জাতীয় শিক্ষাক্রমের শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিখন শেখানো পদ্ধতি/ কৌশল ও প্রয়োগের সমস্যা- সম্ভাবনা
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৭:৫২
মোঃ শাহজাহান
কন্ট্রোলার অব পাবলিকেশন্স, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, প্রাক্তন শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ, এনসিটিবি, ফোকাল পয়েন্ট,
UNICEF, NCTB
শিক্ষাথী-কেন্দ্রীক শিখন শেখানো পদ্ধতি/কৌশল প্রয়োগের সমস্যা
শিক্ষার্থী-কেন্দ্রীক শিখন শেখানো পদ্ধতি/কৌশল জাতীয় শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়ক। কিন্তু বিদ্যালয় পর্যায়ে এ ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
(ক)শিক্ষকের স্বল্পতাঃ অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ০১(এক) জন শিক্ষক দৈনিক ০৫ (পাঁচ) থেকে ০৭(সাত) টি ক্লাশ গ্রহণ করে থাকেন। একজন শিক্ষকের পক্ষে পাঠ পরিকল্পনা করে তদানুসারে উপকরণ তৈরি এবং যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে শ্রেণিতে পাঠদান শুধু কষ্টসাধ্যই নয় অনেকক্ষেত্রে তা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
(খ) বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পদ না থাকা ঃ কলেজগুলোর ন্যায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিশেষ করে ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ক্ষেত্রে অনেক বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পদ কাঠানো নেই। উল্লেখ্য, মানবিক বিভাগের অনেকগুলো বিষয় থাকলেও এ বিভাগের একজন শিক্ষক পৌরনীতি কিংবা অর্থনীতি বা ইতিহাস বিষয়ে ডিগ্রিধারী হয়ে নিজ বিষয়ের বাইরে অন্যান্য বিষয়ে ক্লাস গ্রহণ করে থাকে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা, চারু ও কারুকলা, কৃষি শিক্ষা, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে পাঠদান কাজ পরিচালিত হয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে সঠিকভাবে শ্রেণির পঠন-পাঠনের কাজে পরিচালনা করা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকাঃ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি বৃহত্ অংশ প্রশিক্ষণবিহীন। একটি অংশ বি.এড কিংবা এম.এড পর্যন্ত ডিগ্রিধারী হলেও পরিবর্তিত শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য বুঝে তা অর্জনের উপযোগী শ্রেণি কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনায় অপারগ। তাছাড়া পরিবর্তির বিশ্ব পরিস্থিতি, প্রযুক্তি এবং শিক্ষার্থীর চাহিদাকে সমন্বয় করে একটি কাম্য পাঠদান কার্যক্রমের পরিকল্পনা করা এবং তা শ্রেণিতে প্রয়োগ করতে অনেকে সক্ষম নন। এমতাবস্থায় নিত্য-নতুন পাঠদান পদ্ধতি/কৌশল গ্রহণ ও প্রয়োগ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
(ঘ) শ্রেণির আকার (Class Size) বৃহত্ হওয়াঃ অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। ৬০ (ষাট) থেকে ১২০ (একশতবিশ) এর অধিক শিক্ষার্থী নিয়ে কোন একটি শ্রেণিতে কার্যকরভাবে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রীক পাঠদান আসলে অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে উঠে না।
(ঙ)কোচিং নির্ভরতাঃ শিক্ষার্থী ও অভিবাবকদের অনেকে কোচিং এর উপর নির্ভরশীল হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিতে পাঠগ্রহণে অমনোযোগী। ফলশ্রুতিতে গাইড ও নোটবই নির্ভর কোচিং সেন্টারগুলোর পাঠগ্রহণের প্রতি শিক্ষার্থীদের ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়।
(চ) পাঠ্যবই নির্ভর পাঠদানের প্রতি গুরুত্ব না দেয়াঃ পাঠ্যবই অনুসরণ করে পাঠদান কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে শিথিলতার করণে অনেকাংশে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রীক পাঠদান কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের শ্রেণিতে পর্যন্ত নোটবই ও গাইডবই ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে যা কোনভাবে কাম্য নয়।
(ছ) আর্থিক অস্বচ্ছলতাঃ বিদ্যালয়ের আর্থিক অস্বচ্ছলতা অনেকাংশে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রীক পাঠদান পদ্ধতি/কৌশল ব্যবহারকে বাধাগ্রস্থ করে।
(জ) বিদ্যালয়ের দুর্বল অবকাঠামোঃ শ্রেণিতে মাল্টিমিডিয়া কিংবা অন্য কোন ইলেট্রনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে পাঠদান কাজ পরিচালনার জন্য বিদ্যালয়ের ন্যূনতম মনের অবকাঠামো থাকা দরকার। অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এক্ষেত্রে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।
(ঞ)শিক্ষোপকরণের মূল্য বৃদ্ধিঃ শিক্ষোপকরণের বাজার দর ক্রমাগত বেড়ে চলার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থী কেন্দ্রীক পাঠদান বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহারের কথা থাকলেও তা অনেকাংশে সংগ্রহ ও ব্যবহারে শিক্ষকদের মধ্যে আগ্রহের অভাব লক্ষ্য করা যায়।
(ট) শিক্ষোপকরণ সংরক্ষণের সু-ব্যবস্থা না থাকাঃ অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক তাঁদের শিক্ষার্থীর দিয়ে শ্রেণি ও বাড়ির কাজের অংশ হিসেবে নানা শিক্ষোপকরণ তৈরি করেন। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে এ বছরে তৈরিকৃত মডেল উপকরণগুলো পরের বছর খুজে পাওয়া যায় না।
(ঠ) একাডেমিক সুপারভিশনের অভাবঃ প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন করা, পরিদর্শন অভিজ্ঞতা নিয়ে শ্রেণি শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করা, ক্ষেত্র বিশেষ প্রদর্শনী পাঠদানের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি কার্যক্রম একাডেমিক সুপারভিশনের অংশ। এরূপ কার্য সম্পাদনের প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল না থাকায় শিক্ষাথী-কেন্দ্রীক পাঠদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
এছাড়া প্রধান শিক্ষকের নিবিড় তত্ত্বাবধানের অভাব, পরিচালনা কমিটির অনাগ্রহ, কোর্স শেষ করার জন্য তাগিদ ইত্যাদি কারণে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রীক পাঠদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আপনার মতামত
জানাতে ফোন করুন০১৭১৪৭০৫৭২৭ অথবা ই-মেইল
anushilon.ittefaq
10@gmail.com