আগামী দশম সংসদ নির্বাচন

ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নিয়ে বিপাকে পড়বে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার বেড়েছে এক কোটিরও বেশি। আর কেন্দ্র বাড়ছে ৯ হাজারের মতো। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সেই তুলনায় বাড়েনি। বরং কোন কোন বাহিনীর সদস্য কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগে থেকে প্রস্তুতি না নিলে অপ্রতুল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ সম্ভাব্য প্রায় ১১ হাজার কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে খোদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই শংকিত। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রেগুলোতে সাধারণ কেন্দ্রের তুলনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্রধারী নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। ওই সব ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অন্তত চারজন অস্ত্রধারী সদস্য মোতায়েনের সুপারিশ করবে নির্বাচন কমিশন। ইসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র ধরা হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজারের মতো। যা গতবছরের তুলনায় ৯ হাজার বেশি। আর মোট ভোট কেন্দ্রের ২৫ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র থাকে। সেই হিসাবে ১১ হাজারের মতো ভোট কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কেন্দ্রগুলোতে কমপক্ষে ৪ জন অস্ত্রধারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করতে হবে। এর মধ্যে তিনজন পুলিশ ও একজন অস্ত্রধারী আনসার সদস্য। পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার ইত্তেফাককে বলেন, পুলিশের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য পুলিশ প্রস্তুত। এর আগেও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে পুলিশ সদস্যরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছেন। এক্ষেত্রে সহযোগী বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনী সহযোগিতা করলে অবশ্যই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব। সর্বশেষ গত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে আরপিও সংশোধন করে তা বাদ দেয়া হয়। যে কারণে আগামী নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইতিমধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিপাকে পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ভোট-ব্যালট বাক্স ছিনতাই হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দলীয় প্রভাবে অসহায় হয়ে পড়ে প্রশাসনসহ নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা। এ জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা আবশ্যক। তবে বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. সাখাওয়াত হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ভোট কেন্দ্রের তুলনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অনেক কম। বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দিয়ে নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আসলেই কঠিন। সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। ইসি সূত্র জানায়, এবার ভোট কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছে কমিশন। ইতিমধ্যে জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের ভোট কেন্দ্র স্থাপনে কমিশনের পক্ষ থেকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সারাদেশের সম্ভাব্য ভোট কেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়ে তৃণমূলে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ এর ৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সম্ভাব্য ভোট কেন্দ্রের তালিকা প্রণয়নের জন্য নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভোট কেন্দ্র স্থাপনের নীতিমালা অনুমোদিত হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী প্রাকৃতিক কোনো কারণে আগের ভোটকেন্দ্র বিলুপ্ত না হলে ১৯৯১ সাল থেকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে যেসব কেন্দ্র ব্যবহার করা হয়েছে তা বহাল রাখা হবে। পাশাপাশি ভোটার বৃদ্ধির কারণে আলোচনার ভিত্তিতে নতুন ভোট কেন্দ্র নির্ধারণ করা হবে। এবার ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২২টি নীতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। এরমধ্যে আগের ভোটকেন্দ্র বহাল রাখা, আলোচনার ভিত্তিতে নতুন ভোট কেন্দ্র নির্ধারণ, রাজনীতি কিংবা নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে প্রতিষ্ঠানে ভোট কেন্দ্র স্থাপন না করা, পাবলিক বিল্ডিংয়ে ভোট কেন্দ্র স্থাপন অন্যতম। এতে আরো বলা হয়েছে দুই হাজার পাঁচশ ভোটারের জন্য একটি ভোট কেন্দ্র করা যাবে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে কম ভোটার নিয়েও কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে। আগামী নির্বাচনে ভোটার, ভোট কেন্দ্র ও ভোটকক্ষ বাড়লেও তেমন বাড়েনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা তেমনটা বাড়েনি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোটার বেড়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ২৬ জন। ভোট কেন্দ্র বাড়ছে ৮ হাজার ৭৫৮টি ও ভোটকক্ষ বাড়ছে ৪৪ হাজার ১০৭টি। দশম সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৯ কোটি ২১ লাখ ৯৮ হাজার ২৯ জন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২১টি ও ভোটকক্ষের সংখ্যা ২ লাখ ২১ হাজার ৩৮৪টি। আর নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র ছিল ৩৫ হাজার ২৬৩টি ও ভোটকক্ষ ১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৭টি। সেই হিসেবে গত পাঁচ বছরে পুলিশ বেড়েছে ৩০ হাজারের মতো। বর্তমানে পুলিশের সদস্য দেড় লাখের কিছু কম। তার মধ্যে এক লাখ ৬ হাজারই কনস্টেবল। আর বিজিবি সদস্য কমেছে ৯ হাজারের মতো। র্যাব ও আনসার আগে যা ছিল তাই আছে। বরং অনেকে অবসরে চলে যাওয়ায় বেশ কিছু সদস্য কমে গেছে। গত নির্বাচনের আগে বিজিবি ছিল ৫৩ হাজারের মতো। আর এখন দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজারে। ফলে নির্বাচনের সময় বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন আরো কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে একজন অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্যের নেতৃত্বে অস্ত্রসহ একজন অঙ্গীভূত আনসার (পিসি), অস্ত্র বা লাঠিসহ আরেকজন অঙ্গীভূত আনসার, এর বাইরে লাঠিসহ ১০ জন অঙ্গীভূত আনসার (নারী ও পুরুষ) ও একজন গ্রাম পুলিশ দায়িত্ব পালন করেছেন। আর মেট্রোপলিটন এলাকায় অস্ত্রধারী তিনজন পুলিশের নেতৃত্বে একই সংখ্যক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেছে। এর বাইরে স্টাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে সেনাবাহিনী, র্যাব, তত্কালীন বিডিআর, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতেও পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্য ছিল। আর এবার ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত আরো দুইজন অস্ত্রধারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখতে সুপারিশ করবে নির্বাচন কমিশন।