পরনিন্দা-পরচর্চা জিন্দাবাদ!

পরনিন্দা পরচর্চায় বাঙালির জুড়ি মেলা ভার! ‘পরনিন্দা পরচর্চা’ বাঙালি জীবনের অঙ্গ। যদিও কেবল বাঙালিরাই নয়, সব জাতির মধ্যেই এই পরনিন্দার চর্চা অল্প-বিস্তর রয়েছে।  রসিকরা একে সংক্ষেপে নাম দিয়েছেন পিএনপিসি। সাধারণভাবে মেয়েদের ঘাড়ে এই ‘পরনিন্দা পরচর্চা’ দায় চাপানো হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা  গেছে আবালবৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে সবাই পিএনপিসি করে থাকে।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা বাঙালির এই পরনিন্দা-পরচর্চার বৈশিষ্ট্য নিয়ে অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক বা বোদ্ধা বলেছেন অনেক কথা। তাঁদের অনেকের মতে, বাঙালির আড্ডা মানেই পরচর্চা আর পরনিন্দার নামে দারুণ এক সুখবোধ। বিকৃত আনন্দ লাভে এটি অদ্ভুত একটা যোগ্যতা বা গুণ। অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, ‘পরনিন্দা বাঙালির একটি স্থায়ী রোগ।’ তার মতে, ‘পরোন্নতিকাতরতা থেকে মুক্তির একটি উপায়ও বের করেছে বাঙালি, চমত্কার উপায় সেটি; তা হচ্ছে পরনিন্দা। বাঙালি পরনিন্দায় সুস্থবোধ করে, বাঙালি উপকারীর নিন্দার জন্যেও খ্যাত।’

এই পরনিন্দা বা পরচর্চাকে ইংরেজিতে ‘গসিপ’ বলা হয়, সেটা নিয়ে সম্প্র্রতি আমেরিকার এক নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয় এক গবেষণা করেছে। গবেষণার পর্যবেক্ষণগুলো খুবই অভিনব। সাধারণভাবে বলা হয়, গসিপ হচ্ছে মেয়েদের চিরন্তন সঙ্গী। কর্মক্ষেত্রে হোক বা গেরস্থালির কাজের ফাঁকে, মেয়েরা পরনিন্দা পরচর্চা ছাড়া থাকতেই পারে না। তবে প্রচলিত এই কথাটিকে ভুল প্রমাণ করেছে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সমীক্ষা। পরনিন্দা-পরচর্চা নিয়ে পরিচালিত এই সমীক্ষায় প্রকাশ পেয়েছে দিনে অন্তত ৫২ মিনিট পরচর্চা না করতে পারলে ঘুম হয় না মানুষের। তবে আরো একটি তথ্য এই সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে। সমীক্ষা বলছে মেয়েদের তুলনায় পুরুষরা বেশি পরনিন্দা-পরচর্চা করতে পছন্দ করে। গবেষকরা দেখেছেন, মানুষজন দিনের একটা নির্দিষ্ট শতাংশ সময় তারা স্রেফ পরনিন্দা-পরচর্চা করেই কাটিয়েছেন। হিসেব করে দেখা গিয়েছে এই সময়টা দিনে গড়ে প্রায় ৫২ মিনিট।

কোন কোন বিষয় নিয়ে মূলত হয় ‘গসিপ’? দেখা গেছে, কম বয়সীরা প্রধানত নেতিবাচক গসিপের দিকে আকৃষ্ট হয় বেশি। তা ছেলে হোক কি মেয়ে হোক, তাদের গসিপের বিষয়বস্তু থাকে নিন্দে করা। জীবনে উন্নতি করার আলোচনার থেকে এ-ওর নিন্দা করার দিকেই তাদের নজর বেশি। কিন্তু বয়স যত বাড়তে থাকে এই প্রবণতা ততই কমতে থাকে। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার পর দেখা যায় গসিপের সময় ক্রমশ কমতেই থাকে। পরনিন্দা-পরচর্চা সবদেশে সব বয়সী মানুষেরই একটি প্রিয় অভ্যাস। কেবল এই চর্চার নামগুলো আলাদা। যেমন এর ঘরোয়া নাম-আড্ডা, অফিসিয়াল নাম-মিটিং বা আলোচনা সভা, আর পলিটিক্যাল নাম সম্মেলন, এসবের উদ্দেশ্য কিন্তু প্রায় এক- পরনিন্দা এবং পরচর্চা।

কিন্তু এখন প্রশ্ন পরনিন্দা-পরচর্চা আমরা করি কেন? উত্তরটা খুবই সহজ। সব মানুষের মধ্যেই দোষ-গুণ থাকে, কিন্তু দুঃখের বিষয় গুণের পরিমাণটা বড্ড কম, অনেকটা তরি-তরকারিতে নুনেরই মতো, মাত্র এক চিমটেই কাজ হয়ে যায়! আর যা এক চিমটে তা নিয়ে বেশিক্ষণ চর্চা করা যায় না। আর গুণের চর্চা দিয়ে যখন বেশিক্ষণ টানা যাবে না, তখন পরনিন্দা ছাড়া উপায় কি?

