তরুণরাই এগিয়ে স্বেচ্ছায় রক্তদানে
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৪৬
চাহিদার সিংহভাগ রক্ত দান করেন শিক্ষার্থীরা
দশ থেকে ১৮ বার রক্ত দিয়েছেন অনেকেই
তরুণদের এই গুণ মানবতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল প্রতীক
ঘটনাটি বছর দুয়েক আগের। কলেজ ছাত্র কবির আহমেদ সৌম্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের রক্তের গ্রুপ জিজ্ঞেস করছিলেন! কথা বলে জানা গেল, বাবাকে বাঁচানোর জন্য একটি বিশেষ গ্রুপের চার ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন তার। প্রায় দেড় ঘন্টার চেষ্টায় স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে রাজি হলেন চার শিক্ষার্থী। পরক্ষণেই তাদের নিয়ে ছুটলেন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। অস্ত্রোপচারের পর ওই চার শিক্ষার্থীর রক্ত শরীরে নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেন সৌম্যর বাবা।
সেই সৌম্য এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র। দুই বছর আগের ঘটনা থেকে যে মানবিক শিক্ষা তিনি নিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার প্রয়োগ করতে শুরু করেছেন। গত এক বছরে তিনবার স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন তিনি। যতদিন সুস্থ থাকবেন ততদিন রক্তদান করে যাবেন বলে নিজের কাছে নিজেই অঙ্গীকার করেছেন।
শুধু সৌম্য নয়, দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা অন্যের জীবন বাঁচাতে নিজের রক্তদান করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। বিশুদ্ধ রক্তদানে অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করছেন। দেশের রক্তের চাহিদার সিংহভাগই বিনা পয়সায় ও স্বেচ্ছায় রক্তদান করে পূরণ করছেন তারা। তরুণদের এ গুণকে মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল প্রতীক বলেই মনে করেন বিশিষ্টজন, রক্ত সঞ্চালন বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন কর্মসূচি ২০১২’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বছরে ৬ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী তরুণরা পূরণ করেন। তবে স্বেচ্ছায় রক্তদানের সাথে জড়িত সংগঠন রেড ক্রিসেন্ট, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এবং বাঁধনের দেয়া তথ্য মতে, দেশে বছরে সাড়ে চার লাখ ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন হয়। যার সিংহভাগই তরুণরা বিনা পয়সায় ও স্বেচ্ছায় পূরণ করে থাকেন।
স্বেচ্ছায় রক্তদাতা সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রক্তদান করে বাঁধন। গতবছর এ সংগঠন ৫৫ হাজার ৬৯৫ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করেছে। ২০১১ সালে এ সংগঠন সরবরাহ করে ৬৪ হাজার ৮৯২ ব্যাগ। বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করেছে এক লাখ ১৪ হাজার ৪০১ জনের।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সন্ধানী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে ৪০ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ করছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি স্বল্প সার্ভিস চার্জে রক্ত সরবরাহ করে। শিক্ষার্থীসহ তরুণদের কাছ থেকেই তারা এ রক্ত সংগ্রহ করে। এ প্রতিষ্ঠানও বছরে ৪০ হাজার ব্যাগের মত রক্ত সরবরাহ করে।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন সাম্প্রতিক সময় মাসে প্রায় সাত হাজার ব্যাগ রক্ত ও রক্ত উপাদান সরবরাহ করছে। এছাড়াও বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্ত সংগ্রহ করে তা রোগীদের জন্য সরবরাহ করছে। সংগঠনগুলোর কর্মীরা শুধু নিজেরাই রক্তদান করছেন না, অন্যদেরও রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে রক্তদানের আন্দোলনে জড়ো করছেন।
এদিকে নিজের রক্ত দিয়ে অপরের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পেরে খুশি স্বেচ্ছায় রক্তদাতা তরুণরা। তাদেরই একজন বাঁধনের সদস্য আবদুল আউয়াল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের এই ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১৮ বার স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন। কেন রক্ত দান করছেন জানতে চাইলে আউয়াল বলেন, ‘সুস্থ মানুষের শরীরে অতিরিক্ত অনেক রক্ত থাকে। এক ইউনিটে (ব্যাগে) যে পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন হয় তা ওই অতিরিক্ত রক্তের অর্ধেকেরও কম। তাই আমার দেয়া এক ব্যাগ রক্ত যদি কারো জীবন বাঁচাতে অবদান রাখতে পারে, তবে কেন দিব না?’
শুধু সংগঠনভুক্ত হয়ে নয়, ব্যক্তিগতভাবেও রক্তদান করছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। এমনই একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র মীর মেহেদী মোহাম্মদ। যখনই তার কাছে কেউ রক্ত চেয়েছেন, তখনই তিনি রক্ত দিয়েছেন। অন্তত ১২ বার রক্ত দানকারী এ ছাত্র বলেন, ‘শিক্ষা আমাদের মানবিক হতে শেখায়, সামাজিক দায়বদ্ধতা বুঝিয়ে দেয়। রক্তের প্রয়োজন কৃত্রিমভাবে পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই সচেতন নাগরিক হিসেবে যতদূর সম্ভব স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছি। অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করেছি।’
প্রায় একই সুরে কথা বললেন ১০ বারের বেশি রক্তদাতা বুয়েটের ছাত্র আবু সালেহ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী ইশরাত জাহান, ইডেন কলেজের সুস্মিতা, ঢাকা কলেজের গিয়াস উদ্দিনসহ আরো অসংখ্য তরুণ।
বাঁধনের সাধারণ সম্পাদক তাপস বসু এ প্রসঙ্গে বলেন, বিপন্ন মানুষকে বাঁচানো মানুষেরই কর্তব্য। স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের রক্তই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত। বাণিজ্যিক উপায়ে সংগ্রহকৃত রক্ত অনেক সময় নিরাপদ হয় না। অসচ্ছল অনেক ছাত্র-ছাত্রীও দায়িত্ববোধ থেকে নিয়মিত রক্তদান করছেন। স্বেচ্ছায় রক্তদানের বিষয়টি তরুণদের মানবতাবাদী চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ বলে তিনি মন্তব্য করেন।