চাই বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট

রিয়াদ হোসেন

 

গত কয়েক বছর ধরেই অত্যধিক বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও বড় করে ধার্য করতে হচ্ছে। কিন্তু বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, ওই লক্ষ্য অর্জন করা যাচ্ছে না। ফলে বছরের শেষ দিকে এসে বাজেটের আকার সংশোধন কিংবা কাটছাঁট করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৭২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২ লাখ ৯৬ হাজার ২১০ কোটি টাকাসহ মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৪৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। তবে সরকারের জন্য অস্বস্তি তৈরি করেছে রাজস্ব আদায়। চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে ২ লাখ ৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকার রাজস্ব। অর্থাত্ আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে রয়েছে ৫০ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। অর্থবছরের বাদবাকি সময়েও আদায়ে বড় উল্লম্ফন না হলে চলতি অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রা ও আদায়ে বিশাল ব্যবধানের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এনবিআর। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সে বিবেচনায় গত ১৯ বছরে এবারই সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হতে যাচ্ছে। বিশাল রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই শঙ্কার কথা জানিয়ে আসছিলেন অর্থনীতিবিদরা। তবে রাজস্ব কম আদায়ের পেছনে এনবিআরের সক্ষমতার অভাব, কিছু খাতে কর অব্যাহতি দেওয়াসহ আরো কিছু কারণও দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। 

এমন পরিস্থিতিতে আগামী জুনে ঘোষণা হতে যাওয়া পরবর্তী অর্থবছরেও বিশাল বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা নিতে যাচ্ছে সরকার। বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে যাচ্ছে প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ কোটি টাকা। আর রাজস্বের আকার ধরা হতে পারে প্রায় পৌনে চার লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের রাজস্বের আকার হতে পারে সোয়া তিন লাখ কোটি টাকার মতো। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) একটি খসড়া প্রস্তাব ইতোমধ্যে তৈরি করেছে পরিকল্পনা কমিশন। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ছাড়া এবার আগামী অর্থবছরের এডিপির আকার হবে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে পরিবহন খাতে। চলতি অর্থবছরের মূল এডিপি ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। সে তুলনায় নতুন অর্থবছরের এডিপির আকার বাড়ছে ১৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। যদিও পরে বরাদ্দ কমিয়ে সংশোধিত এডিপি ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা ধরলে নতুন এডিপির আকার হতে পারে ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি।

অর্থনীতিবিদরা বরাবরই বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট ঘোষণার তাগিদ দিয়ে আসছেন। আয় ও ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকলে প্রতিবারই ঘোষিত বাজেট ও বাস্তবায়নের মধ্যে অনেক ব্যবধান থাকবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকলে সরকারের বাজেট ও রাজস্ব কাঠামো নিয়ে জনমনে আস্থার ঘাটতি দেখা দিতে পারে।