ইলিশ ঘিরে ৬২ হাজার জেলে টিকে আছে

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সাধ, গন্ধ ও খাদ্য মানের দিক দিয়ে ইলিশকে বাঙ্গালির সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। অনাদিকাল থেকে জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আমিষ জাতীয় খাদ্য সরবরাহে এ মাছ অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলা নববর্ষের পহেলা বৈশাখের উত্সবের দিন বাঙ্গালীদের অন্যতম আকর্ষণ পান্তা-ইলিশ ভোজন। লক্ষ্মীপুর জেলা মত্স্য অফিস সূত্র হতে জানা যায়, ইলিশকে কেন্দ্র করে জেলার ৬২ হাজারের বেশি জেলে মেঘনায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এ সকল জেলেদের পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ২ লক্ষের ওপর। জেলেদের ধরা ইলিশের সাথে সংশ্লিষ্ট সহস্রাধিক মত্স্য ব্যবসায়ী যুক্ত আছে। জেলায় মোট মাছের চাহিদা ৩২ হাজার মেট্রিকটন। গত বছর জেলায় মোট ইলিশ উত্পাদন হয়েছে ৩২ হাজার ১৬০ মেট্রিক টন। জেলায় মাছের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত মাছ ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। নদীতে ইলিশ আহরণের পরিমাণের ওপর জেলেদের সুখ-দুখের মাত্রা নির্ভর করে। গত এক দশক ধরে মেঘনায় ইলিশের পরিমাণ কমতে থাকায় জেলেদের দুর্দিন বাড়তে থাকে। দুর্দিনে চরম অর্থ কষ্ট বাড়লেও বিকল্প পেশায় না গিয়ে জেলেরা তাদের প্রিয় ইলিশের দিকে তাকিয়ে এ পেশায় এখনো টিকে আছে। মত্স্য অধিদপ্তরের গবেষণায় দেখা যায়, বিগত দশকে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়, নদীর নাব্যতা হ্রাসসহ নির্বিচারে জাটকা (৯ ইঞ্চির নিচে ছোট ইলিশ) নিধন ও অধিক মাত্রায় ডিমওয়ালা ইলিশ ধরার কারণে ইলিশের উত্পাদন কমে গেছে। এ মাছের উত্পাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে বজায় রাখতে সরকার জাটকা রক্ষার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। সরকার মত্স্য সংরক্ষণে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা কৌশল যেমন- প্রজণন মৌসুমে ইলিশ মাছ আহরণ ও ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ, নদীতে মত্স্য অভয়াশ্রম ঘোষণা, মাছ ধরার ক্ষেত্রে ৪ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার বা তদাপেক্ষা কম ব্যাশ বা দৈর্ঘের ফাঁস জাল এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। সরকার ঘোষিত ৪টি ইলিশ অভয়াশ্রম আছে। এরমধ্যে একটি অভয়াশ্রম হচ্ছে চাঁদপুর জেলার ষাটনল হতে লক্ষ্মীপুর জেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকা। মার্চ-এপ্রিল দুই মাস অভায়শ্রমে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। ইলিশ সাগরের মাছ হলেও প্রজণন মৌসুমে ডিম ছাড়ার জন্য মেঘনা উপকূলীয় মোহনা ও নদীর উজানে চলে আসে। ডিম ছাড়ার পর ইলিশ আবার সাগরে চলে যায়। এ সময় নদীর মোহনায় উত্পাদিত হয় ইলিশের কোটি কোটি রেনু, পোনা ও বাচ্চা ইলিশ। যা নদ-নদীতে বিচরণ করে জাটকায় রুপান্তরিত হয়। নভেম্বর হতে মে মাস পর্যন্ত ইলিশ জাটকা অবস্থায় থাকে। টানা সাত মাস সরকারি নির্দেশে মেঘনা নদীতে জাটকা নিধন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকে। এছাড়াও ইলিশের ভরা প্রজণন মৌসুম হওয়ায় অক্টোবরের মাঝামাঝিতে পূর্ণিমার ১১ দিন অভয়াশ্রমসহ মেঘনার মোহনায় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ইলিশ ধরা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকে। জাটকা রক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় কর্মসূচির আওতায় লক্ষ্মীপুর জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।