আমার কথা
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:১৯
যে কাজটি করে আমি তৃপ্তি অনুভব করি তা হলো লেখালেখি— সেই সঙ্গে বইপড়া। পড়া এবং লেখালেখির প্রতি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন আমার পিতা এ দেশের প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী। তিনি প্রচুর বই পড়তেন আর আমাকে পড়ার জন্য উত্সাহিত করতেন। যখন দু’-একটি ছড়া বা গল্প লিখতে শুরু করেছি তখনো তিনি বলতেন, আগে অ্যাকাডেমিক শিক্ষা শেষ করো, প্রচুর বইপত্র পড়ে নাও, তারপর লেখালেখিতে হাত দিও। লেখালেখি করে পাঠকদের কাছে যতোটুকু গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছি, তার জন্য আমি আমার আব্বার কাছে ঋণী। সে সময়কার ঢাকা জেলাধীন বিক্রমপুরের ধাইদা গ্রামে ১৯৫৩ সালের ১২ জুন আমার জন্ম। ১৯৫৬ সালে আব্বা গেণ্ডারিয়ায় বাড়ি কেনার পর আমরা ঢাকায় চলে আসি। এখনো সেখানেই বসবাস করছি।
ষাটের দশকে আব্বা দৈনিক আজাদের শিশুপাতা ‘মুকুরের মহফিল’ পরিচালনা করতেন। আজাদ কার্যালয় থেকে ব্যাগ ভর্তি করে গল্প-কবিতা আর ছড়া বাসায় নিয়ে আসতেন। গভীর রাত পর্যন্ত তিনি সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন আর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ছাপার উপযোগী করে তুলতেন। যে লেখাগুলো ছাপার উপযুক্ত নয় বলে তার কাছে মনে হতো সেগুলো তিনি আমার হাতে তুলে দিয়ে বলতেন ‘এ লেখাটি পড়ে তুমি নতুন করে লিখবে। আমি অফিস থেকে এসে দেখবো।’ এভাবে অন্যের লেখা পড়ে নতুন করে লিখতে লিখতে নিজের ভেতর আত্মবিশ্বাস অঙ্কুরিত হয়। আর নিজেই ছড়া আর গল্প লিখতে শুরু করি। একটা কিছু লিখে যখন বিপুল-উত্সাহ নিয়ে আব্বাকে দেখাতে যেতাম তখন তিনি বলতেন, ‘ওটা রেখে যাও। আমি পরে পড়ে তোমাকে জানাবো। তবে আগে স্কুলের পড়া শেষ করো। বই পড়ো— অনেক বই। তারপর নিজে লিখতে চেষ্টা করো।’ আব্বার এসব কথা শুনে তখন খুব অভিমান হতো। এখন বুঝি, তিনি কী চেয়েছিলেন এবং কেমন করে লেখালেখির ভুবনে আমার শিকড় গেঁড়ে রেখে গেছেন।
সাধারণত গল্প লিখতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তবে সর্বপ্রথম ছাপা হয়েছিলো ‘রামবাবু মোক্তার’ নামে একটি ছড়া। ১৯৬৩ সালে ‘জুনিয়র রেডক্রস’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো ওটা। আর পথম গল্প ছাপা হয় ১৯৬৫ সালে আমাদের স্কুল ম্যাগাজিনে, আমি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র।
স্কুল জীবন থেকেই আমার লেখা গল্প ও ছড়া সে সময়কার দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার শিশুপাতাগুলোতে নিয়মিত প্রকাশিত হতো। ১৯৬৭ সালে ‘কচি ও কাঁচা’ মাসিক পত্রিকায় ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নামে একটি গল্প প্রথম ছাপা হয়। আর কচি কাঁচার আসরে ছাপা হওয়া প্রথম গল্পটির নাম ‘স্লোগান মানে মন্থর সঙ্গীত’। এটি ছাপা হয় ১৯৬৯-এর আগস্ট মাসে। সেই থেকে পত্র-পত্রিকার শিশুপাতাগুলোতে লিখে যাচ্ছি। আর অবশ্যই লিখছি একটা দায়িত্ববোধ থেকে। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের হাতে সহজবোধ্য এবং নির্মল সাহিত্য তুলে দেয়ার ব্রত নিয়ে।
এ পর্যন্ত প্রায় তিনশোরও বেশি গল্প লিখেছি। ছড়া লিখেছি বেশকিছু। ছড়ার বই বের হয়েছে দু’টি। তার ভেতর একটি নির্বাচিত ছড়ার বই। মোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২০টি। এর ভেতর বিশেষ করে বলা যায় ‘ভাষার কথা লেখার কথা’, বাতিঘরের বুড়ো’, ‘নিঝুমগড় ভয়ঙ্কর’, ‘পোড়োবাড়ি রহস্য’, ‘অন্তু ছিল দুষ্টু ছেলে’, ‘অন্যরকম বুবাই’, ‘মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে’, ‘বিজয়ের ছবি’ বইগুলোর কথা। অনূদিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘মিশন উইথ মাউন্টব্যাটেন’ ‘উইজার্ড অব ওজ’ ‘লা-মিজারেবল’ ‘কোম্প্যানি অব ওম্যান’ ও ‘ব্ল্যাকহোল’।
পেছনের জীবনের কথা মনে পড়লে নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে হয়। কারণ আমাদের বাড়িতে আমি এমন সব স্বনামধন্য ব্যক্তিকে দেখেছি, যাঁদের সৃজনশীলতায় পুষ্ট হয়ে আমাদের শিল্প-সাহিত্য অঙ্গন আজকের অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এঁদের মধ্যে মনে পড়ে লোকসঙ্গীত সম্রাট আব্বাসউদ্দীন, কবি গোলাম মোস্তফা, কবি ফররুখ আহমদ, কবি বন্দে আলী মিয়া, কবি জসীমউদদীন, কবি আহসান হাবীব, হাবিবুর রহমান, রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই), অধ্যাপক নূরুল মোমেন, সাহিত্যিক সত্যেন সেন আর শিল্পী কাজী আবুল কাশেমের কথা। প্রতি বুধবার এই প্রাতঃস্মরণীয় প্রতিভাধররা আমাদের বাসায় এসে সাহিত্য সভা করতেন। আমরা সেসব দেখে এবং শুনে গড়ে উঠেছি। সমৃদ্ধ হয়েছি— এ কথা আজ গর্বভরে স্বীকার করছি।
আমার সমসাময়িক লেখক বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই এখন আর লেখালেখি করেন না অথবা মৃত্যু তাদের কেড়ে নিয়েছে। যারা এখনও লিখে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে আছেন আলী ইমাম, হাসান হাফিজ, ফারুক নওয়াজ, সুজন বড়ুয়া, মসউদ-উস-শহীদ, ফারুক মাহমুদ, তপঙ্কর চক্রবর্তী, ফরিদুর রেজা সাগর, ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ, খন্দকার মাহমুদুল হাসান প্রমুখ। পরে এসেছেন অনেক বন্ধু যারা চমত্কার লিখে যাচ্ছেন। সবার সঙ্গে মিলেমিশে আমাদের শিশুসাহিত্য অঙ্গনকে যেনো আরো সমৃদ্ধ করতে পারি। উল্লেখ্য, আমি গল্পে ‘মিনা মিডিয়া এওয়ার্ড’ পেয়েছি ২০০৮ সালে।