ময়ূর সিংহাসন
একজন দেশপ্রেমিকের দুঃখগাথা
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৭:৩১
দেশপ্রেম ও রাজনীতি—শব্দ দুটির মাঝে একটি সম্পর্ক বিদ্যমান। তা হলো একজন ভালো রাজনীতিবিদ হতে হলে মনের মাঝে অবশ্যই দেশপ্রেম থাকতে হবে। কিন্তু দেশপ্রেমিক হতে হলে যে শুধু রাজনীতিবিদই হতে হবে তা নয়। রাজনীতি ও ক্ষমতার বাইরে যে বৃহত্ জনগোষ্ঠীর বসবাস তাদের মধ্যেও রয়েছে দেশপ্রেমের প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা। এ সকল প্রান্তিক দেশপ্রেমিকদের খবর রাখার বা তাদের সম্মান জানানোর অভ্যাস এখনো আমাদের মাঝে গড়ে ওঠেনি। আজও নানাভাবে তারা নিগৃহীত হচ্ছে নীরবে নিভৃতে। এমনই এক নিগৃহীত দেশপ্রেমিকের কাহিনি নিয়ে রচিত হয়েছে ‘ময়ূর সিংহাসন’ নাটকের পটভূমি।
নাটকটির পটভূমি রচিত হয়েছে আমাদের এই ভূখণ্ডের বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রদায়িক হয়রানি ছিল এই সময়ের একটি নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। খাঁটি দেশপ্রেমিক হওয়া সত্ত্বেও অনেক সংখ্যালঘু দেশপ্রেমিকের ওপর বর্ষিত হয় সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। এমনই এক দেশপ্রেমিক মফস্বলের নাট্যাভিনেতা দীলিপ দাসকে নিয়েই ময়ূর সিংহাসন নাটকের মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। যে কিনা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও দেশ বিভাগের পরে স্বদেশ ছেড়ে যাননি এবং বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নাটক করে যাচ্ছেন।
নাটকের কাহিনিতে দেখা যায় যে, মফস্বলে প্রতিবছর একটি নাটকই হয়, আর তা হলো ‘শাহ্জাহান’ নাটকটি। এই নাটকে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন দীলিপ দাস। কিন্তু নাটক করতে গিয়ে অধিকাংশ সময়েই পড়তে হয় নায়িকা সংকটে। নায়িকা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মফস্বলের বারবতািদের ধরে আনা হয় অভিনয় করানোর জন্য। এদেরকে নিয়ে তখন শুরু হয় নানারকম তর্ক-বিতর্ক। এদের পিছু নেয় সেক্রেটারি, যে কিনা নাটকের সম্পূর্ণ খরচ বহন করছে। বারবনিতাদ্বয়ের একজন মুসলিম আরেকজন হিন্দু। কিন্তু শাহ্জাহান নাটকে হিন্দু অভিনেত্রীর অভিনয় করার ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। তাই হিন্দু বারবনিতা মুসলিম হওয়ার জন্য বিয়ে করে বাবলু মদারুকে, যে কিনা ইতিপূর্বে অপর মুসলিম বারবনিতাকে বিয়ে করেছে। শুরু হয় দুই বারবনিতার কলহ। শেষ পর্যন্ত অভিনয় করার জন্য ভাড়া করে আনা হয় ‘বলাকা’ নামের এক অভিনেত্রীকে। সে আসলে ছদ্মবেশী মুসলমান। বলাকাকে আনার পর তার ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে খোকা চৌধুরী, বাদশা মিয়া ও চুন্নু মিয়ার মতো লোভী মানুষেরা। ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসতে থাকে নাটক মঞ্চস্থের রজনী। কিন্তু রিহার্সেলও সঠিকভাবে হচ্ছে না। রিহার্সেল না হলে আবার নির্দেশক নূরুল হুদার চুলায় আগুন জ্বলে না। হঠাত্ একদিন দীলিপ দাসের সর্বস্ব লুটে নেয় দুবৃত্তরা। সর্বস্ব হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে যায় দীলিপ দাস। নাটকে শুরু হয় এক নতুন সংকট। শাহ্জাহান চরিত্রে অভিনয় করার মতো আর কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত দীলিপ দাসের ভৃত্য অমূল্যকে দিয়ে চরিত্রটি করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যে কিনা নাটক মঞ্চস্থের শুরু থেকে নানা উত্থান-পতন দেখে আসছে এবং নাটকের প্রত্যেকটি ডায়লগ তার মুখস্থ।
