৮ বছরেও কমিটি হয়নি হল শাখাগুলোর
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৩৮
গ্রুপিং আর দ্বন্দ্বের কারণে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল শাখাগুলোর কমিটি নেই প্রায় আট বছর ধরে। এ কারণে ক্যাম্পাসে সংগঠনটির দলীয় কার্যক্রম যেমনি থমকে আছে, তেমনি হতাশা বাড়ছে নেতা-কর্মীদের মধ্যে। রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ছে অনেক পদপ্রত্যাশী ছাত্রনেতা।
ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র (খসড়া) অনুযায়ী, ৬১ সদস্যবিশিষ্ট হল কমিটির মেয়াদ এক বছর। সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ১৬টি হল কমিটির মধ্যে চারটির কমিটি গঠন করা হয়েছিল ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে। বাকি হলগুলোর কমিটি গঠন করা হয় ২০০৫ সালের এপ্রিলে। ২০০৬ সালের এপ্রিলে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা হয়নি। এর মধ্যে সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে দুইবার পরিবর্তন এসেছে। ঐ সময় গঠিত কবি জসীম উদ্দীন হল শাখার সাধারণ সম্পাদক মাসুদ পারভেজ এখন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু হল শাখার কমিটি গঠন করা হয়নি।
ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটি গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আংশিক গঠন করা হয়। দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর দিন থেকেই ‘যত দ্রুত সম্ভব’ কিংবা ‘অল্প সময়ের মধ্যেই’ হল শাখার কমিটি গঠনের কথা বলে আসছেন কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শীর্ষ নেতারা। কিন্তু এক বছর কেটে গেলেও এই নেতারা এখনও একই সুরে কথা বলছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এক শীর্ষ নেতা জানান, হল কমিটি গঠন নিয়ে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের চাপ রয়েছে। প্রভাবশালী নেতারা তাদের অনুসারীদের পদ দিতে তদবির করেন। সব পক্ষকে খুশি করে কমিটি গঠন কঠিন হয়ে পড়েছে। এরপরও সমন্বয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শাখা একাধিকবার কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে হল শাখা কমিটির খসড়া দেয়। কিন্তু গ্রুপিং দ্বন্দ্ব মিটিয়ে সকল পক্ষকে খুশী করতে না পেরে হল কমিটি গঠন প্রক্রিয়া থেমে যায়। সর্বশেষ গত আগস্ট মাসে আবারও কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের কাছে কমিটি জমা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
অপর এক নেতা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হলগুলোসহ ১৭টি কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মত পদগুলোতে ২০০৩-০৪ সেশন থেকে ২০০৬-০৭ সেশনের নেতাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। প্রাথমিকভাবে ১৫-২০ জনের কমিটি গঠন করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে ২০১০-১১ সেশনের কর্মীরাও পদ পেতে পারে।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটিগুলো যেকোনো ছাত্র সংগঠনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ দিন ধরে এ কমিটি গঠন না হওয়ায় জট লেগে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতারা এ নিয়ে কাজ করেছে। হল শাখার কমিটির সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শাখাও পূর্ণাঙ্গ করা হবে। এ জন্য সমন্বয় করা হচ্ছে। ১৫ দিন থেকে এক মাসের মধ্যে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মহিদুল হাসান হিরু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা পূর্ণাঙ্গকরণ এবং হল কমিটি একসাথে গঠন করা হবে বলে কিছু জটিলতা রয়েছে। তারপরও আমাদের পক্ষ থেকে তালিকা ও পরামর্শ কেন্দ্রীয় কমিটিকে দেয়া হয়েছে। তারা যেমন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা দেবেন তেমনটিই হবে।
ছাত্রদলের একাধিক কেন্দ্রীয় ও সাবেক নেতা জানান, ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার গত আহবায়ক কমিটি (মতিন-নাসির) বেশ কয়েকবার হল কমিটি গঠন করার চেষ্টা করেন। তখনও গ্রুপিং দ্বন্দ্ব মিটিয়ে বিভিন্ন নেতাদের অনুসারীদের পদায়ন নিশ্চিত করতে না পারার কারণেই হল কমিটি আলোর মুখ দেখেনি।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৬-০৭ সেশনের এক ছাত্র ও ছাত্রদল কর্মী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কর্মী হিসেবে দলের রাজনীতি শুরু করি। মাস্টার্স শেষ হয়ে গেলো এখনও কর্মীই রয়ে গেলাম। পদায়নতো নয়ই স্বীকৃতিও পেলাম না। হতাশ হয়ে এখন বিএনপির কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ ছাড়া আর কোনো কর্মসূচিতেই যাই না। অনেকেই হতাশ হয়ে রাজনীতিই ছেড়ে দিয়েছেন।
গ্রুপিং দ্বন্দ্বের বিষয়টিকে সরাসরি স্বীকার না করলেও ছাত্রদলের সভাপতি আব্দুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও হল কমিটি গঠনে অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে। সবকিছু সমন্বয় করাটাই আসল কাজ। কমিটি গঠনে আর দেরী করার সুযোগ নেই। শিগগিরই ইতিবাচক সংবাদ পাওয়া যাবে।
জানা যায়, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পরপরই ২০০৯ সালের এক জানুয়ারি মধুর ক্যান্টিনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটে ছাত্রদলের আজিজুল বারী হেলাল-শফিউল বারী বাবু কমিটি। ওই বছরের ১ জুলাই সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে সভাপতি ও আমিরুল ইসলাম আলীমকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ১৭ জুলাই আবদুল মতিনকে আহবায়ক করে তিন মাসের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়।
২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর ওপর ছাত্রদলের বিদ্রোহী গ্রুপ ও ছাত্রলীগের হামলার পর ছাত্রদল ক্যাম্পাসে আসতে বাধার মুখে পড়ে। ওই বছরের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তখনকার সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক ওবায়দুল হক নাসিরসহ কয়েকজন নেতা-কর্মীর ওপর ছাত্রলীগের হামলার পর ক্যাম্পাসে আর কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি ছাত্রদল। বর্তমান কমিটি গঠন হওয়ার পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সাথে পদপ্রাপ্ত নেতারা সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে আসলে বেশ কয়েকজন কর্মী ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা মারধরের শিকার হয়। সাংগঠনিক এ স্থবিরতার জন্য হল কমিটি না থাকার দুর্বলতাকেই প্রধান কারণ বলে মনে করেন বর্তমান কমিটির অনেক কেন্দ্রীয় নেতাও।
এ প্রসঙ্গে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়াতে এক ধরনের গ্যাপ তৈরি হয়েছে। তবে শিগগিরই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা পূর্ণাঙ্গ এবং হল কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত বলে তিনি মন্তব্য করেন।