যুক্তরাষ্ট্রের গোপন কর্মসূচি

প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষোভ বাড়ছে

ইন্টারনেটে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নজরদারি আর টেলিফোনে আড়িপাতার বিষয়টি কারো কাছেই ভাল ঠেকছে না। বরং জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা-এনএসএ’র এই কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহ সংশয় বাড়ছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেরই প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে। দক্ষিণ আমেরিকায় ওয়াশিংটনের সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু ব্রাজিলের চাপা ক্ষোভ সম্প্রতি তার বহিরাবরণ ভেদ করে যেন বেরিয়ে আসে। গোপন কর্মসূচির প্রতিবাদে ওয়াশিংটন সফর বাতিল করে বসেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ। আগামী ২৩ অক্টোবর তার ওয়াশিংটন যাবার কথা ছিলো। এটাই হতো গত দেড় যুগে ব্রাজিলের কোন প্রেসিডেন্টের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এই সফর বাতিল করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। ব্রাজিলের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট রুসেফ ও তার ঘনিষ্টজন এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাজের ইমেইল ও অন্যান্য বার্তার তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ করছে মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএ। ব্রাজিল একে বলছে যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরবৃত্তি। সাবেক এনএসএ ও সিআইএ কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যই এই অভিযোগের ভিত্তি। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ সবের কোন কিছুই এখন পর্যন্ত অস্বীকার করেনি। বরং অভিযোগের ব্যাপারে ব্রাজিলকে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। প্রেসিডেন্ট রুসেফ তার নির্ধারিত সফর বাতিল করায় নড়েচড়ে বসে ওয়াশিংটন। হোয়াইট হাউজ থেকে সরাসরি ফোন করা হয় তাকে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেয়া হয়। তবে ব্রাজিল পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়টির মীমাংসা হলেই ওয়াশিংটন সফরে যাবেন প্রেসিডেন্ট রুসেফ। পরে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক বিবৃতিতে বলা হয়, দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়টি কোন প্রভাব ফেলবে না বলে আশা করছে ওয়াশিংটন। এ তো গেলো শুধু ব্রাজিলের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের এনএসএ’র গোপন কার্যক্রম নিয়ে আরেক বন্ধুপ্রতীম দেশ মেক্সিকোসহ গোটা লাতিন আমেরিকাই ক্ষুব্ধ। চলতি মাসের শুরুতে রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত জি-টুয়েন্টি সম্মেলনে মূল সভার বাইরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পিনে নিয়েতো। এ সময় তিনি যু্ক্তরাষ্ট্রের গোপন কর্মসূচি নিয়ে বারাক ওবামার কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টও একইভাবে উদ্বেগ দেখান। তবে পূর্ণ তদন্তের আশ্বাস দিয়ে দু’জনকেই আপাতত সামাল দেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারনেট সারভেল্যান্স কর্মসূচির প্রতিবাদে ব্রাজিলের তত্পরতাকে রেডিক্যাল বা বৈপ্লবিক বলছেন অনেকে। কারণ প্রেসিডেন্টের সফর বাতিল করেই ক্ষান্ত হয়নি ব্রাজিল। বরং ইন্টারনেটে সাধারণ জনগণের তথ্য সংরক্ষণ ও নিরাপত্তায় গোটা দেশজুড়ে ভার্চুয়াল দেয়াল তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়েছে রুসেফ প্রশাসন। আর এ কাজে কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করতে যাচ্ছে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তেল কোম্পানি প্রেট্রোব্রাজ। ইন্টারনেটে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভেনিজুয়েলা ও ইকুয়েডরও। এ বিষয়ে তথ্য ফাঁসকারী স্নোডেনকে তারা আশ্রয় দিতেও রাজি ছিল। অস্বস্তিতে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও। জার্মানিসহ ইইউভুক্ত দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিজম কর্মসূচি নিয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়টি জানিয়েছে। আর হংকং তো আরো একধাপ এগিয়ে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে হ্যাকিংয়ের জন্য ওয়াশিংটনের কাছে পরিষ্কার ব্যাখ্যা চেয়েছে দেশটি। তবে ব্রাজিলের মতো ইন্টারনেটে নিরাপত্তা ব্যুহ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া যায় কি-না, তা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার অতি গোপন ‘প্রিজম’ (প্লানিং টুল ফর রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন, সিনক্রোনাইজেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট) কর্মসূচি ফাঁস করে দিয়ে হংকংয়ে পালিয়ে যান সাবেক সিআইএ কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন। এরপর সেখান থেকে তিনি মস্কো পাড়ি জমান। পরে শর্তসাপেক্ষে রাশিয়া স্নোডেনকে আশ্রয় দেয়। তাকে নেয়া হয় অজানা স্থানে। স্নোডেন জানান, মার্কিন এনএসএ সারাবিশ্বে ৬১ হাজারেরও বেশি হ্যাকিং অভিযান চালিয়েছে। অন্যতম হ্যাকিংয়ের শিকার হংকংয়ের চাইনিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভার, যা গোটা চীনে ওয়েব ট্রাফিকের কাজ করে। লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন সার্ভার হ্যাক করে গণহারে তথ্য সংগ্রহ করে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিজম কর্মসূচির আওতায় গুপ্তচরবৃত্তির এই কাজের কোন সীমা পরিসীমা নেই। একে তাই বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাস স্পাইং। কিন্তু বিভিন্ন দেশের প্রতিবাদ প্রচারণার বিষয়টি বেশ ভাবিয়ে তুলেছে ওয়াশিংটনকে। নাইন ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে অধিক গোয়েন্দা শক্তি অর্জনের ক্ষমতা দেয়া হয়। তখন ‘প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট’ নামের একটি শক্ত আইনও প্রণয়ন করা হয়। খোদ এই আইনের লেখক জিম সেনসেনব্রেনারের মতে, আইন লংঘন করছে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা। এর বিরুদ্ধে মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেস যদি পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র একদিন সারাবিশ্বে একঘরে হয়ে পড়বে।