অবশেষে দীলিপ দাসকে ছাড়াই মঞ্চস্থ হয় নাটক। নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর অমূল্য তার মেয়ে দীপালীকে হত্যার প্রতিশোধ নেয় অভিনেত্রী বলাকাকে খুন করে। দীপালী ‘শাহ্জাহান’ নাটকের অভিনেত্রী ছিল এবং বিশ বছর আগে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। বলাকা খুন করার মধ্য দিয়ে নাটকে ঘটে যায় এক নতুন ট্রাজেডি। অপরদিকে সর্বস্ব হারিয়ে দীলিপ দাসের মতো একজন দেশপ্রেমিক অভিনেতা আশ্রয় নেয় শ্মশান ঘাটে।
নাট্যকার মান্নান হীরা তাঁর লেখনিতে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তত্কালীন সমাজচিত্রকে। দীলিপ দাসের মতো একজন প্রান্তিক অভিনেতা, যে দেশ বিভাগের পরও তার মাতৃভূমিকে ছেড়ে যায়নি। এই অভিনেতার জীবনের ট্রাজেডি ও তার পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই নাটকে।
‘ময়ূর সিংহাসন’ নাটকের অভিনেতারা যে বিশেষ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তা একবাক্যে স্বীকার্য। দীলিপ দাস, অমূল্য, নুরুল হুদা, বলাকা, জোছনা ও কৃষ্ণার অভিনয় দর্শকদের বিমোহিত করেছে। তবে অমূল্য চরিত্রে আরিফ হোসেন আপেলের অভিনয় বিশেষভাবে দর্শকদের নজর কাড়ে। দীলিপ দাস চরিত্রে মামুনুর রশিদের অভিনয় সমালোচনার ঊর্ধ্বে। বলাকা, জোছনা ও কৃষ্ণা চরিত্রে তাজিন আহমেদ, মোমেনা চৌধুরী ও তমালিকা কর্মকার তাঁদের স্বভাবজাত অভিনয় নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। তবে মেনহাজ চরিত্রটির অভিনয় আরও ভালো করার সুযোগ ছিল।
নাটকের মঞ্চসজ্জার ক্ষেত্রে তিনটি স্থান—টাউন হলের মহড়া কক্ষ, হেরোইনের বিশ্রাম কক্ষ এবং পথের ধারের শ্মশানঘাটকে আলাদা আলাদাভাবে ফুটিয়ে তুলে মঞ্চ পরিকল্পনায় অভিনবত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন ডিজাইনার ফয়েজ জহির।
টাউন হলের মহড়া কক্ষের ডিজাইনের ক্ষেত্রে নতুনত্ব দেখা গিয়েছে। বড় পর্দায় টাউন হলের ভেতরের ডিজাইন একে পেছনে টাঙিয়ে দেওয়াতে মঞ্চে বৈচিত্র্য এসেছে। তবে ময়ূর সিংহাসনের চেয়ারটা ও শ্মশানঘাটের গাছটিকে আরেকটু ভালোভাবে ডিজাইন করার সুযোগ ছিল।
নাটকের আলোক পরিকল্পনায় ছিলেন ঠান্ডু রায়হান। আলোক পরিকল্পনা নাটকের দৃশ্যগুলোর পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে ‘শাহ্জাহান’ নাটক মঞ্চায়নের সময় শুধুমাত্র আলো দিয়ে মঞ্চের ভেতর আরেকটি মঞ্চ তৈরি করাটা বিশেষ কৃতিত্বের দাবি রাখে এবং সকলের বিশেষ নজর কাড়তে সক্ষম হয়।
‘ময়ূর সিংহাসন’ নাটকের পোশাক-পরিকল্পনা করেছেন জাহানার নূরী। সকল অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের পোশাক ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ। দীলিপ দাস, বলাকা, জোছনা ও কৃষ্ণার পোশাক ভালো হয়েছে। তবে মেনহাজ চরিত্রটি যে পোশাক পরেছেন তা নাটকের সমসাময়িক সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি।
নাটকের আবহসংগীত করেছেন সুজেয় শ্যাম। আবহসংগীতটি নাটকের ওঠানামার সাথে সম্পূর্ণভাবে মিলে যায়। এটি প্রত্যেকটি দৃশ্যের সাথে একটি যোগসাজশ স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। এছাড়া কিছু দৃশ্যে মঞ্চের ভেতরে বসে বাদক যে বাদ্য বাজিয়েছেন তা নাটকের প্রাণশক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। কয়েকটি দৃশ্য যে গান (আমি সারা সকাল ধরে...) দিয়ে শেষ হয়েছে পরের দৃশ্যটি আবার সেই গান দিয়েই শুরু হয়েছে। এই সমন্বয়টিও ভালো হয়েছে।
কালের বিবর্তনের অতল গহ্বরে অনেক কিছুই প্রতিনিয়ত হারিয়ে যায়, যাচ্ছে। তেমনিভাবে হারিয়ে যায় অনেক আলো জ্বালা মানুষ। সমাজের নানারকম অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে তাদের জীবনেও ঘটে যায় অনেক বড় বড় ট্রাজেডি। কিন্তু ইতিহাস তাদের কয়জনকেই বা মনে রাখে। সেই সকল হারিয়ে যাওয়া নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিকদের জন্য ময়ূর সিংহাসন একটি অনবদ্য প্রচেষ্টা। এই নাটক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় দীলিপ দাসের মতো দেশপ্রেমিকদের পরিণতি।