দক্ষ জনশক্তি রফতানি:এখনই যা করতে হবে
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৫০
বিদেশে জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে বর্তমান মহাজোট সরকারের সাফল্য সন্তোষজনক বিবেচিত হলেও হালে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির পরিমাণ ক্রমেই কমছে। গত ছয় মাসে গড়ে প্রতিমাসে কমেছে ১০ হাজার। কোনো প্রচেষ্টাতেই এ পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। এ বছর প্রথম ছয় মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে দুই লাখ আট হাজার ৩৪০ জন শ্রমিক কাজ নিয়ে গেছেন। এর আগের বছর একই সময়ে এদেশ থেকে বিদেশে শ্রমিক গিয়েছিলেন তিন লাখ ৭৪ হাজার ৭৩৭ জন। গত বছর প্রতিমাসে জনশক্তি রফতানির পরিমাণ ছিল ৫০ হাজারের ওপরে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের কোনো মাসেই তা অতিক্রম করতে পারেনি ৪০ হাজারের কোটা। বিদেশে জনশক্তি রফতানির পরিমাণ বাড়াতে সরকারের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মী নিয়োগ বন্ধ থাকায় এখাতে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়— এ সরকারের আমলেই তার আশাব্যঞ্জক সুরাহা হয়েছে। জি টু জি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) পদ্ধতিতে অর্থাত্ সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়ায় জনশক্তি পাঠানোসংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে উভয় দেশের মধ্যে। এই চুক্তির আওতায় ইতিমধ্যে খুব কম খরচে, জনপ্রতি সর্বোচ্চ চল্লিশ হাজার টাকায় অনেকেই মালয়েশিয়ায় কাজ নিয়ে গেছেন। হংকং-এও অপেক্ষাকৃত অনেক কম খরচে অনেক নারী-কর্মী গেছেন এবং বেশ ভালো বেতনে কাজ পেয়েছেন।
১৯৭৬ সালে ছয় হাজার ৩৭ জন শ্রমিক পাঠানোর মধ্য দিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির যাত্রা শুরু হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হয়েছে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। বর্তমানে বিশ্বের ১৫৭টি দেশে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক রফতানি হচ্ছে। এর মধ্যে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য উল্লেখযোগ্য। গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রফতানির পরিমাণ ছিল ছয় লাখ সাত হাজার জন। এর আগের বছর গিয়েছিলেন পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার ৬২ জন। গত বছরের চেয়ে চলতি বছরের জনশক্তি রফতানির ধারা নিম্নগামী। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিভিন্ন দেশে জনশক্তির চাহিদা কমে গেছে স্বাভাবিকভাবে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই বড় বড় প্রতিষ্ঠানে লোক ছাঁটাইয়ের খবর প্রায়ই দেখা যাচ্ছে পত্র-পত্রিকায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে আগের চেয়ে কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে এদেশ থেকে জনশক্তি রফতানির গতি আগের চেয়ে কমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই আমাদের শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আমাদের শ্রমিক রফতানি বন্ধ রয়েছে প্রায় এক বছর ধরে। সরকার সে বাজার চালু করতে পারেনি। ফলে সর্বসাকুল্যে শ্রমিক যাওয়ার ধারা নিম্নগামী হওয়াটা স্বাভাবিক। নতুন নতুন বাজার খোঁজা এবং বন্ধ শ্রমবাজার চালুর দায়িত্ব সরকারের। আরব আমিরাতসহ যে সব দেশে জনশক্তি রফতানি বন্ধ রয়েছে সেগুলো চালু করতে হবে অবিলম্বে। তা না হলে আগামী দিনগুলোতে অর্থনীতিতে এর প্রতিকূল প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। যার বোঝা বইতে হবে গোটা জাতিকে।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিখাত থেকে বিরাট অংকের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। জনশক্তি রফতানিখাতের গতিশীল ও চাঙ্গাভাবের করণেই এখাত থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসছে। ২০১৩ সালে সাড়ে সাত লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে কিনা কে জানে। ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের চেয়ে দেড় লাখ বেশি। বর্ধিত সংখ্যায় এদেশ থেকে জনশক্তি বিদেশে কাজ পাওয়ার ফলে একদিকে দেশে বেকারত্ব হ্রাস পেয়েছে, পরিবর্তন এসেছে এসব কর্মী ও তাদের আপনজনের জীবনমানের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে তাদের অনেক পরিশ্রম আর ঘামের বিনিময়ে দেশ অর্জন করেছে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স, যা আমাদের অর্থনীতিতে অধিকতর গতি সঞ্চার করেছে। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং তা হলো, বিদেশে চাকরি নিয়ে যারা যায়, তাদের বেশিরভাগই অল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত। তাদের অধিকাংশই আধা দক্ষ কিংবা অদক্ষও বটে। মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভালো বেতনে উন্নত ধরনের চাকরি পাবার ক্ষেত্রে প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের সঙ্গে তারা প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারছে না শেষপর্যন্ত। উন্নতমানের আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞান, ইংরেজিসহ বিদেশি ভাষা জানা, বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো স্মার্টনেস ইত্যাদি প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অথচ এগুলোর অভাবে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শ্রমশক্তি ভালো চাকরি পাচ্ছে না, তাদেরকে প্রতিবেশি প্রতিযোগী অন্যান্য দেশ থেকে যাওয়া কর্মীদের চেয়ে অনেক কম বেতনে চাকরি করতে হচ্ছে। মানসম্মত সম্মানজনক কাজ প্রায় ক্ষেত্রে জুটছে না। বাংলাদেশ থেকে কাজ নিয়ে যাঁরা বিদেশে যাচ্ছেন তাঁরা তেমন শিক্ষিত নন, আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞানও নেই তাঁদের, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষাজ্ঞান নেই বলা যায়। তাঁদের বেশিরভাগই বিদেশের অজানা অচেনা পরিবেশে চলার, বলার এবং খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার পরিচয় দেন। ভাষা না জানার কারণে যেমন নানা অসুবিধায় পড়তে হয় তাঁদের তেমনি সংশ্লিষ্ট দেশের চালচলন ও আচার-ব্যবহার সম্পর্কে ন্যূনতম প্রাথমিক ধারণাও না থাকার কারণে নানা ক্ষেত্রে তাদের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। এ কারণে বিদেশে জনশক্তি রফতানির সময় দক্ষ জনশক্তি পাঠানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদেশে চাকরি নিয়ে যাবার আগে বিভিন্ন ধরনের কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়া জরুরি। বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদার কথা বিবেচনা করে সে অনুযায়ী কাজে অভিজ্ঞ ও দক্ষ করে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে এর মধ্যেই। যেখান থেকে প্রশিক্ষিত কর্মী গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও দেশের সব জেলায় তেমন প্রশিক্ষণ গ্রহণের ভালো সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। এ বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে বিদেশে আমাদের সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার দিনে দিনে সংকুচিত হতে থাকবে।
এখন থেকে যে দেশেই যে ধরনের কর্মী পাঠানো হোক না কেন পাঠানোর আগে তাদের সবাইকে পরিকল্পনা অনুযায়ী যথোপযুক্ত ওরিয়েন্টেশন কোর্সের আওতায় এনে মোটামুটিভাবে প্রস্তুত করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন ট্রেডের কর্মীদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে কর্মীরা সংশ্লিষ্ট দেশের জরুরি শব্দাবলি, কথোপকথন উপযোগী ভাষা, আইন-কানুন, আচার-আচরণ, চালচলন, শৃঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তি ইত্যাদি বিষয়ে মোটামুটি একটা স্বচ্ছ ধারণা পেতে পারে। বিদেশে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে যে অমিত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে তাকে আরো এগিয়ে নিতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করে অধিকতর চৌকস কর্মী পাঠানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আমাদের সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য তেমন প্রত্যাশা সবার।
ঢাকা