নৈতিক শিক্ষার বিকাশে করণীয়

সাক্ষরতার মানদণ্ড হলো মাতৃভাষায় কথা শুনে বুঝতে পারা, মৌখিকভাবে ও লিখিতভাবে তা ব্যক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন হিসাব করার এবং লিপিবদ্ধ করে রাখার ক্ষমতা। সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীলতা, অভিযোজন ক্ষমতা, অধিকার সচেতনতা ইত্যাদি। বর্তমান বাংলাদেশে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এমন মাত্রায় গিয়ে ঠেকেছে যে তা নতুন করে বলার কিছু নেই। সন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ ইত্যাদি যেন প্রতিদিনকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিতামাতা কর্তৃক সন্তান বা সন্তান কর্তৃক পিতামাতার আক্রান্ত হওয়া এবং শিক্ষক কর্তৃক নারী কিংবা পুরুষ শিক্ষার্থীদের নানারকম নির্যাতন আমাদের বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে বাধ্য করেছে। এরকম পরিস্থিতিতে সাক্ষরতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে নতুন একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন—নৈতিকতা। নৈতিকতাকে দার্শনিকরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। শাদামাটা কথায়, ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ এবং সাধারণ সততার আচরণিক বহিঃপ্রকাশকে নৈতিকতা বলে। জ্ঞানের লক্ষ্য তাত্ত্বিক নয়, ব্যবহারিক। নৈতিকতা বিষয়টিও ব্যবহারিক, যা সরাসরি আচরণের সঙ্গে জড়িত। কারো কাছে নৈতিকতা সহজাত সম্পদ, কারো কাছে শোকেসে তুলে রাখা ভালো ভালো কথার ডালি। আধুনিক পাশ্চাত্য দার্শনিক বেকন-হবস-লকের মতে, নীতিবিজ্ঞানের চরিত্র শেষপর্যন্ত প্রয়োগিক। তাঁদের মতে, নৈতিকতার সর্বজনীন নিয়ম বলে কিছু নেই। সমাজ-সংস্কৃতি ভেদে এর রকমফের রয়েছে। যাপিত জীবনের নানান ঘাত-প্রতিঘাতে সমাজ-সংস্কৃতি-অর্থনীতির কাঠামোর প্রভাবে নৈতিকতা একটি রূপ লাভ করে। একটি রাষ্ট্রের জন্য নৈতিকতা শিক্ষাদান এবং জনগণের মধ্যে তা জিইয়ে রাখা বণর্নাতীত দরকারি। বাংলায় নৈতিকশিক্ষার ওপর সর্বপ্রথম গুরুত্ব প্রদান করেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনিশ শতকের মাঝামাঝি নৈতিক শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। তিনি নিজেই নৈতিক শিক্ষার উপাদান অন্তর্ভুক্ত করে পাঠ্যবই রচনা করেন ও কয়েকটি বিদেশি বই অনুবাদ করেন। একেবারে প্রথমেই তিনি শিশুদের জন্য রচনা করেন ‘বোধোদয়’ ও ‘বর্ণ পরিচয়’। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের জন্য তিনি ইংরেজি বই ‘কথামালা’ (Easop’s Fable) এবং ‘জীবন চরিত’ (Chamber’s Biographies) অনুবাদ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে নৈতিক শিক্ষাকে ফলপ্রসুভাবে বাস্তবায়ন করতে কিছু প্রস্তাব পেশ করতে চাই। প্রথমত, রাষ্ট্রীয়ভাবে নৈতিক শিক্ষাকে সকল স্তরে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষায় যেমন পরীক্ষাগারে ব্যবহারিকভাবে পরীক্ষণের সুযোগ রয়েছে, তেমনি প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নৈতিক ও ধর্ম শিক্ষাকে কেবল লেকচার আর লিখিত পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যবহারিক অংশ যু্ক্ত করতে হবে। ধরা যাক, শিক্ষার্থীদের নিয়ে বছরে একটি দিন পথশিশুদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের খেলাধূলার ব্যবস্থা করা। শিক্ষাবিজ্ঞানে এ ধরনের শিক্ষাপদ্ধতিকে বলা হয় ‘Activity Based Learning’। প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক স্তরে শিশুদের ব্যবহারিকভাবে নৈতিক শিক্ষাদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দার্শনিক লক বলেছেন, এসময় তাদের মন-মস্তিষ্ক থাকে পানির মতোন। পানিকে যেমন যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে পরিচালিত করা যায়, ঠিক তেমনি কোমলমতি শিশুদের মনকেও ইচ্ছামতো গড়ে তোলা যায়। তবে ফরাসী দার্শনিক রুশো বলেছেন, শিশুদের জন্মের পর তথাকথিত শিক্ষার প্রভাবে প্রাকৃতিক অনেক গুণ অনেকখানি নষ্ট হয়ে যায়। রুশো শিশুদের লালনপালন ও শিক্ষা দিতে যতটুকু সম্ভব স্বাধীন রাখতে বলেছেন। বকুনি দেওয়া কিংবা নৈতিক বুলি মুখস্ত করানো থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকতে হবে। উচ্চশিক্ষায় ডিসিপ্লিন হিসেবে শিক্ষাসহ দু-একটি ডিসিপ্লিন ছাড়া কোথাও মূল্যবোধ শিক্ষার কোনো বিষয় পাঠ্য হিসেবে দেখা যায় না। উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের নিজস্ব কিছু নীতি-নৈতিকতা রয়েছে। ডিসিপ্লিনগুলো স্নাতক পর্যায়ে একটি বিষয় চালু করতে পারে, যেখানে ডিসিপ্লিনের নিজস্ব নৈতিকতা এবং সামগ্রিক মূল্যবোধ বিষয়ে পাঠদান করা হবে। আবশ্যিকভাবে এখানে প্রায়োগিক দিকটিকে গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নৈতিক শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের ভেতর পোক্ত করে প্রোথিত করতে শারীরিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা যান্ত্রিকভাবে নয় সুফলদায়কভাবে আরো বাড়াতে হবে। প্লেটো, এরিস্টটল প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়বস্তু হিসেবে সংগীত ও ব্যায়ামকে আবশ্যিক অর্থে বিবেচনা করেছেন। সংগীত ও ব্যায়াম তথা সুকুমারবৃত্তি শিক্ষা এবং শারীরিক শিক্ষার একটি যৌথ চরিত্র আছে। এগুলো সাধারণত দলবদ্ধভাবে করার সুযোগ থাকে। এতে সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলা, অন্যকে সাহায্য করা, মুক্ত পরিবেশে নিজেকে মেলে ধরাসহ নানা ধরনের গুণ তৈরি হয়। এভাবে শিশুদের মধ্যে তার অজান্তেই নৈতিকতা বিকশিত হয়ে ওঠে। সাংস্কৃতিক চর্চা ও ব্যায়ামের ফলে শিশুর মধ্যে উদ্যম, সাহস, সংবেদনশীলতা এবং বুদ্ধিমত্তা তৈরি হয়। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে, আদর্শ চরিত্রের মূল ভিত্তি হলো এই চারটি বৈশিষ্ট্য (On Education)। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক নৈতিকতা বিকাশে দারুণ সহায়ক। এজন্য শ্রেণিকক্ষে তো বটেই; বাইরেও শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আয়োজন করতে পারে। বছরে অন্তত দু’বার ‘ডায়ালগ ডে’ করা যেতে পারে। যেখানে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক উভয়ের মধ্যে আনন্দঘন পরিবেশে কথাবার্তা চলবে। এখানে শিক্ষার্থীরা তাদের মনের কথা, আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করবে এবং শিক্ষকগণ তাঁদের কথা বলবেন। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝে দূরত্ব কমে আসতে পারে। পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষাকে দেশব্যাপী সহজে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। যদি প্রতিটি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে নৈতিকতা বিষয়ক শিক্ষাদান করা যায়, তাহলে একটি নৈতিক সমাজ গঠনে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবো। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার কাঠামো যেহেতু তুলনামূলকভাবে নমনীয় এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক; এর মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষাকে অনেক বেশি ব্যবহারিক চর্চার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো যাঁরা নৈতিকতা শিক্ষা দিচ্ছেন অর্থাত্ পিতামাতা, শিক্ষক বা গুরুজন কেউ; তাঁদের অবশ্যই নিজেদের ব্যক্তিজীবন ও ব্যক্তি আচরণে নৈতিক হতে হবে। কারণ শিশুরা দেখে শেখে। বহুমাত্রিক সহায়তা ছাড়া নৈতিকতা একাকী ঈপ্সিত মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। প্লেটো তাঁর রিপাবলিক গ্রন্থে বলেছেন, ব্যক্তি মানুষের সীমিত গণ্ডিতে ন্যায়পরায়ণতার প্রতিফলন দুর্বোধ্য ও বিভ্রান্তিকর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়