দুদকের মামলায় জ্বালানি তেল আমদানিতে অচলাবস্থা
সালাহউদ্দিন মো. রেজা, চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:০৮
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলার প্রেক্ষাপটে দেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিপিসি’র জ্বালানি তেল আমদানির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মামলার প্রেক্ষাপটে নিয়মিত দায়িত্ব পালন সম্ভব নয় বলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। তাদের মতে, বিদেশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসি’র চুক্তির আওতায় দেশে অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়। চুক্তি সম্পাদন প্রক্রিয়ায় বিপিসি ছাড়াও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট থাকে। প্রায় ৩০ বছর ধরে একই ধরনের চুক্তির আওতায় অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়ে আসছে।
অপরদিকে ২০০৩ সাল থেকে পরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে অনুরূপভাবে দু’টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়। ওই চুক্তিসমূহে থাকা দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী অপরিশোধিত এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য পরিশোধ করা হয়। কিন্তু এই কাজের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় বিদ্যমান চুক্তির ভিত্তিতে আমদানি ঋণপত্র খোলা এবং তার বিপরীতে মূল্য পরিশোধ করা হলে সেটিও অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে। তাই কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের দিক-নির্দেশনা চেয়েছেন।
এদিকে বিপিসি’র চেয়ারম্যান মো. ইউনুসুর রহমান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. মোজাম্মেল হক খানের নিকট লেখা এক পত্রে উল্লেখ করেছেন, মামলাজনিত কারণে বিপিসি’র তেল আমদানি কার্যক্রমের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে। বিপিসি’র ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার পরদিন লেখা পত্রে তিনি বলেন, মামলা দায়েরের ঘটনায় বিপিসি’র সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে হতাশা এবং নিরাপত্তাহীনতাবোধ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিপিসি’র চেয়ারম্যান তার পত্রে আরো বলেছেন, মামলার ফলে বিদেশি তেল সরবরাহকারিগণের অনুকূলে মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থার নিরসন করা সম্ভব না হলে দেশে তেল আমদানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অবিলম্বে পুরো বিষয়টি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রণালয় বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং প্রয়োজনে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীকে অবহিতকরণ পূর্বক নির্দেশনা নেয়া যেতে পারে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে মামলার পরও বিদেশি সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ সমীচীন হবে কিনা সে বিষয়েও নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে এফ ও বি পদ্ধতিতে তেল আমদানি হয়। অর্থাত্ বিদেশের যে বন্দরে জাহাজে তেল ভর্তি করা হয় ওই লোড পয়েন্টে নিরূপিত পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বিপিসি সরবরাহকারী কোম্পানিকে মূল্য পরিশোধ করে থাকে। কিন্তু ওই ভাড়া করা মাদার ভেসেল বাংলাদেশের কুতুবদিয়া এলাকায় পৌঁছানোর পর জাহাজের ত্রুটি কিংবা আবহাওয়াজনিত অন্য যেকোন কারণে ওই অপরিশোধিত তেল সামান্য কম-বেশি হলে তার দায়িত্ব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায় না। অর্থাত্ মূল্যের ক্ষেত্রে কোন তারতম্য হয় না। তবে স্বীকৃত পরিমাণের চেয়ে বেশি কম হলে জাহাজের ভাড়া থেকে মূল্য কর্তন করা হয়। অপরিশোধিত তেলবাহী মাদার ভেসেল ৭০ থেকে ৮০ হাজার টন তেল বহন করে থাকে।
অপরদিকে পরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী সিএন্ডএফ চট্টগ্রাম অর্থাত্ চট্টগ্রাম বন্দরের আলফা এ্যাংকরাজ পৌঁছানোর পর তেল পরিমাপ করা হয়। এতে বিভিন্ন পক্ষের সার্ভেয়ারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তেলের পরিমাণসহ মান পরীক্ষা করা হয়। ওই নিরূপিত মাপের ভিত্তিতে বিপিসি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে মূল্য পরিশোধ করে থাকে। এক্ষেত্রেও দেখা যায়, জাহাজটি যে পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে বিদেশ থেকে রওয়ানা করে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় পৌঁছার পর তাপমাত্রা কিংবা জাহাজের রোলিংসহ বিভিন্ন কারণে তেলের পরিমাণ কম বা বেশি হতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সাধারণত পরিশোধিত তেল আয়তনে বৃদ্ধি পায়। বিপিসি’র চেয়ারম্যান গত সোমবার জ্বালানি সচিবের নিকট লেখা পত্রে মত প্রকাশ করেছেন, আলোচ্য ক্ষেত্রে দু’টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে বর্ণিত জ্বালানি তেলের পরিমাণ নির্ধারণ ও মূল্য পরিশোধের কারিগরি বিষয়গুলো দুদকের কর্মকর্তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে না পারার কারণেই মামলাটি ঘটতে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।