জার্মান সমাজে বৈষম্য বাড়ছে!

শিল্পায়নের শুরু থেকেই জার্মানি বৈশ্বিক অর্থনীতির চালক, উদ্ভাবক এবং সুবিধাভোগী। ২০০৯ সালে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ এবং তৃতীয় শীর্ষ আমদানিকারক দেশ এবং এর বাণিজ্যিক উদ্বৃত্ত ১৮৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বে বায়ুমিল ও সৌরশক্তি প্রযুক্তির শীর্ষস্থানীয় ঊত্পাদক দেশ জার্মানি। ইউরোপীয়ান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংহতির প্রবক্তা জার্মানি। সেই জার্মানিতে দারিদ্র্য এখন সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। সমাজে বাড়ছে বৈষম্য। ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে আর গরীবরা হচ্ছে গরীব। তবে সরকার ও বিরোধীদের নানা প্রচারণার পর গতকাল অনুষ্ঠিত হলো দেশটির প্রধানমন্ত্রী তথা চ্যান্সেলর নির্বাচন। যোগ্যতাসম্পন্ন শ্রমিক, উন্নত অবকাঠামো, মূলধনের বৃহত্ মজুদ, দুর্নীতির নিম্নহার ও উচ্চ উদ্ভাবনীক্ষমতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সোশ্যাল মার্কেট ইকোনমি জার্মানিতে বিদ্যমান। জার্মানীর আছে ইউরোপের বৃহত্তম ও বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি, যা ২০০৯ সালে জিডিপি (পিপিপি)তে পঞ্চম স্থানের অধিকারী। বেকারত্বের হার ছিল ৭.৫ শতাংশ। বর্তমানে এই হার ৭ শতাংশের নীচে। নিম্ন মজুরি এবং বেকারত্ব মার্কেলের নিজের শহর টেম্পলিন এবং এর আশপাশেই বেশি। এখানে ১৪ শতাংশ নাগরিক দারিদ্র্য যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই এলাকার বেশিরভাগ চাকরি কৃষিক্ষেত্রে যা সাবেক কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানির অংশ। টেক্সটাইল শিল্পেই টেম্পলিনের বেশিরভাগ কর্মসংস্থান বিদ্যমান। টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মুনস্টারের দারিদ্র্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্গারেথা জানডার বলেন, সাবেক পশ্চিম জার্মানির চেয়ে অবসর ভাতা এবং পেনশন ভাতা এখানে অনেক কম। সমাজে বৈষম্য বিরাজ করছে। ধনীরা নিজেদের আরো ধনী করছে এবং গরীবরা আরো গরীব হচ্ছে। এ জন্য অর্থনীতিবিদরা করনীতি এবং নিয়োগকর্তাদের কম মজুরি দেয়াকে দায়ী করছেন। ক্রিসটিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) নেতা মার্কেল এবং তার দল প্রচারণা চালাচ্ছে যে, বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় সাফল্য দেখিয়েছে জার্মানি। বেকারত্ব কমছে এবং রপ্তানি বাড়ছে। তার বিরোধী দল পিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রেটসের (এসডিপি) পিয়ার স্টাইনব্রুয়েক বলছেন, নিজ দেশে মার্কেল বৈষম্যের সৃষ্টি করেছেন। তবে দারিদ্র্যতা যে তাদের জন্য খুব একটা চিন্তার বিষয় তা কিন্তু নয়। ৮২ মিলিয়নের মধ্যে ১২ মিলিয়ন লোক দারিদ্র্যতার মধ্যে বাস করছে। চলতি বছর সরকারের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শতকরা ১০ ভাগ লোকের হাতে প্রায় ৫৩ ভাগ সম্পদ রয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশের মতো জার্মানিতেও জাতীয়ভাবে ন্যূনতম কোনো মজুরি নির্ধারণ করা নেই। দেশটিতে চাকরির প্রকার এবং অঞ্চলভেদে প্রায় ৪৮০ রকমের মজুরি আছে। এটা ৭ দশমিক ৫০ ইউরো থেকে ১৩ দশমিক ৭০ ইউরো পর্যন্ত। সাবেক পূর্ব জার্মানির ইলেক্ট্রিশিয়ানরা মজুরি পায় ৮ দশমিক ৮৫ ইউরো। আর সাবেক পশ্চিম জার্মানির ইলেক্ট্রিশিয়ানরা সেখানে পায় ৯ দশমিক ৯০ ইউরো। আবর্জনা পরিষ্কারকরা পায় ৮ দশমিক ৬৪ ইউরো বা তার বেশি। অদক্ষ নির্মাণ শ্রমিকরা ১০ দশমিক ২৫ ইউরো থেকে ১১ দশমিক ৫০ ইউরো পায়। শতকরা ১০ ভাগ ভোটার চায় তাদের ন্যূনতম মজুরি হোক ১০ ইউরো। কিছু