মাছ খেতে চলুন চান্দার বিল
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৩৩
মুকসুদপুর উপজেলার বিল চান্দা বাংলাদেশে যত বিল, বাঁওড়, হাওর বা জলাভূমি আছে তার মধ্যে অন্যতম। আলোচিত এই বিল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, ৬টি মৌজা নিয়ে বিল চান্দার অবস্থান থাকলেও বিল চান্দাকে ঘিরে রয়েছে ২৭টি গ্রাম। নানা কিংবদন্তি ছড়িয়ে রয়েছে এই বিল চান্দায়, রয়েছে অনেক ঐতিহ্য। চান্দার বিলের নামকরণেও রয়েছে নানা কল্প কাহিনী।
কবে থেকে চান্দার বিল শুরু তা জানা না গেলেও ধারণা করা হয় এ এলাকাটিও এক সময় সুন্দরবন ছিল। বড় বড় নদীও ছিল এ বনের ভেতর দিয়ে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে হোক বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বনাঞ্চল ধসে বিলের সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেক মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। কারণ চান্দার মাটিতে প্রচুর পিট কয়লা সেই ইঙ্গিত বহন করে। নামকরণের যত কল্পকাহিনী রয়েছে তার মধ্যে গ্রহণযোগ্য হলো যে, প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত ব্যবসায়ী চাঁদ সওদাগর বাণিজ্য শেষে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় তার মালপত্র বোঝাই ৭টি জাহাজ নিমজ্জিত হওয়ার পর এই স্থানটি চান্দা নামকরণ হয়। পরে নদী শুকিয়ে গেলেও রয়ে যায় জলাশয়। যা আজ চান্দার বিল নামে পরিচিত।
চান্দার বিল এলাকায় কয়েক বছর আগেও যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা। কয়েকটি গ্রামে এখনো নৌকার মাধ্যম ছাড়া চলা যায় না। সাধারণত যোগাযোগবিহীন এলাকা অনুন্নত থাকায় এখানকার জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান এখনো নিচু। কেউ কেউ এজন্য এ এলাকাকে অভিশপ্ত এলাকা বলে অভিহিত করে। তবে এ বিলে রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। এই প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে প্রায় ১০ হাজার পরিবার।
এই বিলে রয়েছে নানা প্রজাতির মাছ, পাখি, শাপলা, পিট কয়লা, কচুরিপানা, শেওলা, পদ্মফুল, কলমীশাক, হিনচা শাক, জলজ লজ্জাবতী, নল খাগড়া ইত্যাদি।
মাছঃ চান্দার বিলের প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে মাছ অন্যতম। এখানে প্রায় দেড়শ প্রজাতির মাছ এখনো বিদ্যমান। প্রতিদিন রাজধানী ঢাকার মোট মাছ চাহিদার একটা বড় অংশ বিল চান্দা থেকে সরবরাহ করা হয়। এই মাছ ধরা, বিক্রি করা, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে কর্মসংস্থান করে জীবিকা নির্বাহ করে প্রায় ৮ হাজার পরিবার। এখন প্রতিদিনই ধরা পড়ে কৈ, শিং, শোল, গজার, দেশি সরপুটি, রুই কাতলা, মাগুর, টাকি, পুটি, বাইন, টেংরা, মলাঢেলাসহ অসংখ্য মাছ।
পিট কয়লাঃ চান্দার বিলে স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক সম্পদ হলো পিট কয়লা। নিম্নাঞ্চলের এখনো প্রায় ১ হাজার পরিবারের একমাত্র আয় পিট কয়লা আহরণ। বিল এলাকায় প্রায় সব পরিবারই সারা বছর রান্নাবান্নার কাজ করে পিট কয়লা দিয়ে। ক্রেতারা এই কয়লা বিশেষভাবে প্রস্তুত চুলায় রান্না করে। এই চুলায় পরিবেশ দূষণ অর্থাত্ ধোঁয়া হয় না বলে অনেকে পিট কয়লা ব্যবহার পছন্দ করে।
শাপলা/শালুকঃ বর্ষাকালীন সবজি হিসেবে শাপলা বহুল ব্যবহূত। বিল চান্দার আশপাশের গ্রামবাসীরা বর্ষা মৌসুমে শাপলা সবজি হিসেবে খায়। ওই এলাকা ছাড়া সমগ্র মুকসুদপুরসহ গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুরের প্রসিদ্ধ হাট-বাজারে শাপলা সবজি হিসাবে বিক্রি হয়। বিল চান্দা এলাকার ৩ শতাধিক পরিবার শাপলা বিক্রির সাথে জড়িত। আশ্বিন-কার্তিক বা অক্টোবর নভেম্বর মাসে বিলের পানি কমে যায় তখন অপেক্ষাকৃত কম বয়েসী শাপলার গোড়ায় যে গোটা অংশ তুলে খাওয়া হয় একে বলে শালুক। শালুক একটি সুস্বাদু খাবার। শালুক সিদ্ধ করে হালকা লবণ দিয়ে খেলে মুখে সুগন্ধ লেগে থাকে অনেকক্ষণ। অনেক সময় অভাব অনটন বা বন্যার সময় মানুষ শালুক সিদ্ধ করে খায়। ইদানিং অনেক ভোজন বিলাসী শালুক পছন্দ করেন। শালুক দিয়ে বিভিন্ন মজাদার রেসিপি তৈরি করা যায়। শামুকঃ প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জমির উর্বরতা রক্ষায় জলজ প্রাণী শামুক এখন শুধু অতিথি পাখির খাবার নয়। চান্দার বিলের বর্ষা মৌসুমে শামুক এখন অর্থকরী ফসল, চান্দার বিল এলাকায় বড় বড় সাইজের শামুক খুলনা এলাকায় চিংড়ি ঘেরে বিক্রি হচ্ছে।
পদ্মফুলঃ পদ্মফুলের বাজার বিশ্বব্যাপী। পদ্মফুল থেকে মৌমাছির সংগৃহীত মধু-পদ্মমধুর উপকারিতা অনেক। পদ্মফুলেরও অনেক ভেষজ গুণ রয়েছে। তবে যত্নের অভাবে পদ্মফুল বিলুপ্ত প্রায়।
শাকঃ বিলের পানিতে হিচনা শাক ও কলমি শাক খুবই জনপ্রিয়। এসব শাক পুষ্টিকর ও ঔষধি গুণসমৃদ্ধ। বিলে প্রচুর পরিমাণ শাক জন্মে। এলাকার বাসিন্দারা কলমি শাক গোখাদ্য হিসাবে ব্যবহার করলেও কলমি শাক সবজি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সুস্বাদু অথচ হালকা তেতো স্বাদযুক্ত হেলেঞ্চা শাক সবজি হিসাবে ব্যবহূত হয়।
ধানঃ চান্দার বিল এলাকার অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিগুলোতে বোনা হয় গভীর পানিতে জন্মানোর উপযোগী বিভিন্ন প্রজাতির ধান। এর মধ্যে দিঘা ও শাইল জাতের ধানই বেশি। দিঘার আরো কয়েকটি প্রজাতি রয়েছে। দিঘা ধানের ঢেঁকি ছাটা চাল এখন অমূল্য সম্পদ। এটা গ্রামেও অপেক্ষাকৃত বেশি দামে বিক্রি হয়। এছাড়া রয়েছে বেশি পানিতে জন্মায় শালি ধান। এ ধান থেকে ভাত ছাড়াও সুস্বাদু মুড়ি, চিড়া তৈরি হয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক গোপালগঞ্জ