আমাদের জেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ভারতবর্ষের ইতিহাসে নাটোর একটি বিশেষ স্থানের নাম। পাঠান-মোঘল-ইংরেজ এমনকি, পাকিস্তানি দুঃশাসনে যুগে যুগে শোষণ বঞ্চনা আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নাটোরের মানুষ কিছুটা হলেও অবদান রেখেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফার সমর্থনে আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নাটোরবাসীর অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মত। নাটোর রাজবাড়ি বাংলার সুবেদার মুর্শিদ কুলী খানের শাসনামলে (১৭০১-১৭২৭) বরেন্দ ী ব্রাহ্মণ রঘুনন্দন তার ছোট ভাই রামজীবনের নামে নাটোরাঞ্চলে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা রামজীবন রায় নাটোর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। ১৭১০ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামজীবন রায় ছাইভাঙ্গা বিলে মাটি ভরাট করে তার রাজধানী স্থাপন করেন। কালক্রমে মন্দির, প্রাসাদ, দীঘি, উদ্যান ও মনোরম অট্টালিকা নির্মিত হলে নাটোর সুসজ্জিত নগরীতে পরিণত হয়। সুবেদার মুর্শিদ কুলী খানের সুপারিশে মোঘল সম্রাট অলমগীরের নিকট হতে রামজীবন ২২খানা খেলাত এবং রাজা বাহাদুর উপাধী লাভ করেন। ১৭৩০ সালে রামজীবনের মৃত্যু হয়। তার কোন পুত্রসন্তান ছিল না। দত্তক পুত্র রামকান্তের সাথে বগুড়ার আদমদীঘি থানার ছাতিয়ান গ্রামের আত্মারাম চৌধুরীর কন্যা ভবানীর বিয়ে হয়। একমাত্র কন্যা তারা সুন্দরীকে রেখে ১৭৫৩ সালে রামকান্ত পরলোকগমন করেন। নবাব আলীবর্দী খাঁ বিধবা রানীভবানীর ওপর জমিদারি পরিচালনার ভার অর্পণ করেন। ১৭৮২ সালে ক্যাপ্টেন রেনেল এর ম্যাপ অনুযায়ী রানী ভবানীর জমিদারির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৯৯৯ বর্গমাইল। বাংলার ১৩ চাকলার মধ্যে রানী ভবানীর জমিদারি ছিল ৮ চাকলা বিস্তৃত। এই বিশাল জমিদারির বাত্সরিক আয় ছিল দেড় কোটি টাকার অধিক। বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলাব্যাপী ছিল তার রাজত্ব। এছাড়া ময়মনসিংহ জেলার পুখুরিয়া পরগণা এবং ঢাকা জেলার রানীবাড়ী অঞ্চলটিও তার জমিদারির অন্তর্গত ছিল। বৃটিশ রাজত্বের প্রথম দিকে জেলাগুলির কোন ভৌগোলিক সীমারেখা ছিল না। জমিদারির নাম ও তার বিস্তৃতিকেই জেলা হিসেবে গণ্য করা হতো। নাটোরের রাজারা এই বিশাল জমিদারি পরিচালনা করতেন নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়। নবাবী আমলে দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিচারের ক্ষমতা তাদের ছিল। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তাদের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী এবং জেলখানা ছিল। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিল্লির সম্রাটের এক সনদবলে বাংলা বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। ফলে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পায় কোম্পানি। দিল্লির সম্রাট ও বাংলার নবাব কোম্পানির বৃত্তিভোগী হয়ে অলস সময় কাটাতে থাকেন। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য ইংরেজরা ১৭৬৯ সালে প্রতিটি জেলায় একজন করে সুপারভাইজার নিয়োগ করেন। ইংরেজ বাউটন রাউস ১৭৬৯ সালের ১৯ শে ডিসেম্বর নাটোরের প্রথম সুপারভাইজার নিযুক্ত হন। ঐ সময়ই নাটোর পায় জেলা সদরের মর্যাদা। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয় ১৭৯৩ সাল থেকে। বাংলায় তখন শুরু হয়ে গেছে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। নাটোরে কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়। বহু গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়ে। মুর্শিদাবাদের ইংরেজ রেসিডেন্টের কাছে ১৭৭০ সালের ১০ই মে বাউটন রাউসের লেখা এক পত্রে দুর্ভিক্ষের বিবরণ পাওয়া যায়। ১৭৭১ সালে সুপারভাইজার নাম বদল করে কালেক্টর করা হয়। তাকে দেয়া হয় বিচার ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব। ১৭৮১ সালে কালেক্টরকে দেয়া হয় ম্যাজিস্ট্রেট পদ। ১৭৯৩ সালে ক্ষমতা পৃথক করে সৃষ্টি করা হয় জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট পদ। ১৭৯৪ সালে নাটোরে ৪ হাজার ৪৪২ টাকা ৮ আনা ব্যয়ে আদালত ভবন ও ৪ হাজার ৭৭৮ টাকা ব্যয়ে জেলখানা নির্মাণ করা হয়। ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন সামরিক স্থপতি জেমস্ পার্ল। এসবই হয় রানী ভবানীর রাজত্বকালে। ১৮০২ সালে তিনি মারা গেলে তার দত্তক পুত্র রামকৃঞ্চ রাজা হন। তিনি ছিলেন বিষয়বিমুখ। তার সময়ে নাটোর জমিদারিতে চরম বিশৃংখলা দেখা দেয়। রাজ্যে অরাজকতা বাড়তে থাকে। এমতাবস্থায় ইংরেজ সরকার ১৭৯৫ সালে রাজশাহী জেলার পুলিশি ব্যবস্থা তার হাত থেকে কেড়ে নেয়।১৮২১ সালে রাজশাহী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হয়। পদ্মা নদীর পানি নারদ নদ দিয়ে প্রবেশ করে। প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ গ্রাম-জনপদ, ফসলের মাঠ। পানি নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন স্থান দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ থাকে। নদের পানিতে শহরের পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ে। ইংরেজ শাসকরা সেজন্য জেলা সদর নাটোর হতে অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করে। মি.প্রিংগল ১৮২২ সালের ২৩শে এপ্রিল জেলা সদর হিসাবে পদ্মা নদীর তীরবর্তী রামপুর-বোয়ালিয়ার নাম উল্লেখ করে প্রস্তাবনা পেশ করেন। ১৮২৫ সালে নাটোর থেকে জেলা সদর রামপুর-বোয়ালিয়াতে স্থানান্তরিত হয়। জেলা সদর স্থানান্তরের পর ইংরেজ সরকার মহকুমা প্রশাসনের পরিকাঠামো তৈরি করে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী মহকুমা হিসাবে নাটোরের পদাবনতি ঘটে। ১৯৮৪ সালে নাটোর পুনরায় জেলা সদরের মর্যাদা লাভ করে।