অনেকেই উপদেশ দিয়ে থাকেন, পরনিন্দা-পরচর্চা করো না, শুনো না। এটা যে কত বড় মিথ্যে কথা-যে বলে সেও জানে, আর যে শোনে সেও জানে। সুতরাং এটুকু জোরগলায় বলা যেতেই পারে যে পরনিন্দা-পরচর্চা কমবেশি সবাই করে বা করতে হয়। পেট হালকা করার জন্য তাও ইসবগুল আছে, ত্রিফলা কিংবা নানা ধরনের পাঁচন বা রস আছে, কিন্তু মন হালকা করার জন্য পরনিন্দা-পরচর্চা ছাড়া আর কোনো ওষুধইতো বাজারে নেই, তাই পরনিন্দা-পরচর্চা ছাড়া মন হালকা করার উপায় কী?

ব্যক্তি মানুষের ধরন অনুযায়ী মন হালকা করার দাওয়াই আছে তার একান্ত গঠনের মধ্যে, তার চারিত্রিক ওরিয়েন্টেশনের মধ্যে। কেউ গান শুনে, কেউ সিনেমা-নাটক-ভিডিও দেখে, কেউ ফাটিয়ে ঝগড়া করে, কেউ এককথা একশবার বলে, কেউ আবার ফেসবুকে বুঁদ হয়ে থেকে, বই-ম্যাগাজিন-পত্রিকা-ধর্মগ্রন্থের পাতায় চোখ রেখেও হালকা হয়। তবে পরনিন্দা-পরচর্চা ব্যাপারটি শেষপাতে চাটনির মতো সুস্বাদু সবার কাছে, এটা বলাই যায়। প্রায় প্রত্যেক মানুষের একটা স্বভাব থাকে পরনিন্দা-পরচর্চা করা, অপরের দোষ বিচার করা। আমরা পরনিন্দা-পরচর্চা উপভোগ করি কারণ তা আমাদের অহংকারকে ফাঁপিয়ে দেয়। আমাদের আত্মতৃপ্তির পিছনে থাকে এই বোধ:‘আমার ওর মত দুর্বলতা নেই। আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’ যদিও তা সত্যি নয়।

পরনিন্দা নিয়ে রবীন্দ্রনাথও বলেছেন, ‘‘পরনিন্দা পৃথিবীতে এত প্রাচীন এবং এত ব্যাপক যে, সহসা ইহার বিরুদ্ধে একটা যে-সে মত প্রকাশ করা ধৃষ্টতা হইয়া পড়ে। নোনা জল পানের পক্ষে উপযোগী নহে এ কথা শিশুও জানে কিন্তু যখন দেখি সাত সমুদ্রের জল নুনে পরিপূর্ণ, যখন দেখি এই নোনা জল সমস্ত পৃথিবীকে বেড়িয়া আছে, তখন এ কথা বলিতে কোনোমতেই সাহস হয় না যে, সমুদ্রের জলে নুন না থাকিলেই ভালো হইত। নিশ্চয়ই ভালো হইত না, হয়তো লবণ জলের অভাবে সমস্ত পৃথিবী পচিয়া উঠিত। তেমনি পরনিন্দা সমাজের কণায় কণায় যদি মিশিয়া না থাকিত তবে নিশ্চয়ই একটা বড় রকমের অনর্থ ঘটিত। উহা লবণের মতো সমস্ত সংসারকে বিকার হইতে রক্ষা করিতেছে।....

