কুড়িগ্রামে বড় তিন দলেই একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী

মহাজোট সরকারের সময় শেষ হয়ে আসার সাথে সাথে কুড়িগ্রাম জেলার ৪টি আসনে শুরু হয়েছে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। জেলার সর্বত্রই শোভা পাচ্ছে শুভেচ্ছা জানিয়ে ব্যানার-ফেষ্টুন-বিলবোর্ড। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়, চায়ের দোকান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দেয়াল ছেয়ে গেছে রং-বেরং-এর পোস্টারে। ইউনিয়নে ইউনিয়নে চলছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সভা-সমাবেশ। রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক ভিত তৃণমূল পর্যন্ত মজবুত করতে নেতারা এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তবে প্রতিটি আসনেই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক নেতাই মনোনয়ন প্রত্যাশী। তারা সাধারণ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় ও যোগাযোগ রাখছেন। উপর মহলে লবিং শুরু করে দিয়েছেন নিজের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে। আর এই নির্বাচনী লড়াইকে কেন্দ্র করে দলগুলোতে বাড়ছে গ্রুপিং। আশংকা বাড়ছে দলের ভিতর অসন্তোষ আর সংঘাতের। কুড়িগ্রামকে জাতীয় পার্টির দুর্গ মনে করা হলেও গত নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-২ ও কুড়িগ্রাম-৪ আসন দু’টি ছিনিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ। বাকি আসন দু’টি বরাবরের মতো থেকে যায় জাতীয় পার্টির। কুড়িগ্রাম-১ :নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলা নিয়ে কুড়িগ্রাম-১ আসন গঠিত। গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (মহাজোট) সমর্থিত প্রার্থী একেএম মোস্তাফিজুর রহমান এমপি নির্বাচিত হন। তিনি এবারও প্রার্থী হতে চাইছেন। তবে মহাজোট ছাড়া দলগতভাবে আলাদা নির্বাচন হলে বর্তমানে জাতীয় পার্টির এমপির অবস্থা আশানুরুপ হবে না বলে স্থানীয়দের ধারণা। গত নির্বাচনে চারদলীয় জোটের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুর রহমান রানা এবারও বিএনপির প্রার্থী। তবে জামায়াতের জেলা আমির আজিজুর রহমান স্বপন এ আসনে মনোনয়ন চাইতে পারেন। এ আসনে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন শিল্পপতি গোলাম মোস্তফা। তিনি এবারও মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। এখানে জাতীয় পার্টি এবং বিএনপির একাধিক প্রার্থী না থাকলেও আওয়ামী লীগে রয়েছে একাধিক প্রার্থী। এরা হলেন: মজিবর রহমান বীরবল, নাগেশ্বরী উপজেলা সভাপতি অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক প্রধানী এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আসলাম হোসেন সওদাগর। কুড়িগ্রাম-২ :কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী ও রাজারহাট উপজেলা নিয়ে এ আসন গঠিত। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাফর আলী বিপুল ভোটের ব্যবধানে এমপি নির্বাচিত হন। জাতীয় পাটির দুর্গ খ্যাত সদরের এ আসনটিতে গত নির্বাচনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচিত হবার পর তা ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোঃ জাফর আলী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির গোলাম হাবিব দুলালকে পরাজিত করে। আওয়ামী লীগ থেকে এ আসনে এবারো মনোনয়ন প্রত্যাশী বর্তমান এমপি জাফর আলী। অন্যান্য দলের হেভিওয়েট প্রার্থী না থাকায় তার অবস্থান অনেকটাই সুদৃঢ়। তবে ভবিষ্যতে এ দলটি থেকে ২/৪ জনের মনোনয়ন চাওয়ার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার কথা শোনা যাচ্ছে লোক মুখে। কুড়িগ্রাম সদর আসনে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী। দলের জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠে তত্পরতা চালাচ্ছেন। মনোনয়ন পাওয়ার আশায় কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু, সাবেক পৌর মেয়র আবু বকর সিদ্দিক ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি লুত্ফর রহমান। তবে দলের একটি অংশ চাচ্ছে কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক রুহুল কবির রিজভী এই আসনে প্রার্থী হোক। এদিকে দীর্ঘ চার বছর ধরে কুড়িগ্রাম জেলা জাতীয় পার্টি চলছে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। সেই আহ্বায়ক কমিটিতে পরিবর্তন আনা হলেও চাঙ্গা হয়নি দলীয় কার্যক্রম। তবে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পেতে গণসংযোগ চালাচ্ছেন সাবেক বিমান কর্মকর্তা ও সাবেক জেলা আহ্বায়ক মেজর (অবঃ) আব্দুস সালাম ও কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক তাজুল ইসলাম চৌধুরী। কুড়িগ্রাম-৩ : এই আসনে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থী জাপা নেতা সাবেক মন্ত্রী একেএম মাঈদুল ইসলাম এখানে এমপি নির্বাচিত হন। ব্যক্তিগত ইমেজের কারণে তিনি এবারও প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে। জেলা বিএনপি’র সভাপতি তাসভীর-উল ইসলাম এখানে একক প্রার্থী। তবে কেন্দ্রীয় যুব দলের আব্দুল খালেকও এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। অধ্যক্ষ নাসিমা বানু বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেও মহাজোট গঠনের কারণে পরে তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফুলু সরকার দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। আগামী সংসদ নির্বাচনে এ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইছেন সাবেক সংসদ সদস্য আমজাদ হোসেন তালুুকদার, অধ্যক্ষ নাসিমা বানু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতি শিউলি রায়, সাধারণ সম্পাদক গোলাম হোসেন মন্টু, সৌমেন্দ্র প্রসাদ পান্ডে গবা প্রমুখ। বর্তমান সংসদ সদস্য একেএম মাঈদুল ইসলাম ছাড়াও জাপা থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের খায়রুল হক, চলচ্চিত্র পরিচালক বাদল খন্দকার, সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম হাবীব দুলাল ও আনিছুর রহমান রতন। এছাড়া প্রাইম গ্রুপের কর্ণধার ডা. আক্কাছ আলী সরকার যে কোন দল থেকে মনোনয়ন পেতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। কুড়িগ্রাম-৪ : গত নির্বাচনে এখানে আ’লীগের এমপি জাকির হোসেন এমপি নির্বাচিত হন। তিনি ছাড়াও দলটি থেকে হাজী মুরাদ লতিফ, রৌমারী যাদুরচর ইউপি চেয়ারম্যান মজিবর রহমান বঙ্গবাসী, চিলমারী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ফজলুল হক মনি, অধ্যাপক আজিজুর রহমান, রাজীবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান আকবর হোসেন হিরো, রাজীবপুর উপজেলা আ’লীগ সভাপতি আব্দুল হাই সরকার এবার মনোনয়ন চাইতে পারেন। এ আসনে গত নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী থাকলেও এবার জামায়াতের প্রার্থী দেখতে রাজি নন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন-রাজীবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান, রৌমারী বিএনপি সভাপতি আজিজুর রহমান এবং বেসরকারি সংস্থা রৌমারীর আরএসডিএ’র প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইমান আলী ইমন। তিনি বিএনপিতে যোগদান করে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি গোলাম হাবিব দুলাল আ’লীগের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। জাতীয় পার্টি থেকে আরো যারা মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে তারা হলেন রাজীবপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ইউনুছ আলী ও এড. হুমায়ুন কবির।