বই আলোচনা

দেশপ্রেমে উজ্জীবিত অন্তরের ছন্দ

অন্তরের ছন্দ মোহাম্মদ জমির প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা প্রকাশক : করুনাংশু বড়ুয়া মূল্য : দুইশত আশি টাকা মোহাম্মদ জমির। যাকে আমরা জানি সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক হিসেবে। তিনি যে কবিতা লেখেন তার প্রমাণ সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘অন্তরের ছন্দ’। ২০১৩ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে গ্রন্থটি। বর্তমান সময়ের দেশের চালচিত্র সুকৌশলে কবিতার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন আলোচ্য গ্রন্থটিতে। ১১২ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থে মোট ১০০টি কবিতা স্থান পেয়েছে। কবিতাগুলোতে চারপাশের পরিচিত সমাজকে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও কোনো নির্দিষ্ট বিষয় ও সমাজের অসঙ্গতি গ্রন্থটিতে স্থান পায়নি বরং সে সমাজের চিহ্নিত সমস্যাগুলোর প্রতি লেখলের দুর্বলতা স্পষ্ট। ‘দেখেছি দীর্ঘশ্বাস, দেখেছি ট্রাজেডি। আর বুঝেছি নৈরাজ্যের অন্ধকারে আছে প্রতিবাদের অধিকার/ আর তার মাঝে আছে জ্যোত্স্না আলোর সম্ভাবনা,/ ও পুনঃজাগরণের আশ্বাস’। (পুনঃজাগরণ পৃষ্ঠা ৫৯) অথবা শুধু তদন্ত নয়, দিতে হবে কঠিন শাস্তি,/ করতে হবে বধ এ ভয়ানক জঘন্য প্রেতাত্মাকে/ যাতে ভবিষ্যতে আর এর দুঃশাসনের উপদ্রবে/ জাতির কাঙ্ক্ষিত যাত্রা না হয় বিঘ্নিত। (কালো বিড়াল, পৃষ্ঠা-৫৬) লেখকের গ্রামীণ, শহুরে, নাগরিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ের ওপরও মনোযোগ লক্ষ করা যায়—ইসরাইলি আগ্রাসন নেমেছে গণহত্যার প্লাবন/ আছে যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাবের অবজ্ঞা/ গাজার গোরস্তানে আজ নেই ঠাঁই/ নেই ত্রাণসামগ্রী, আছে শুধু আতঙ্ক,/ আজ মা-সন্তান একত্রে হচ্ছে দাফন সেই মৃত্যুপুরীতে। (গাজা এখন গোরস্তান, পৃষ্ঠা-৯৭) তা ছাড়াও ইসলামি মূল্যবোধ, ইসলামি সৌন্দর্য, সত্যের মহিমা, সংগ্রামের শোভন রূপ, শান্তির অন্বেষা কবিতাগুলোকে করেছে সমৃদ্ধ। ‘এই দায়িত্ববোধ থাকলেও অনেক সময়,/ মোরা ভুলে যাই অনেক নির্দেশনা, কর্মরেখার বৃত্তে-/ দেখি না দেখার, আর প্রয়োজনে অনেক সময় - আপনাকে করি পর নিজ গুণে/’ (ধর্ম, পৃষ্ঠা-৬৬) অথবা দাঁড়ালেন রুখে নবীদের উপসংহার,/ জনগোষ্ঠীকে ভালোবেসে,/ নিজে সৌহার্দ্য নীতি করিলেন অনুসরণ/ করিলেন মানবজাতির প্রতি প্রদর্শন, অমোঘ পরিবর্তন (ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী, পৃষ্ঠা-২১) কবিতাগুলোতে মার্জিত চিন্তা, হূদয়ের কোমলতা, স্বভাব সুন্দর অনুপ্রেরণা আর তার সঙ্গে দেশপ্রেম এবং সুদূরপ্রসারী কল্পনাশক্তি সত্যি অপূর্ব যা পড়লে অনবদ্য এবং হূদয়গ্রাহী মনে হবে। লেখকের অধিকাংশ কবিতাই দেশপ্রেমে উজ্জীবিত। বর্তমানের এই নোংরা রাজনীতিতে বলি হচ্ছে দেশের মানুষ। কেন ‘চাঁদাবাজির রাজনীতি,’ কেন যত্রতত্র ভূমি দখল, কেন ট্রেন জ্বালানো, কেন প্রায় প্রতিদিন লাশ উদ্ধার—অথচ এ দেশের মানুষরাই একদিন রক্ত দিয়ে যুদ্ধ করেছিল ভাষার জন্য, স্বাধীনতার জন্যে অকাতরে রক্ত দিয়েছে কি এরকম দেশ দেখবার জন্যে? তবে কেন হবে আজ মূল্যবোধের এই বিকৃতি? কেন এই অবনতি? হচ্ছেটা কি কবিতায় বর্তমান সময়ের চিত্র লেখক তুলে ধরেছেন—দেশে চলছে অরাজকতা, চলছে হত্যা, খুন। অথচ আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে, তারা কী করে? তারা কি খুনিকে ধরতে পারছে না; অথচ তারা তার সন্ধান দিতে পারে না। ফলে মানুষের মাঝে ঘনীভূত হচ্ছে অবিশ্বাস। সীমান্তবর্তী এলাকায় ফেলানির কাটাতারে ঝুলন্ত ছবিটি দেখে লেখকের মমতা মাখানো প্রতিবাদী উচ্চারণ—সীমান্তবর্তী এলাকায় চলছে গুলি/ অন্য দেশের সীমান্তে যখন চলে না গুলি/ তবে কেন আমাদের সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন হচ্ছে,/ কেন হবে কিশোরী ফেলানি হত্যা, কেন বিবেক হবে দংশন? কেন আইন ব্যবহার না করে বেপরোয়া এই আচরণ,/ তাই কবির প্রতিবাদ শিরোনামে—এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে। অথচ তারাই তো সহযোগিতা দিয়ে জীবন দিয়ে একদিন শত্রুমুক্ত করেছিল/ তবে তাদের আজ এই আচরণ—এ প্রশ্ন লেখক রেখেছেন কবিতার মাধ্যমে। অনেকগুলো কবিতাতেই লেখকের দেশপ্রেম উচ্চারিত হয়েছে। কখনো প্রতিবাদের সুরে, কখনো বেদনা মাখানো সুরে। দেশে চলছে হরতালের রাজনীতি, মানুষ হত্যার রাজনীতি। লেখক সুকৌশলে এসবের চিত্র তুলে ধরছেন এক একটি কবিতায়। আজ দোকান বন্ধ, তান্ডব চালিয়েছে হরতালকারীরা/ ভুলেছে তারা হরতালের উদ্ধত লাঠির আতঙ্ক অর্থনীতির জন্য হুমকি/ সহজ, সুন্দর দ্ব্যর্থহীন সূচয়িত শব্দ-সম্ভারে এবং ভাষা ও ছন্দের লালিত্যে, দুঃস্থ-দুঃখী এবং দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের পক্ষে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর কবিতাগুলোতে তুলে ধরেছেন লেখক। কবিতাগুলোতে কখনো দেশপ্রেম কখনো সমাজভাবনা, আবার কখনো আন্তর্জাতিক বিষয় তুলে ধরেছেন যা বাস্তব ও জীবন্ত। গ্রন্থটির প্রকাশক হিমমিশা পাবলিকেশন। অনিন্দ্য সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছেন সব্যসাচী হাজরা। মূল্য দুইশত টাকা মাত্র। গ্রন্থটির বহুল প্রচার কাম্য।