স্মৃতির অন্তরালে কৃতীপুরুষ

মথুরানাথ বসু

বিভিন্ন সমাজে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে, বিভিন্ন জনপদে বিভিন্ন সময়ে এক একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে, যারা সমাজকে বা জনগোষ্ঠীকে পরিশীলিত করেন, উন্নত করেন, আলোকিত করেন। এঁরা সমাজের গৌরব, ঐতিহ্য, গর্বের ধন। যে জনগোষ্ঠী এদের স্মৃতি লালন করে না-তারা ঐতিহ্য সচেতন নয়, অকৃতজ্ঞ। আজ এমন একজন কৃতী পুরুষের কথা বলব যিনি একটি পশ্চাত্পদ ক্ষুদ্র জনপদে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে এবং পশ্চাত্পদতা নিরসনের লক্ষ্যে নিজের মেধা, পরিশ্রম, ত্যাগ, তিতিক্ষা নিয়োজিত করেছিলেন-নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এখন বিস্মৃতির অন্তরালে। ঐ অঞ্চলের একটি বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে সংক্ষেপণের (abbreviation) আড়ালে লুকিয়ে আছেন। হয়তো কোনদিন কোন গবেষক ঐ নামের অক্ষরের তাত্পর্য খুঁজতে গিয়ে বিস্মৃতির সাথে যুদ্ধ করবেন। তাই স্মৃতি থেকে কিছু কথা লেখার প্রেরণা পাচ্ছি। ছোট্ট শহরটির নাম গোপালগঞ্জ। একটি নতুন জেলা শহর। আগে ছিল মহকুমা সদর। গোপালগঞ্জের একটি প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এস.এম. মডেল হাই স্কুল। এখন সরকারি স্কুল। এস এবং এম এই দু’টি সংক্ষেপণের আড়ালে লুকিয়ে আছেন দুই মহত্ ব্যক্তি-সীতানাথ এবং মথুরানাথ। সাধারণ মানুষের স্মৃতি থেকে দু’জনেই হারিয়ে গেছেন, যদিও তাদের দানের স্মৃতি বহন করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে স্কুল ও কলেজের দু’টি ভবন। এই দুই জ্ঞানতাপস দানশীল ব্যক্তি কি করে একটি স্কুলের নামের দু’টি অক্ষরের মধ্যে লুকিয়ে গেলেন, তা জানতে হলে স্মৃতির পাতা ঘাটতে হবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কয়েকজন বাঙালি গ্র্যাজুয়েটের একজন ছিলেন সুসাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ চট্টোপাধ্যায়, আরেকজনের নাম ছিল মথুরানাথ বসু। তিনি রেভারেন্ড সেন্ট মথুরানাথ বসু নামে সম্মানিত হয়েছিলেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল যশোর জেলার চাঁদপুর গ্রামে। গ্র্যাজুয়েট হবার পর সমাজসেবা তথা শিক্ষা প্রসারের ব্রত গ্রহণ করলেন। বেছে নিলেন অনগ্রসর, লেখাপড়ায় পশ্চাত্পদ গোপালগঞ্জ। মধুমতি নদীর তীরে ছোট্ট শহর। নদীর তীরে একটি ঘরে থাকতেন। তাঁর প্রধান ব্রত ছিল নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে এই এলাকার লোকদের উদ্ধার করা। গত শতাব্দীর আগের শতাব্দীর কথা। তিনি যে বিদ্যালয় খুলেছিলেন, তা মিশন স্কুল নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর দান ও অবদান এই স্কুলটির নামকরণ হল মথুরানাথ ইন্সটিটিউশন-সাধারণ লোক এটাকে তখনো মিশন স্কুল বলেই ডাকতো। বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই মথুরানাথ ইন্সটিটিউশনের ছাত্র ছিলেন। তত্কালে এই স্কুলটিই ছিল এতদঞ্চলের প্রাচীন এবং নামকরা বিদ্যাপীঠ। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৫০ সালে মথুরানাথ ইন্সটিটিউশনকে কলেজে রূপান্তর করা হলো। মথুরানাথের স্মৃতিঘেরা স্কুল ঘরটিতেই কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলো-কিন্তু কলেজের নাম রাখা হলো ‘কায়েদে আযম মেমোরিয়াল কলেজই-যদিও জিন্নাহ্ সাহেবের কোন মেমোরিই ঐ স্থানে ছিল না। মথুরানাথের স্মৃতি ঢাকা পড়ে গেলো নতুন নামের আগ্রাসনে। পরিবর্তন এখানেই থেমে থাকেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর কলেজটির নাম আবার পরিবর্তিত হল। স্থানীয় জনগণের প্রবল দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কলেজটির নতুন নামকরণ হলো বঙ্গবন্ধু কলেজ। বর্তমানে পরিবর্ধিত হয়ে ‘বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ নাম ধারণ করেছে। এই নামকরণে অবশ্য একটি যুক্তি ছিল। মথুরানাথ ইন্সটিটিউশনের সর্বকালের ছাত্রদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও জনগণ নন্দিত ব্যক্তিত্ব। এভাবে নিজ কীর্তি থেকে নির্বাসিত হলেও মথুরানাথকে অন্যত্র পুনর্বাসন করা হয়েছিল। গোপালগঞ্জের আরেকটি প্রাচীন স্কুল ছিল সীতানাথ একাডেমী—১৯১৯ সালে বাবু সীতানাথের দানে তার স্মৃতি রক্ষার্থে স্থাপিত হয়েছিল। ১৯৫০ সালে মথুরানাথ ইন্সটিটিউশন এবং সীতানাথ একাডেমীকে একত্রীকরণ করে সীতানাথ একাডেমী ভবনে স্থাপন করা হয়। একত্রীকৃত বিদ্যালয়ের নতুন নামকরণ করা হয় সীতানাথ মথুরানাথ মডেল হাই স্কুল। পরবর্তীকালে এটি সরকারি স্কুলে রূপান্তরিত হলেও এস.এম. মডেল হাইস্কুল নামেই এর পরিচিতি থেকে যায়। এভাবেই এক বিরাট জ্ঞানতাপস, সমাজহিতৈষী মথুরানাথের বিশাল অস্তিত্ব ছোট্ট ‘এম’ অক্ষরটির মাঝে লুকিয়ে রক্ষা পেল। ‘এম’ অক্ষরের ডোর ভিউটির মধ্য দিয়ে তাকালে যে বিরাট কীর্তিমান মহাপুরুষের দর্শন মিলবে-তার পূর্ণ স্মৃতিচারণ করার যোগ্যতা আমার নেই। তাঁর কর্মকাল ছিল বিগত ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে। তাঁর দর্শন আমি পাইনি। তবে মথুরাবাবুর বিশিষ্ট ভাবশিষ্য রেভারেন্ড জিতেন্দ লাল সরকারের কাছে কিছু কথা শুনেছিলাম। সেই শ্রুতি থেকেই মথুরানাথের স্মৃতি তর্পণের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। রেভারেন্ড জিতেন্দ লালের জন্ম ২২ জানুয়ারি ১৮৯২ খৃস্টাব্দ এবং মৃত্যু ১৯ আগস্ট ১৯৬৯। গোপালগঞ্জেই তিনি সমাহিত। তিনি ছিলেন সুশিক্ষিত স্কুল শিক্ষক, নিবেদিত সমাজ সেবক এবং একজন সত্যপ্রিয় নিষ্ঠাবান মানুষ। মথুরানাথের স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি মাঝে মাঝে ‘মেমোরিয়াল লেকচার’ এর আয়োজন করতেন। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সুযোগ পেলেই তিনি মথুরানাথের জীবনী আলোচনা করতেন। সেসব বক্তৃতা, আলোচনা থেকেই আমার তথ্য চয়ন। মথুরাবাবু নিরক্ষরতা দূর করতে গিয়ে প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। গোপালগঞ্জের মুসলমান এবং হিন্দু সমাজ উভয়েই তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করলো। লেখাপড়া শিখলে ‘নাছারা’ হয়ে যাবে-এমন ফতোয়াও বর্ষিত হতে লাগলো। এর মধ্যেও তিনি যত্ন সহকারে পরম স্নেহে লেখাপড়া শেখানোর কাজে ব্রতী রইলেন। নিজ অর্থে শ্লেট, পেন্সিল, বইপত্র জোগান দিতেন যথাসম্ভব। একবার আদমশুমারীর সময় উপযুক্ত লোকজন স্থানীয়ভাবে পাওয়া যাচ্ছিল না। এমনকি দোয়াত-কালির সংকটও হলো। মথুরাবাবুর ছাত্রগণ অনেক পরিশ্রম করে সমস্যাটির মোকাবিলা করলেন। একবার প্রতিক্রিয়াশীল একটি দল মথুরা বাবুকে হত্যা করার চক্রান্ত করলো। তখন রাস্তাঘাট পাকা ছিল না-রাস্তায় আলোও ছিল না। শেষরাতের দিকে এক ব্যক্তি তরবারী (মতান্তরে ছুরি) হাতে মথুরাবাবুর বাড়ির সামনে গিয়ে হাজির হলো। নিঃশব্দ আঁধার। মথুরাবাবু দরজা খোলার সাথে সাথেই তাকে হত্যা করা হবে। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ব্যক্তিটির কানে ঘরের ভিতর থেকে কি যেন আওয়াজ ভেসে আসছিল। লোকটি পরম বিস্ময়ে কান পেতে শুনতে পেলো কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে প্রার্থনার আওয়াজ। নিথর রাতে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। না, প্রাণভিক্ষার প্রার্থনা নয়। মথুরানাথ প্রার্থনা করছেন ঈশ্বরের কাছে অর্বাচীন লোকদের জন্য। তাদের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করছেন। জ্ঞানহীনদের জন্য জ্ঞান চাচ্ছেন। দরিদ্রদের জন্য সচ্ছলতা চাচ্ছেন। পাপীদের জন্য পাপমোচন চাচ্ছেন। অবুঝদের জন্য বুদ্ধি ভিক্ষা করছেন। একপর্যায়ে মথুরাবাবু প্রার্থনা করলেন, “যে অবুঝ হত্যা করতে এসেছে-সে বুঝতে পারছে না-তাকে ক্ষমা করে দিও।” আগন্তুক এ প্রার্থনা শোনার পর অস্থির হয়ে উঠলো। সজোরে দরজা ধাক্কা দিল। নিজ হাতে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন মথুরানাথ। তাকে দেখেই আগন্তুকের মনে ভাবান্তর এলো। তাঁর অস্ত্রটি সে লুটিয়ে দিল মহাত্মার চরণতলে। মথুরাবাবু তাকে সান্ত্বনা দিলেন, উপদেশ দিলেন, সাহায্য করলেন। ক্ষমার দ্বারা জয় করে নিলেন এই অবোধ মানুষটিকে। শতাধিক বছর আগের আরেকটি ঘটনা। প্রমত্ত মধুমতির পানির তোড়ে দ্রুত ভেঙ্গে যেতে লাগলো গোপালগঞ্জের ছোট্ট জনপদটি। পাড় ভাঙ্গছে আর জনপদ পিছিয়ে যাচ্ছে। এমনি করে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে নদী যখন মূল জনপদে মথুরানাথের ঘরের কাছাকাছি চলে আসে, তখন লোকজন আতঙ্কিত হয়ে তার কাছে সমবেত হয় এবং পরামর্শ কামনা করেন। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিলেন এবং বিকাল বেলায় প্রমত্ত নদীর পানিতে নামলেন। অশান্ত ঢেউগুলো দুষ্টু ছেলের মত তার সমস্ত শরীরে আছড়ে পড়তে লাগলো। তিনি শান্তভাবে প্রার্থনা করতে লাগলেন। নদীর তীরে অনেক লোকের ভিড় জমেছিল। তারা আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে ছিল পানির তোড়ে মথুরানাথ না ভেসে যান। সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। ঢেউগুলো বুঝি ক্লান্ত হয়ে আসছিল। কিন্তু ক্লান্ত হচ্ছিলেন না মথুরানাথ। অনেক সময় পর ঢেউয়ের উন্মত্ততা হ্রাস পেলো। ধীরপদে উঠে আসলেন মথুরানাথ। সবাইকে ঘরে ফিরে যাবার পরামর্শ দিয়ে নিজেও ভিজা কাপড়ে চলে গেলেন বাড়িতে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো-অন্ধকার গাঢ় হতে লাগলো। শান্ত জনপদ ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন থেকে নদী আর ভাঙ্গেনি। ঢেউগুলো শান্ত হয়ে গেলো। জনপদটি নিরাপদ হলো। সেই থেকে মথুরানাথ বসু পরিচিত হলেন সাধু মথুরানাথ নামে। মথুরানাথ বাবুর পরিশ্রম ও ত্যাগে গড়ে উঠেছিল আজকের গোপালগঞ্জ শহর, এতদঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আধুনিকায়ন পদ্ধতি। প্রথম বাঙালি গ্র্যাজুয়েটদের একজন হয়ে ব্রিটিশ রাজকীয় আনুকূল্যে এই খ্রিস্টান মনীষী নিজের ব্যক্তি ভাগ্য গড়ে তুলতে পারতেন-জাতীয় পর্যায়ে নাম লেখাতে পারতেন। কিন্তু তিনি রাজকীয় আনুকূল্য গ্রহণ করেননি। বিখ্যাত হবার পরিবর্তে অখ্যাত থাকতে চেয়েছেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে অপরিচিত এক লোকালয়ে নীরবে শিক্ষা বিস্তার এবং মানব কল্যাণে ব্রতী হয়েছিলেন। মথুরানাথ ইন্সটিটিউশন বা আজকের বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পিছনেই রয়েছে তাঁর সমাধি কিন্তু অবহেলিত। অনেকেই জানে না এটি কার সমাধি। মনে পড়ে সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের সমাধীতে উত্কীর্ণ তার নিজেরই লেখা সেই অমর পংতিমালা (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত অনুদিত): গরিব গোরে দ্বীপ জ্বেলো না ফুল দিওনা কেউ ভুলে; শ্যামা পোকার না পোড়ে পাখ দাগা না পায় বুলবুলে।