদীর নাম বাইগ্যা। প্রতি বছর কার্তিক মাসের প্রথমদিন এই নদীতে নৌকা বাইচ হয়। প্রাচীন সমৃদ্ধ জনপদ কোটালীপাড়া হয়ে দক্ষিণে চলে গেছে নদীটি। মিশেছে পাটগাতির কাছে মধুমতির সাথে। বাইগ্যা আর মধুমতির মাঝখানে গড়ে উঠেছে বহু গ্রাম। প্রাচীনকালে যা ছিলো জলাভূমি। জোয়ারের পানিতে ডুবে থাকতো পুরো এলাকা। কালে কালে নদীটি ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়, গড়ে ওঠে চর। গড়ে ওঠে জনবসতি। নদীর দুপাশেই গ্রাম। নদীর কুলকুলু ধ্বনি আর পাখ-পাখালির কলকাকলিতে দুই তীরের সবুজে শ্যামলে ছাওয়া গ্রামগুলো দেখায় ছবির মতো। এরই একটি ছায়া সুনিবিড় গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। এই টুঙ্গিপাড়াতেই জন্ম নিলেন বাঙালির মহাজাগরণের পথিকৃত্, বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, হাজার বত্সরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারিখটা ছিল ১৩২৭ বাংলা সালের ৩ চৈত্র এবং ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ মার্চ, মঙ্গলবার।
১৪৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রখ্যাত ইসলাম ধর্ম প্রচারক হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহঃ) বহু আউলিয়া দরবেশ সঙ্গে নিয়ে বাংলায় ধর্ম প্রচারে আসেন। দরবেশ শেখ আউয়াল ছিলেন হযরত বায়েজিদ বোস্তামীর (রহঃ) অন্যতম সঙ্গী । তিনি ছিলেন ইরান দেশের অধিবাসী। দরবেশ শেখ আউয়াল বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। তারই উত্তরসূরী শেখ জহিরউদ্দিন, শেখ জান মাহমুদ, শেখ বোরহান উদ্দীন, শেখ আকরাম প্রথমে কলকাতা ও পরে টুঙ্গিপাড়া এসে বসবাস শুরু করেন। দরবেশ শেখ আউয়াল এর অষ্টম উত্তর পুরুষ হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধুর বাবার নাম শেখ লুত্ফর রহমান এবং মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। বাবা-মায়ের তৃতীয় সন্তান এবং প্রথম পুত্র বলে আদর করে ‘খোকা’ ডাকা হত। বঙ্গবন্ধুর নানা শেখ আব্দুল মজিদ আকিকার সময় খোকার নাম রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই নাম রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মা সায়েরা, তোর ছেলের এমন নাম রাখলাম যে নাম জগেজাড়া খ্যাত হবে।’
ধর্মপ্রাণ দরবেশ বংশধর ধার্মিক শেখ আব্দুল মজিদের সেদিনের ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হয়নি। শৈশব থেকেই শেখ মুজিব ব্যতিক্রমী। মানুষের প্রতি তার ভালবাসা প্রকাশ পায় সেই শৈশব থেকেই। তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় অসুস্থ সহপাঠীকে নিজের ছাতাটি দিয়ে নিজে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরা, শীতার্তকে নিজের গায়ের চাদর দিয়ে খালি গায়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফেরা, নিরন্ন অভাবী মানুষদের ডেকে এনে গোলার ধান দিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কার্মকাণ্ড ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ বিরোধী স্বদেশি আদর্শে শুরু হলেও ১৯৩৮ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর গোপালগঞ্জ জনসভার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন ও সোহরাওয়ার্দীর স্নেহের পরশ তার রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় পরিবর্তন এনে দেয়। অন্যান্য দেশপ্রেমিক, প্রগতিশীল ব্রিটিশ বিরোধী মুসলমান তরুণের ন্যায় তিনিও মুসলিম লীগের হয়ে নানা সংগ্রামে অংশ নেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নবলব্ধ পাকিস্তানে যে সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষার ব্যাপারটি অগ্রাধিকার পাবে না, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আর্থিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সকল ন্যায়সঙ্গত ও স্বাভাবিক প্রত্যাশা এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক অধিকার উপেক্ষিত, নিষ্পেষিত ও লঙ্ঘিত হবে—তা বুঝতে তার দেরি হয়নি। এরই ফলে ১৯৪৮ সাল থেকেই স্বৈরাচারী অগণতান্ত্রিক শাসকবর্গের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহণ শুরু রাজনীতির নতুন অধ্যায়। সভা সমিতি, শোভাযাত্রা সংগঠনের দায়ে ১৯৪৮ এর মার্চ ও সেপ্টেম্বরে তাকে দুইবার গ্রেফতার করা হয়।
১৯৬৬ সালে ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরের বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন, যা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ।
১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু এবং ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়।
১৯৬৯ এর ৫ জানুয়ারি ৬ দফাসহ ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ অন্যদের মুক্তিদানে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। প্রায় ১০ লাখ ছাত্র-জনতার ঐ সংবর্ধনা সমাবেশ থেকে সকলের পক্ষে ঐ সভার সভাপতি, ডাকসু’র ভিপি তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। প্রিয় মুজিব হয়ে যান বাংলা ও বাঙালির চিরকালের আত্মার আত্মীয় ‘বঙ্গবন্ধু’।
১৯৭১ এর ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের দোলায় বাঙালির হাজার বছরের প্রতীক্ষার অবসান-বঙ্গবন্ধুর চির অবিস্মরণীয় উচ্চারণ—
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’
বঙ্গবন্ধু এই উচ্চারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা। একাত্তরের ২৫শে মার্চের রাতে পাকিস্তানি হায়েনাদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে মধ্যরাতের পর ইংরেজি দিনপঞ্জি অনুযায়ী ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। রাত ১-১০ মিনিটে পাকিস্তানি হায়েনারা তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। শুরু হয় সর্বাত্মক গণযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ। মাত্র নয় মাসে ৩০ লাখ শহীদ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়। বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রামের সোনালি ফসল।
১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায়। বাংলা তখন বিরান শ্মশানভূমি। ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে তিনি সবাইকে আহ্বান জানালেন পুনর্গঠনের। ঝাঁপিয়ে পড়লেন দেশ গড়ার ব্রতে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ, বিশৃঙ্খল পরিবেশ, বিভক্ত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল, শক্তিমত্তায় লিপ্ত পূর্ণ পরাশক্তি, এরকম বৈরী পরিবেশের মাঝেও দেশ গড়ায় দৃঢ় প্রত্যয়ে অগ্রসর হলেন। রাজনৈতিক মেধা প্রজ্ঞা দিয়ে আভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলে নিজের অবস্থান ও বন্ধুত্বের লক্ষ্যে ভারত, সোভিয়েতসহ বন্ধুপ্রতীম দেশসমূহ সফর করেন। যোগ দেন জোট নিরপেক্ষ আলজিয়ার্স সম্মেলনে, মুসলিম দেশসমূহের সংগঠন ওআইসি সম্মেলনে-তুলে ধরেন নিজেদের অবস্থান। কারো প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ না করে সকলের সাথে মৈত্রী বন্ধন স্থাপনের মাধ্যমে প্রগতিশীল ধারার দেশগঠনের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বাংলায় বক্তৃতা প্রদান করে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রদান, বাঙালির সংগ্রামী চেতনা, ত্যাগ, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় শান্তিময় বিশ্ব গড়ার দৃপ্ত আহ্বান জানান।
অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে আন্তর্জাতিক বলয়ে বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় করে সকলের সার্বিক সহযোগিতায় পরিকল্পিত গণতন্ত্র ভিত্তিক ঐক্যমূলক সমাজতান্ত্রিক ধারায় দেশ গঠনের নতুন কর্মপন্থা নিয়ে যে মুহূর্তে তিনি অগ্রসরমান ঠিক সেই মুহূর্তে একাত্তরের পরাজিত শক্তির দোসর ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ষড়যন্ত্রে বিপথগামী কিছু সৈনিক ও মধ্যম পর্যায়ের অফিসার ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-কে সপরিবারে হত্যা করে। যা শুধু বাংলায় নয় বরং সমগ্র বিশ্বের জঘন্যতম নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড হিসাবে বিবেচিত। বাঙালি জাতির হাজার বছরের স্বপ্নসাধ মুক্তি-সুখী, দেশ, জাতি গঠন প্রক্রিয়া স্তিমিত হয়ে যায়। ১৬ই আগস্ট লেঃ কর্ণেল হামিদের নেতৃত্বে ১২ জন বঙ্গবন্ধুর লাশবাহী কফিন হেলিকপ্টারে করে টুঙ্গিপাড়া নিয়ে আসে। টুঙ্গিপাড়াসহ চারপার্শ্বে ছিল কার্ফুসহ কড়া নিরাপত্তা। কাউকে কাছে আসতে দেয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধুর দুই মামা শ্বশুর শেখ মনসুরুল হক ও শেখ মনজুরুল হক কফিন বুঝে নেন। বঙ্গবন্ধুর মেয়ে ও ছোট চাচী লাশ দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর গ্রামের বাড়ির ইমাম মৌলভী আবদুল হালিম বঙ্গবন্ধুর গোসল ও জানাজা পড়ান। মোঃ ইলিয়াছ হোসেন (বর্তমান টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার মেয়র) হানিফ শেখ, নিজার মোল্যা, আইয়ুব আলী তার ছেলেসহ ২৪/২৫ জন লোক নিয়ে দাফন-কাফন সম্পন্ন করে। এই ইমাম সাহেবকেই বঙ্গবন্ধু তার সাথে শেষ সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন-‘আমার জানাজা আপনাকেই পড়াতে হবে।’ বঙ্গবন্ধুর লাশ দাফনের পর উঠানে বরই গাছের কাটাভরা ডাল চাপানো হল। হেলিকপ্টার চলে যাবার আগে বাইগ্যার নদীর পানিতে রক্ত ধুয়ে টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে ফেলে যায়। বঙ্গবন্ধুর কবরের পাশে বাবা-মা’র মাজার, মাথার কাছে একটা কামিনী ফুলির গাছ, পায়ের কাছে একটা নারকেল গাছ—এই ছিল একমাত্র সঙ্গী। মধুমতি থেকে ভেসে আসা ভেজা বাতাস। রাস্তা দিয়ে কেউ হেঁটে যাওয়ার সময় কবরের দিকে একবার থমকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে দোয়া দরুদ পড়তো। কোটালীপাড়ার শেখ সিকান্দার (পাগলা সিকেন্দার) দুই বছর পর্যন্ত এখানে ছিলেন। চিত্কার করে বন্ধবন্ধুর কথা বলতেন, বঙ্গবন্ধুর ছবি বুকে নিয়ে থাকতেন।
বিবিসি টেলিভিশনের দূরপ্রাচ্য সংবাদদাতা ব্রায়ান ব্যরন ১৯৭৫ এর আগস্টের শেষ সপ্তাহে তার সংবাদ বিবরণীতে বলেন, শেখ মুজিব সরকারিভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং জনসাধারণের হূদয়ে উচ্চতম আসনে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হবেন। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। এটা যখন ঘটবে তখন নিঃসন্দেহে তার বুলেট বিক্ষত বাসগৃহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারকচিহ্ন এবং তার কবরস্থান পুণ্যতীর্থে পরিণত হবে। ব্রায়ান’র ভবিষ্যদ্বাণী যথার্থভাবেই শতভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
লেখক :সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ,
সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ, গোপালগঞ্জ