আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার উপেক্ষিত কেন

পৃথিবীতে নানা ধরনের মানবগোষ্ঠী রয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। তাছাড়া পরিবেশের অপরূপ সৌন্দর্য তো রয়েছেই। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই বিভিন্ন প্রাণী ও মানবগোষ্ঠী এই বৈচিত্র্য রক্ষা করে আসছে। তার মধ্যে রয়েছে আদিবাসী জাতিসমূহও। আর যারা এই বৈচিত্র্য রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছে, তারাই এখন নিজেদের বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে পারছে না। আর এভাবে ব্রাজিলে বহু আদিবাসী জতিগোষ্ঠী বিলুপ্ত হয়েছে। কারণ তাদেরকে আগের অবস্থা থেকে মূল স্রোতধারায় আনতে গিয়ে বিভিন্ন নির্যাতন, অমানবিক অত্যাচার করা হয়েছে। তাছাড়া তাদেরকে প্রতিপক্ষ ভেবে নানাভাবে হত্যাও করা হয়েছে। পৃথিবী সৃষ্টির বহু বহু বছর পর বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলো। বহু সংবিধান রচিত হলো, প্রণীত হলো বহু আইন। কিন্তু আইনের সুবিধা পাওয়া থেকে বাদ পড়ে গেলো সেখানে বসবাসরত বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। মূলত আদিবাসীদের সঙ্গে ভূমির একটা আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। বহুকাল থেকে তারা একই রীতিনীতি, প্রথা এবং বংশ পরম্পরার ভিত্তিতে ভূমিকে ব্যবহার করে বাস করে আসছে। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়ায় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী থেকে তারা ভিন্ন। আর এই ভিন্নতাই হলো আদিবাসী সত্তা। তারা শান্তিকামী মানবগোষ্ঠী। তারা কোনো অশান্তি চায় না। তারা অন্যের অনিষ্ট চায় না। তারা নিজেরা নিজেদের পরিচয়ে, নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকতে চায়। আদিবাসীদের তাদের মতো করে বেঁচে থাকতে হলে প্রথমেই তাদের সংস্কৃতি, ভাষা ও ভূমির অধিকার স্বীকার করে নিতে হবে। তা না হলে তাদেরকে অস্বীকার করা হয়। এক্ষেত্রে ভারতের কথাই বলি, সেখানে তাদের সংবিধানে আদিবাসীদের ভূমি সুরক্ষা করা হয়েছে। অনেক রাজ্যেও আদিবাসীরা যাতে ভূমি না হারায় সেই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। অবাসিন্দা কেউ সেখানে জমি কিনতে পারবে না। এমনকি তাদের পার্লামেন্টেও আদিবাসীদের জন্য ২৫টির বেশি আসন সংরক্ষিত আছে। মেঘালয়ের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখবো সেখানেও আদিবাসীদের ভূমির অধিকারসহ অনেক অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে। এজন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত বলেছেন,“আদিবাসী মানুষের ভূমি অধিকার নিয়ে কালক্ষেপণ বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।” সম্প্রতি বাংলাদেশে সমতল এবং পাহাড়ি আদিবাসীদের্ ওপর হামলার ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূল কারণ একটাই—আর সেটি হচ্ছে ভূমিকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক বিরোধ অর্থাত্ ভূমিদস্যু এবং সেটেলাররা সেখানে জমি জবরদখল করে বসতি স্থাপনের জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে পারস্পরিক বিরোধ বলতে বোঝায়, দখলদার দখল নিতে গেলে প্রথমে হামলা চালায় এবং আদিবাসীরাও পালটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য নিরাপত্তার স্বার্থে স্ব-অবস্থানে থেকে রুখে দাঁড়ানো। যদি আজ অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, থাইল্যান্ডসহ ভারতের মতো বাংলাদেশে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত হতো, তাহলে অন্যান্য অধিকারও নিশ্চিত হবার সম্ভাবনা থাকতো। তারা তাদের মতো করে সেখানে বাস করছে। তাদেরকে কেউ বিরক্ত করে না। বাংলাদেশের মতো ভূমি অধিকার নিয়ে তাদের সে রাষ্ট্রে চিত্কার করতে হয় না। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে তাদের মানববন্ধন করতে হয় না। হামলার কারণে সর্বস্বান্ত হয়ে তাদের ঘুরে ঘুরে ত্রাণ তুলতে হয় না। অস্ট্রেলিয় সরকার সেখানকার আদিবাসীদের জন্য শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে বৃহত্তর সিলেটে চা শ্রমিকেরা দীর্ঘ ৪২ বছর পর এখনও আলোকিত হবার সুযোগ পায়নি। বলা হয়ে থাকে তারা শিক্ষিত হলে চা বাগানে কাজ করবে কে? আর পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার মূল ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা ভাবা হচ্ছে। এগুলো আদিবাসীদের সুফল বয়ে আনবে না। বরং চরম দুর্দশায় ফেলে দেবে। প্রান্তিক অঞ্চলে অর্থাত্ আদিবাসী অধ্যুষিত কোনো কোনো অঞ্চলে এখনো বিদ্যালয় নেই। চিকিত্সার সুব্যবস্থার জন্য ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই। মানুষের তার বিকাশ, বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক অধিকারগুলো থাকার কথা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে আদিবাসীদের ক্ষেত্রে তা পুরোটাই অনুপস্থিত। যার ফলে তারা প্রতি মুহূর্তে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এতে করে তাদের অস্তিত্ব টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। আদিবাসীদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে তারা কিছুটা এগিয়ে যাবে। না হয় তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বিলুপ্তির সম্মুখীন হবে। আদিবাসীরা আজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আদিবাসী নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার অধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকার, দেশের নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার অধিকারসমূহের ব্যাপারে খুবই আন্তরিক হতে হবে। তাদের ভূমির অধিকারটি সর্বাগ্রে নিশ্চিত করা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়