জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা
মোস্তাফিজুর রহমান লিটন সিনিয়র শিক্ষক : বাংলা বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মাদ পাবলিক কলেজ
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:০০
অতিথির স্মৃতি
অনুশীলনীর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
শেরপুরের নাইমুদ্দিন প্রায় ১০ বছর ধরে তার পোষা হাতি কালাপাহাড়কে দিয়ে লাকড়ি টানা, চাষ করা, সার্কাস দেখানো ইত্যাদি কাজ করে আসছিলো। কিন্তু বর্তমানে দারিদ্র্যের কারণে হাতির খোরাক যোগাড় করতে না পেরে একদিন সে কালা পাহাড়কে বিক্রি করে দিল। ক্রেতা কালাপাহাড়কে নিতে এসে ওর পায়ে বাধা রশি ধরে টানাটানি করে একচুলও নাড়াতে পারল না। কালাপাহাড়ের দুচোখ বেয়ে শুধু টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। পরের দিন খদ্দের আরও বেশি লোকজন সাথে করে এসে কালাপাহাড়কে নিয়ে যাবে বলে চলে যায়। কিন্তু ভোরবেলা নাইমুদ্দিন দেখে—কালাপাহাড় মরে পড়ে আছে। হাউমাউ করে সে চিত্কার করে আর বলে—‘ওরে আমার কালাপাহাড়, অভিমান করে তুই চলে গেলি।’
ক) শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোন পদক লাভ করেন?
খ) লেখক দেওঘর থেকে বিদায় নিতে নানা অজুহাতে দিন দুই দেরি করল কেন?
গ) কালাপাহাড়ের আচরণে ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের যে দিকটি প্রকাশ পেয়েছে তার বর্ণনা দাও।
ঘ) উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের অনুভূতি আর ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের লেখকের অনুভূতি একই ধারাই উত্সারিত বলে তুম মনে কর কি? তোমার মতের পক্ষে যুক্তি দাও।
উত্তর : ক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘জগত্তারিণী পদক’ লাভ করেন।
উত্তর : খ লেখক অতিথির সাথে অর্থাত্ কুকুরটির প্রতি ভালোবাসাস্বরূপ তার সময় কাটানোর জন্যে নানা অজুহাতে দিন দুই দেরি করলো।
সুস্থ হওয়ার জন্যেই লেখক দেওঘরে গিয়ে ছিলেন। নানান পরিবেশের ফাঁকে লেখকের সাথে একটি কুকরের সখ্যতা গড়ে ওঠে; কুকুরটিও বন্ধুসুলভ হয়ে ওঠে লেখকের কাছে। এই মমত্ববোধ ছেড়ে একদিন লেখককে বিদায় নিতে হচ্ছিলো। কিন্তু রোগের দোহায় দিয়ে লেখক কুকুরটির প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ করে যার ফলে তিনি আরও দিন দুই সেখানে দেরি করলেন।
উত্তর : গ কালাপাহাড়ের আচরণের সাথে ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের মানুষের প্রতি পশুর ভালোবাসার স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে।
উদ্দীপকের কালাপাহাড় একটি পশু যার আচরণ তার মানুষের সাথে পশুর সুগভীর সম্পর্ককে নির্দেশ করে। মালিকের প্রতি ভালোবাসা স্বরূপ এই পশুটি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত লড়াই করে গেছে তার মনিবের কাছে থাকার জন্যে। দারিদ্র্যর শিকার মালিক নাইমুদ্দিন চাইলেও তাকে বিক্রি হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি কিন্তু কালাপাহাড় তা না মেনে অন্যের হাতে যাওয়ার আগেই মারা গেছে। এই আচরণ ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের কুকুরের সাথে সম্পর্কিত।
‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পে দেখা যায়, লেখক দেওঘরে গিয়ে কুকুরের সাথে যে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তাতে উভয়ের মাঝে তৈরি হয় এক গভীর ভাবের সম্মিলন। কুকুরটি লেখকের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে কিন্তু অপর কাউকে দেখলে সে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। দেওঘরে লেখকের সাথে আত্মিকভাবে গড়ে ওঠে কুকুরটির কিন্তু একদিন লেককের চলে যাওয়ার ডাক আসে। তাই সব ফেলে লেকক গাড়িতে উঠলে কুকুরটি করুণদৃষ্টি তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। উদ্দীপকের কালাপাহাড়ও কুকুরটির মতো অসহায় ভালোবাসার নমুনা প্রকাশ করে। উভয় প্রাণীর মধ্যেই মানুষের প্রতি ভালোবাসার বিনম্র মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে।
উত্তর : ঘ.উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের অনুভূতি আর ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের লেখকের অনুভূতি একই ধারাই উত্সারিত বলে আমি মনে করি।
উদ্দীপকে নাইমুদ্দিনের মধ্যে আমরা পশুপ্রেম নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করি। অতি দারিদ্র্যতার জন্যে সে তার পোষা কালাপাহাড় নামক হাতিকে বিক্রি করে দিলেও পোষা হাতি তার কাছ থেকে দূরে যায়নি। বরং শেষ পর্যন্ত হাতিটি মনিবের প্রতি ভালোবাসাময় অভিমান করে মৃত্যুকে অনায়সেই গ্রহণ করেছে। হাতির মৃত্যুরে সাথে সাথে নাইমুদ্দিনের যে আত্মবিলাপ তা যেনো অতিথির স্মৃতি গল্পে লেখকের অতিথির হারানোর বেদনার প্রতিরূপ।
অতিথির স্মৃতি’ গল্পের পটেও আমরা উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের মতো একপ্রকার গভীর বেদনাবোধ লক্ষ্য করি। কেননা লেখক যখন দেউঘরে বায়ু পরিবর্তনের জন্যে গিয়ে ছিলেন তখন তার সাথে একটি কুকুরের সখ্য ভাব গড়ে ওঠে। কুকুরটি যেনো লেখকের কাছে আত্মীয় হয়ে ওঠে; তার প্রতি লেখকের ভালোবাসা যেনো তীব্র হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ দিকে কুকুরটিকে একা ফেলে আসাতে লেখকের মনেও উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের মতো বেদনাবোধ আমরা দেখতে পাই।
পশুর প্রতি ভালোবাসা বা মমত্ববোধ মানুষের চিরকালীন। উদ্দীপক এবং মূল গল্পে যে বোধ আমাদেরকে পশুর প্রতি মমত্ববোধ শেখায় তা যেনো আমাদের চিরচেনা একটি দৃশ্য। উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের পোষা হাতি কালাপাহাড়কে হারিয়ে যে অনুশোচনা তা লেখকেরই অনুশোচনার প্রতিরূপ কেননা নাইমুদ্দিন অভাবের তাড়নায় হাতি বিক্রি করলে শেষে সে পোষা প্রাণীর মমতা বুঝতে পেরেছে এবং সে ব্যথায় সে ব্যথিত হয়েছে। লেখকও অতিথির প্রতি যে ভালোবাসা বা মমত্ব দেখিয়েছেন কিন্তু শেষে যখন তিনি চলে আসবেন বলে মনে ভাবলেন তখনই আমরা দেখি অতিথির প্রতি তাঁর মনের মধ্যে এক অজানা মমতা। শেষে লেখকের চলে আসার মুহূর্তটি আমাদের নাইমুদ্দিনের মনের অবস্থার সাথে মিলিয়ে দেয় লেখক ও সমগ্র গাল্পিক পরিবেশকে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের নাইমুদ্দিনের অনুভূতি আর ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের লেখকের অনুভূতি একই ধারাই উত্সারিত।