সেক্টরে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা নেই। কিছু সেক্টরে ঘন্টায় ২ ইউরো দেয়া হয়। বেকারিতে কাজ করা এক মহিলা জানান, তিনি ৫ ইউরোতে কাজ করেন। ৮ দশমিক ৫০ ইউরো পেলে তিনি খুশি। মার্কেলের বিরোধীরা জাতীয়ভাবে ন্যূনতম মজুরির বিষয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। মার্কেলও এতে সমর্থন দিচ্ছেন। তিনি ৮ দশমিক ৫০ ইউরো মজুরি নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, এই বিষয়টি মালিক, শ্রমিক এবং ট্রেড ইউনিয়নের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত। রাজনীতিকদের বিষয়টির সঙ্গে জড়ানো উচিত নয়। তার মতে, এরপর হয়তো আরো বাড়ানোর দাবি উঠবে। আগামীতে ভোটের আগেও বাড়ানোর প্রচেষ্টা থাকবে। মার্কেল যদিও জনপ্রিয়, কিন্তু তার এই মতের সঙ্গে বেশিরভাগ জনগণ একমত নয়। এক জরিপে জানা গেছে, কোম্পানির ম্যানেজাররাও ন্যূনতম একটা মজুরি চায়। যারা ৪০০ ইউরো বা এর কম পায় তারা শোষিত হয়। সরকার পার্ট-টাইম চাকরির অনুমতি দিয়েছে। ২০০৩ সালে এই অনুমতি দেয়া হয়। যারা এই চাকরি করে তারা ৪শত ইউরো পায় এবং কর দেয় না। যদিও কিছু সেক্টরে আরো কম মজুরি দেয়া হয়। কোনো কোনো সেক্টরে মজুরি খুবই কম। লিসা পস নামের এক নারী জানান, জার্মানিতে আপনি কাজ করতে পারেন এবং গরীব হতে পারেন। সাত মিলিয়নের মতো মানুষের জব সেন্টারে যেতে হয়। বিশেষ করে নারীরা কম মজুরিতে কাজ করে। অনেকে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। কারণ কেউই সঠিক দায়িত্বটা পালন করে না। এমনকি যেসব দল গরীবের জন্য লড়াই করে তারাও জানে না দুধের দাম কত? মার্কেল বিরোধীদের চেয়ে ২০ ভাগ এগিয়ে আছে। রপ্তানি অনেক দেশের চেয়ে বেশি। একত্রীকরণের দুই দশক পর অর্থনীতিতে অনেক এগিয়েছে। ইউরো কঠোরতার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মার্কেল। সামপ্রতিককালের ইউরো সংকট মোকাবেলায় জোরালো ভূমিকা রাখতেও সক্ষম হয়েছেন তিনি। একদিকে যেমন ইউরো মুদ্রায় ধস নামেনি, অন্যদিকে জার্মান ভোটারদেরও খুশি করতে পেরেছেন তিনি। গ্রিস, ইতালি ও পর্তুগালের অর্থনৈতিক সমস্যায় বিশাল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দিয়ে স্বদেশে এবং পুরো ইউরোপজুড়ে বাহবা কুড়িয়েছেন তিনি। ২০০২ সালের জানুয়ারিতে জার্মানিই ইউরোপের অভিন্ন মুদ্রা ইউরো চালু করে। একত্রীকরণের দুই দশক পরে জীবনযাত্রার মান ও মাথাপিছু আয়ের দিক দিয়ে প্রাক্তন পশ্চিম জার্মানীর স্টেটসমূহ পূর্ব জার্মানির স্টেটগুলোর চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এগিয়ে আছে। ২০০৯ সালে এঙ্গেলা মার্কেলের নেতৃত্বাধীন জার্মান সরকার ৫০ বিলিয়ন ইউরো (৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) এর একটি অর্থনীতি চাঙ্গাকরণ পরিকল্পনা অনুমোদন দেয় যার উদ্দেশ্য ছিল কিছু ক্ষেত্রকে নিম্নগামিতার হাত থেকে রক্ষা করা ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের হার রোধ করা। জার্মানির সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, নতুন একটি দল প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর ক্ষমতার সমীকরণ ওলট-পালট করে দিতে পারে। ইউরো-বিরোধী দল এএফডি জনমত সমীক্ষায় বেশ এগিয়ে রয়েছে। জার্মানির দলীয় রাজনীতির আঙিনা অনেকটা অভিজাতদের ক্লাবের মতো। সেই ক্লাবের সদস্য হতে গেলে নির্বাচনে ৫ শতাংশের বেশি ভোট পেতে হয়। তা না হলে সংসদে আসন পাওয়া যায় না। তারপরেও অঘটন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠিত দল ৫ শতাংশের কম ভোট পেয়ে সংসদে স্থান পেল না, আবার সদ্য গজিয়ে ওঠা কোনো দল এক ধাক্কায় ৫ শতাংশের বেশি ভোট পেল এটাও হতে পারে।