বস্তুত নিন্দা না থাকিলে পৃথিবীতে জীবনের গৌরব কী থাকিত? একটা ভালো কাজে হাত দিলাম, তাহার নিন্দা কেহ করে না, সে ভালো কাজের দাম কী! একটা ভালো কিছু লিখিলাম, তাহার নিন্দুক কেহ নাই, ভালো গ্রন্থের পক্ষে এমন মর্মান্তিক অনাদর কী হইতে পারে! জীবনকে ধর্মচর্চায় উত্সর্গ করিলাম, যদি কোনো লোক তাহার মধ্যে গূঢ় মন্দ অভিপ্রায় না দেখিল তবে সাধুতা যে নিতান্তই সহজ হইয়া পড়িল।’’

সুতরাং পরচর্চার দরকার আছে। ‘পরচর্চা করো না, বিপদে পড়ো না’— এমন নীতিবাক্যের পরিবর্তে নতুন নীতিবাক্য বলার সময় বোধহয় এসেছে। এখন বলতে হবে, যদি সুস্থ থাকতে চাও তা হলে পরচর্চায়  মেতে ওঠো! কেননা পরচর্চা মানুষকে সুস্থ ও সুখী থাকতে সাহায্য করে। সেইসঙ্গে শিক্ষা দেয় কাকে বিশ্বাস করা যায়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভালিউশনারি সাইকোলজির অধ্যাপক রবিন ডানবার পরচর্চাকে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবেই বিবেচনা করতে চান। তিনি বিশ্বাসও করেন, এই পরচর্চাই মানুষকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখার একটি অন্যতম অবলম্বন। তাছাড়া আপনি যা বলবেন বা করবেন তারই সমালোচনা অবধারিত। কোনো মাফ নেই! যেমন ধরুন- এক লোক সস্ত্রীক একটা গাধা নিয়ে যাচ্ছে। যখন তারা দু’জন একসঙ্গে গাধার উপর চড়ে বসলো তখন লোকজন দেখে বললো লোকটি কি নিষ্ঠুর, দু’জন লোক গাধার উপর চড়ে বসেছে। আহা বেচারা গাধা। শুনে লোকটি যখন একা গাধার উপর চড়ে থাকলো ও স্ত্রী সঙ্গে হেঁটে চললো তখন লোকজন বললো, লোকটা কেমন পাষাণ হূদয়হীন। নিজে গাধায় চড়ে বউকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবারে সে নিজে হেঁটে স্ত্রীকে গাধায় চড়িয়ে নিয়ে চললো। লোকজন এবারে সমালোচনা করলো, কি নির্বোধ স্ত্রৈণ লোকটি। স্ত্রীকে গাধায় চড়িয়ে নিজে হেঁটে যাচ্ছে। দু’জনই হেঁটে চললে সমালোচনা হলো, বোকার হদ্দ। কিভাবে গাধাকে কাজে লাগাতে হয় তা-ই জানে না। সুতরাং নিন্দা সমালোচনা ছাড়া যাবেন কই?

এরিস্টটল বলেছেন, সমালোচনা আমরা সহজেই পাশ কাটাতে পারি কোনো কিছুই না বলে, না করে ও না হয়ে। এ কথাটারও কিন্তু সমালোচনা আছে। কারণ আপনি যাই করবেন তারই সমালোচনা হতে পারে। এমন কি কিছু না করলেও আপনার সমালোচনা হতে পারে। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে উদাহরণগুলো লক্ষ্য করুন। যেমন কেউ যদি চাকরির খোঁজে সারাদিন বাইরে বাইরে ঘোরাঘুরি করে তাহলে লোকে তার নাম দিবে বাউন্ডুলে বা ভবঘুরে বা টোঁ টোঁ কোম্পানির ম্যানেজার। কিছুই না করলে নাম হবে ভাদাইম্যা বা অকর্মা। স্ত্রীকে চাকরি করতে দিলে বলবে বউয়ের কামাই খায়। চাকরি না করতে দিলে সন্দেহপ্রবণ। বউকে শাসন করলে অত্যাচারী, না করলে কাপুরুষ। এরকম অজস্র বিশেষণ। কি করবেন আপনি?

পরনিন্দা-পরচর্চার যত নিন্দাবাদ বা সমালোচনা আমরা করি না কেন এর পক্ষে দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সনদ কিন্তু আমরা পেয়ে গেছি। অতএব আসুন মাভৈঃ মাভৈঃ বলে আমরা আমাদের প্রিয় বিষয় পরচর্চা-পরনিন্দায় অবতীর্ণ হই; কারো মু্লুপাত শুরু করি। তবে যেন সীমা অতিক্রম না করি। পরচর্চা-পরনিন্দার সীমা অতিক্রান্ত হলে কিন্তু মারামারি, হাতাহাতি, চুলাচুলি, গোলাগুলির সূচনা হতে পারে।

অতএব পরনিন্দা-পরচর্চা জিন্দাবাদ! 

n লেখক:রম্য রচয়িতা