জয়নুল গ্যালারিতে রাজীব কুমার সাহার শিল্প প্রদর্শনী

মাটির রস

বৃহত্ বাংলায় পোড়ামাটির কাজ যেভাবে পাওয়া যায় ততটা পাথর ও দারুশিল্পের নয়। কারণ, এখানকার আবহাওয়ায় কাঠ যেমন বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না, তেমনি পলি অববাহিকায় পাথরের থেকে মাটি সহজলভ্য। বর্তমান সময়ে এসেও এই ধারার তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। তার ফলে আধুনিকতায় ত্রিমাত্রিক যেসমস্ত কাজ দেখার সুযোগ পাই আমরা, সেসবের চৌদ্দ আনার মাধ্যমই মাটি। রাজীব কুমার সাহা ভূমি সন্তান এবং মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের মধ্যে একজন। যারা এই কসমেটিকস সময়ে বাজারমূল্যহীনতায়ও টেরাকোটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা থামিয়ে নেই। বর্তমান এবং প্রথাগততার মধ্যে তিনি অনেকের মতোই সংযোগ সাঁকো। ‘ট্রাডিশন টু মডার্ন’ বা প্রথাগত থেকে আধুনিক এই শিরোনামে জয়নুল গ্যালারি-২-তে শুরু হয়েছে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীর শিরোনাম দেখে শিল্পকর্মগুলো দেখলে কিছুটা দ্বিমত তৈরি হয় আমাদের কাছে। কারণ প্রথাগত থেকে আধুনিক পর্বে আসার জন্য শিল্পকর্মের যে স্টাইলগত বিবর্তন আছে, রাজীবের কাজে সেসব পরিলক্ষিত হয় না। পাহাড়পুর মা কান্তজীর মন্দিরের যে স্টোরিওটাইপ, ঐতিহ্য হিসেবে রাজীব এই স্টাইলটাকে নিয়েছেন। ব্রহ্মা ( আর্দেনওয়ার), অর্নামেন্ট বক্স (আর্দেনওয়ার), টেরাকোটা-১ এবং ২ এই কাজগুলোতে সনাতনি রীতি এবং বিষয়বস্তুতে মিল রয়েছে। ট্রিটমেন্টও অনেকটা একই। সবগুলোই বিস্কুট ফায়ারিং। ব্রহ্মা কাজটিতে মন্দিরগাত্রের কম্পোজিশন ফলো করা হয়েছে। অলঙ্কার প্রধান। ‘অর্নামেন্ট বক্স’ কাজে নকশা হচ্ছে ফ্লোরাল। টেরাকোটা-১ এই রিলিফ ওয়ার্কটিতে পূজা-পার্বণের আবহ আছে। কলাগাছ, দেবী ও তাকে ঘিরে নৃত্য এইসব জ্যামিতিক ছকে সাজানো। কাজটির ট্রিটমেন্ট ততটা ভালো হয়নি। কোথাও কোথাও ভেঙে গেছে। টেরাকোটা-২। আর্দেনওয়ারের এই কাজটি দেখলে কান্তজীর মন্দিরের প্যানেলগুলোর কথা মনে পড়ে যাবে। ক্যারেক্টারগুলোকে নেওয়া হয়েছে পৌরাণিক অধ্যায় থেকে আর রেখাগুলোও ব্যবহূত হয়েছে কান্তজীর মন্দিরের মতোই। ঐতিহ্য বোঝাতে ঐতিহ্যেরই হুবহু উপস্থাপন না করে কেবল সারফেসে অ্যাটমোসফেয়ার সৃষ্টি করেও এটা বোঝানো যায়। রাজীবের কাজে সে ঝোঁকটা আমরা পাই না। টেরাকোটা এবং আর্দেনওয়ার ট্রিটমেন্টের অন্যান্য কাজে রাজীব বিষয়বস্তু হিসেবে নিয়েছেন রাখাল গরুর যাত্রা, ঢেঁকি বাড়া এবং ফুল পাখির সমন্বয়ে রিলিফ। বিস্কুট ফায়ারিংয়ের ফলে কাজগুলোতে ততটা গভীরতা তৈরি হয়নি—অন্তত কালার ভ্যলিউমের কথা চিন্তা করলে। ‘ওয়েটিং ফর মি’ এই কাজ অত্যন্ত বাস্তবধর্মী এবং বর্ণনামূলক। ছোট একটা টি-টেবিলের ওপর মগ, পিঠা এবং রুমালের উপস্থিতি জানিয়ে দিচ্ছে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ আমেজ। আর্দেনওয়ারের ভাসগুলোও ঐতিহ্য থেকে ততটা সরে দাঁড়ায়নি। রাজীবের দ্বিতীয় পর্বের কাজগুলোই আধুনিকতা পর্বের। এ পর্বের কাজগুলো কোথাও পুরো মাত্রায় বিমূর্ত হয়ে যায়নি। আধা বিমূর্ত হলেও কোথাও বিষয়বস্তু পুরো মাত্রায় ঝাপসা হয়ে নেই। ‘নেচার’ এই কাজে বানরের কম্পোজিশন চমত্কার। উপস্থাপনের ধরনটাও ভিন্ন। একটা সিলিন্ডার বা পাইপের ফর্মকে ডিফর্ম করেই এটা বানানো। কালার ট্রিটমেন্ট বেইজও দৃষ্টিনন্দন। রাকু ট্রিটমেন্টে তৈরি—ফ্যামেলি, কাপল-১ এবং ২, ফসিল অব লাইফ-১ এবং ২। কাজের বিষয়বস্তু সাধারণ হলেও এর উপস্থাপনা আধুনিক। মাছ, নারী মুখাবয়ব, পাখি পেঁচার কম্পোজিশন অত্যন্ত সিম্পল কিন্তু প্রতীকায়িত এই উপস্থাপনে এবং বিষয়বস্তুর ভেতরকার স্পেইসের ব্যবহার দৃষ্টিকে কিছুটা হলেও অবসর দিচ্ছে। কম্পোজিশন-১ এবং ২-এর ট্রিটমেন্ট স্টোনওয়ারের। অর্গানিক ফর্মকে জ্যামিতিক গড়ন এবং কম্পোজিশন জটিলতামুক্ত। ফর্মগুলোর ভেতরকার গড়ন দেখে আমরা বুঝতে পারি যে, এই বিন্যাসই কাজগুলোর জন্যে যথার্থ। কাজ দুটিতে সমকালীন আভিজাত্য যেমন রয়েছে তেমনি নন্দনতত্ত্বের দিক থেকে অপরাপর কাজগুলো থেকে অনেক বেশি ভ্যলিউম এবং ডাইমেনশনাল। কালার ট্রিটমেন্টও চমত্কার। ‘ফ্রিডম’ শিরোনামে বাংলাদেশের পতাকার ফর্মের এই কম্পোজিশনের কাজটি পূর্বেই কোনো একটি প্রদর্শনীতে আমরা দেখেছি। বিষয়বস্তুর অ্যামপাসাইজে এ ধরনের প্রদর্শনের পুনরাবৃত্তি হতে পারে বৈকি! শিল্পকর্মের বাইরে কিছুটা তৈজসপত্রের কাজ প্রদর্শিত হয়েছে। কফিসেট, ফ্রুটসেট সেসবের মধ্যে অন্যতম। জয়নুল গ্যালারি-২-এ ১৬ তারিখ শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত।