ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম বন্দর!
প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:০৮
সিঙ্গাপুর থেকে একটি কন্টেইনারবাহী জাহাজ চট্টগ্রামে আসতে সময় লাগে সাত দিন। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ওই কন্টেইনার খালাস হতে সময় ব্যয় হয় ১৩ দিন। শুধু সময়ের বিচারে নয়, নানা ধরনের চার্জ এবং জটিলতার কারণে চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল বন্দর হয়ে উঠছে। যা এই বন্দর ব্যবহারকারীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এদিকে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অযাচিত হস্তক্ষেপ চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যয়বহুল বন্দরে পরিণত করেছে। তাদের মতে, স্থায়ী পরামর্শক ও সুপারিশকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও সংসদীয় কমিটির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর বন্দরের কর্মকাণ্ড নির্ভর করে। বন্দরের সকল প্রকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেপথ্যে কমিটির ‘হাত’ রয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার সংসদ সদস্য এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি এমএ লতিফ সমপ্রতি চেম্বার ভবনে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সংসদীয় কমিটির প্রতি বন্দরের ব্যাপারে অযাচিত হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। বন্দর ব্যয়বহুল হওয়ার জন্য তিনি কমিটিকেই দায়ী করেছেন।
বৈঠকে একই কথা বলেন দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ। শুধু তাই নয়, সংসদীয় কমিটির কেউ কেউ বন্দরের ব্যবসার সাথেও জড়িয়ে পড়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহ-সভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী বলেন, বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতে বর্তমানে অনেক সময় লাগে। এতে করে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও এর প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। সামপ্রতিক সময়ে সংসদীয় কমিটির বিভিন্ন সুপারিশের ভিত্তিতে কাজ দেয়ার ফলে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবসায়ীদের কাছে শুধু ব্যয়বহুল হচ্ছে তা নয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্বও হারাচ্ছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের অনুমোদিত লাইসেন্সধারী ৫৬টি স্টিভিডোরিং প্রতিষ্ঠান থাকলেও মাত্র ১২টি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দরের কার্গো ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। এতে করে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের ব্যয় বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ১২টি প্রতিষ্ঠানের সাথে সংসদীয় কমিটির কারো কারো যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ মাস্টার স্টিভিডোরিং (বিএমএসএ) এর সভাপতি মো. ইব্রাহিম অভিযোগ করেন, প্রতিযোগিতায় সকল প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেয়ার কারণে বন্দরে হ্যান্ডলিং চার্জ বেড়ে গেছে। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে গতবার যেখানে বন্দরের ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে সেখানে এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি টাকা। অথচ কাজটি এর এক-তৃতীয়াংশ ব্যয়ে করা সম্ভব। বিএমএসএ’র নেতা সরওয়ার উদ্দিন সাগরের আশংকা, ১২টি প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ বছরে ১৫০ কোটি টাকা লোপাট হবে।
এদিকে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার ৫ বছর পরও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটির বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে অত্যাধুনিক ‘নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)’ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যাচ্ছে না। নির্মাণ কাজের শুরুতে বলা হয়েছে, এটি বেসরকারি অপারেটর দ্বারা পরিচালিত হবে এবং নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পূর্বেই অপারেটর নিয়োগের কাজ সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় এর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর এর পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। সকল প্রক্রিয়া শেষে বিশ্বের নামকরা ৪টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাকযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী স্থানীয় এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় দরপত্রে কিছু শর্ত শিথিল করে। এতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানসহ আরো ২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাকযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে পূর্বে অংশগ্রহণকারী ৪টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দরের টেন্ডার সংক্রান্ত মূল্যায়ন কমিটির নিকট পরবর্তীতে অন্তর্ভুক্ত ২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মূল্যায়ন কমিটি পরে অন্তর্ভুক্ত ২টি প্রতিষ্ঠানকে বাতিল করার সুপারিশ করে। তখন ওই দু’টি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে মামলা করলে পুরো প্রক্রিয়া ঝুলে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম বন্দরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় দুটি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে এনসিটি চালু করা যায়নি। এর ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষকে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাবদ প্রতিবছর বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
সূত্র মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের ছোট-বড় সকল ধরনের প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রেও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। যে কারণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী কন্টেইনার টার্মিনাল (কেসিটি) নির্মাণের জন্য গত ৬/৭ বছর ধরে চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে।
এসব বিষয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য শামসুল হক চৌধুরী বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষকে আমরা শুধু সুপারিশ দেই। তা গ্রহণ করা না করার দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের।