বলিউড
দ্য ট্রাজিক কুইন মীনা কুমারি
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৫০
পাকিজা মুক্তি পাওয়ার মাত্র সপ্তাহ দুইয়েক পরেই সেই লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়েই ৩১ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন মীনা। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে— জন্মের মতই মৃত্যুর সময়ও হাসপাতালের টাকা পরিশোধ করার অর্থ ছিল না মীরার কাছে। এভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটে সত্যিকার অর্থেই এক ট্রাজিক কুইনের জীবন সিনেমার
তুমুল আলোচিত এবং অসম্ভব নাটকীয়, বলিউডের শুরুর দিকের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী মীনা কুমারির জীবন সম্পর্কে এক বাক্যে বলতে গেলে সেটা এমনই শোনাবে। দর্শকরা মীনাকে মনে রেখেছে ট্রাজিক সিনেমায় তার অসাধারণ অভিনয়ের জন্য, তবে মীনার জীবনের ট্রাজেডি হার মানাবে যে কোন সিনেমাকে। সাফল্যের চূড়ায় উত্থান আর সেখান থেকে নরকে পতন; সিনেমা আর বাস্তব জীবন মিলে মীনা সত্যিকার অর্থেই ছিলেন হিন্দী সিনেমার দ্য ট্রাজিক কুইন।
থিয়েটার কর্মী আলী বকশ এবং ইকবাল বেগমের ঘরে ১৯৩২ সালের আগস্টের প্রথম দিনে জন্ম মীনার। জন্মের সময় অবশ্য তার নাম ছিল মাহজাবীন বানু। পরিবারের তৃতীয় কন্যা মীনার জন্মের সময় আলীর অর্থনৈতিক অবস্থা এমনই শোচনীয় ছিল যে, সাথে সাথে হাসপাতালের ফি পরিশোধ করতে পারেননি তিনি। ফলে ঘণ্টা কয়েকের জন্য মীনার আশ্রয় হয় একটি মুসলিম এতিমখানায়। এরপর অবশ্য বাসায় নেয়া হয় তাকে।
বাবার হাত ধরেই মীনার সিনেমায় আসা। স্ত্রীর অনুরোধে মাত্র সাত বছর বয়সী মীনাকে আলী সুযোগ দেন তার অভিনীত লেদারফেস ছবিতে। যদিও এই ছবিতে অভিনয়ের মেটেই ইচ্ছা ছিল না তার। পরবর্তীতে এক সাক্ষাত্কারে মীনা বলেন, অন্য সব শিশুর মতোই স্কুলে যেতে চাইছিলাম আমি।
এরপর অবশ্য ইচ্ছা নয়, টাকার তাগিদেই অভিনয়ে নামতে হয় মীনার। ’৪০ দশকের মাঝামাঝি তিনি হয়ে যান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অচীরেই শ্রী গানেশ মাহিমা, আলাদিন, দ্য ওয়ান্ডারফুল ল্যান্ডের মতো পৌরাণিক এবং ফ্যান্টাসী কাহিনী আশ্রিত সিনেমায় অভিনয় করে পরিচিত হয়ে ওঠেন মীনা।
তবে মীনার বড় সাফল্য আসে বিজয় ভাটের বাইজু বারোয়া সিনেমার মাধ্যমে। ১৯৫২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ সিনেমা মীনাকে পরিণত করে সে সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রীতে। এ ছবির মাধ্যমেই ১৯৫৩ সালে প্রথম অভিনেত্রী হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি।
এরপর তিনি একে একে অভিনয় করতে থাকেন পরিণীতা, দায়িরা, এক হি রাস্তা, সারদা প্রভুতি সিনেমায়। দারুণ দর্শকসফল এই সিনমাগুলো ট্রাজেডি সিনেমার সেরা নায়িকা হিসেবে পাকা করে তার আসন। তবে শুধু বিয়োগান্তক গল্পের নায়িকাই নয়, মীনা সফল হন আজাদ, মিস ম্যারি, সারারাত এবং কহিনুরের মতো চটুল প্রেমের গল্পের ছবিতেও।
মীনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি আসে প্রযোজক গুরু দত্তের হাত ধরে। ১৯৬২ সালে সাহেব বিবি আউর গোলাম সিনেমায় অ্যালকোহল আসক্ত এক নারীর ভূমিকায় ছোট বউর চরিত্রে তার দুর্দান্ত অভিনয় জয় করে দর্শক-সমালোচকদের মন। মীনার বাস্তব জীবনের সাথে সিনেমার চরিত্রটির দারুণ মিলই ছিল ছবিটির সাফল্যের অন্যতম কারণ। আপারস্টল ডটকম এই ছবিতে মীনার অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘ছোটি বাহু চরিত্রে তার অভিনয়, কোন চরিত্রের রূপায়ণের ক্ষেত্রে তর্কযোগ্যভাবে হিন্দী সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে সফল কাজ ছিল।’
এবছরই ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারের ইতিহাসের একমাত্র শিল্পী হিসেবে সেরা অভিনেত্রী ক্যাটাগরীতে মনোনয়ন পায় তার তিনটি সিনেমা। প্রত্যাশিতভাবেই সাহেব বিবি অউর গোলামের জন্য পুরস্কার জেতেন তিনি।
এরপর ক্রমেই মদের নেশায় আসক্ত হতে থাকা মীনা ধমেন্দ্রসহ বেশ কয়েকজন তরুণ নায়কের বিপরীতে অভিনয় করেন আরো বেশ কয়েকটি সফল ছবিতে। কামাল আমরোহির সঙ্গে প্রথম বিয়েটি ভেঙে যাওয়ার পরে ধমেন্দ্রর সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। যদিও সেটা খুব বেশি দিন টেকেনি। পরবর্তীতে মীনা অবশ্য দাবি করেন, তার খ্যাতিকে কাজে লাগাতেই ধমেন্দ্র তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছিলেন।
ষাটের দশকের শেষ দিকে মীনার অ্যালকোহল আসক্তি এতটাই বেড়ে যায় যে, মীনার বাথরুমে ডেটলের বোতলে খুঁজে পাওয়া যেত অ্যালকোহল! স্বাভাবিক ভাবেই শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে তার। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে দেশের বাইরে বেশ কিছুদিন চিকিত্সা নিতে হয় তাকে।
তার সময়ের অভিনেত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় করা মীরাই ধীরে ধীরে ডুবতে থাকেন ঋণের জলে। ’৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পায় মীনার অভিনয় জীবনের সবচেয়ে আলোচিত এবং সর্বশেষ সিনেমা পাকিজা। আমরোহির পরিচালনায় এ ছবিটি মুক্তি পেতে সময় নেয় প্রায় ১৪ বছর।
পাকিজা মুক্তি পাওয়ার মাত্র সপ্তাহ দুইয়েক পরেই সেই লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়েই ৩১ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন মীনা। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে- জন্মের মতই মৃত্যুর সময়ও হাসপাতালের টাকা পরিশোধ করার অর্থ ছিল না মীরার কাছে। এভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটে সত্যিকার অর্থেই এক ট্রাজিক কুইনের জীবন সিনেমার।